সা গ র - রু নি

নিজেরাই শিরোনামে

অতীতে বিভিন্ন বছরের অনেক আলোচিত খবর তারা লিখেছেন। পত্রিকা ছেড়ে সম্প্রচার সাংবাদিকতায় যুক্ত হওয়ার পর বছরের আলোচিত খবরগুলো নিয়ে টেলিভিশন কিংবা রেডিওতে রিপোর্ট করেছেন। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে ২০১২ সালে তারা নিজেরাই হয়ে গেলেন আলোচিত খবরের শিরোনাম। বছরজুড়েই তাদের নিয়ে আলোচনা চলেছে সর্বত্র। এখনও চলছে আলোচনা। কতদিন চলবে, কেউ জানে না। তারা সাগর-রুনি। একজনের নাম গোলাম মোস্তফা সরওয়ার। সাংবাদিকতা ক্ষেত্রে পরিচিত ছিলেন সাগর সরওয়ার নামে। সর্বশেষ মাছরাঙ্গা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার আগে রিপোর্টার হিসেবে কাজ করেছেন দৈনিক ইত্তেফাক, যুগান্তর ও সংবাদে। মাছরাঙ্গা টেলিভিশনে যোগদানের আগে দু’বছর কাজ করে এসেছেন জার্মানির ডয়েচে ভেলে রেডিওতে। অন্যজন মেহেরুন রুনী। সাগর সরওয়ারের স্ত্রী। তবে বাংলাদেশের টেলিভিশন সাংবাদিকতায় তারও পরিচিতি ছিল এক নামে। চ্যানেল আই দিয়ে শুরু। সর্বশেষ ছিলেন এটিএন বাংলায়। সম্প্রচার সাংবাদিকতায় যুক্ত হওয়ার আগে রুনিও পত্রিকায় কাজ করেছেন কিছুকাল। ২০১২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি রাতের বেলায় ইন্দিরা রোডের ভাড়া ফ্ল্যাটে নিজেদের শোবার ঘরে নির্মমভাবে খুন হন সাংবাদিক সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি। তাদের ক্ষত-বিক্ষত ও রক্তাক্ত দেহ নিথর অবস্থায় পড়েছিল ঘরের মেঝেতে। পাঁচ বছর বয়েসী পুত্র মেঘ মোবাইল ফোনে খবরটি প্রথম জানায় তার নানিকে। তারপর দ্রুত এই দুঃসংবাদ ছড়িয়ে পড়লে শোকের ছায়া নেমে আসে সাংবাদিক মহলে। তাদের অনেকেই ছুটে যান খুন হওয়া সহকর্মীর বাসায়। দ্রুতই ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান র্যাব-পুলিশের বড় কর্তারাও। ভয়ঙ্কর সেই দৃশ্য দেখে হতভম্ব হয়ে যান তারা। তত্কালীন স্বরষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনও দ্রুত আসেন দুই সাংবাদিকের হত্যাকাণ্ড দেখতে। তত্ক্ষণাত্ তিনি ঘোষণা দেন যে, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সাগর-রুনির হত্যকারীদের গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনা হবে। তার এই ঘোষণায় আশ্বস্ত হন সাংবাদিক সমাজ। কিন্তু ৪৮ ঘণ্টা দূরের কথা, হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী এক সপ্তাহের মধ্যেও যখন পুলিশ ঘটনার কোনো কূল-কিনারা করতে ব্যর্থ হয়, তখন ফুঁসে উঠেন সাংবাদিক সমাজ। পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) জরুরি সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে ঘোষণা দেন যে, তদন্তে প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু যথারীতি তদন্তের স্বার্থে সেই অগ্রগতির খবর প্রকাশ করতে নারাজ থাকেন আইজিপি। এরপর সাড়ে ১০ মাস সময় পেরিয়ে গেলেও আজও পর্যন্ত কোনো অগ্রগতির খবর দেশবাসীকে জানাতে পারেননি তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সেই ‘৪৮ ঘণ্টা’ এখন টেলিভিশন টক শোতে নিয়মিত বক্তৃতার একটি উপাদানে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে সম্পর্কে এক বক্তব্যে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলে বসলেন, ‘সরকার তো নাগরিকদের বেডরুমের নিরাপত্তা দিতে পারবে না।’ তার এই বক্তব্যও টিভি টক শো এবং বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের গরম বক্তব্যের খোরাক যুগিয়েছে। কে বা কারা ঘটিয়েছে ভয়ঙ্কর ও নির্মম এই হত্যাকাণ্ড? কেনই বা খুন হলেন সাগর-রুনি? এসব প্রশ্নের পরিষ্কার কোনো জবাব আজও নেই। এ যেন এক অপার রহস্য। পুলিশের ব্যর্থতার পর চলতি বছরের এপ্রিল মাসে উচ্চ আদালতের নির্দেশে মামলাটির রহস্য উদঘাটনের দায়িত্ব দেওয়া হয় এলিট ফোর্স র্যাবকে। তারপর পেরিয়ে গেছে প্রায় ৯ মাস। তবুও কোনো কূল-কিনারা হচ্ছে না। নিহত হওয়ার প্রায় দুই মাস পর পুনঃময়না তদন্তের নামে কবর থেকে তোলা হয় সাগর-রুনির পচা-গলা মৃতদেহ। তারপর নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয় সুদূর আমেরিকায়। সেই পরীক্ষার রিপোর্ট আজও আসেনি। অন্যদিকে সাগর-রুনি যে অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে বাস করতেন, সেই বাড়ির নিরাপত্তা রক্ষী হুমায়ুন ওরফে এনামুলকে ধরার জন্য গত ৯ অক্টোবর ১০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে র্যাব। যদিও এনামুলকে ধরতে উল্লেখযোগ্য কোনো অভিযান পরিচালনা করা হয়নি। তারপরও র্যাবের মহাপরিচালক বলছেন যে, নিখোঁজ এই নিরাপত্তা রক্ষীকে পাকড়াও করা সম্ভব হলেই খুলে যাবে রহস্যের জট। তার মানে এনামুল ধরা না পড়লে সাগর-রুনি হত্যার রহস্যের কোনো কূল-কিনারা কখনোই হবে না? সাগর-রুনির হত্যারহস্য উদঘাটনে এতই যেখানে এনামুলের গুরুত্ব, সেখানে তাকে ধরতে র্যাবের পক্ষ থেকে উল্লেখ করার মতো কোনো তত্পরতা নেই। কার্যত এই মামলার বিষয়ে বিগত দুই মাস ধরে র্যাবের সব তত্পরতা বন্ধ রয়েছে। শুধু গত ৯ অক্টোবর এনামুলকে ধরতে ১০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। এরপরের তিন মাসেও তার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয়নি। জারি হয়নি গণবিজ্ঞপ্তি। দেশের থানাগুলোতে তার কোনো ছবিও পাঠানো হয়নি। পুলিশ, র্যাবের ওয়েবসাইট, আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা কোথাও তার ছবি সম্বলিত বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি। চলেনি কোনো অভিযানও। তাকে ধরিয়ে দিতে নেই কোনো প্রচারণা। তিনি দেশে না বিদেশে পালিয়েছেন তাও জানা যায়নি। হুমায়ুন আদৌ জীবিত রয়েছে কী না সেটি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সুরক্ষিত অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে নিজেদের শোবার ঘরে সাংবাদিক দম্পতি খুনের ঘটনা দেশে এটিই প্রথম। সে কারণে দেশের সাংবাদিক সমাজ যেমন স্তম্ভিত ও আতঙ্কিত হয়েছেন, তেমনি ভয়ঙ্কর এই খুনের ঘটনা দীর্ঘকাল যাবত রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দ্বিধাবিভক্ত থাকা সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্যের একটি পটভূমিও সৃষ্টি করেছে। বিগত ১০ মাস যাবত সাংবাদিকদের সবগুলো সংগঠন ও প্লাটফরমের নেতারা সব রকম দ্বিধাবিভক্তি ভুলে গিয়ে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন এবং খুনিদের গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনার দাবিতে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করছেন। সর্বশেষ গত ২৩ ডিসেম্বর সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে প্রতীকী গণঅনশন কর্মসূচি পালন করেন সাংবাদিকরা। এদিন সাংবাদিক ইউনিয়নের বিভক্ত দু’টি অংশের নেতারা সাগর-রুনির হত্যাকারীদের বিচারের দাবি আদায়ে প্রয়োজনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ারও আভাস দেন। দীর্ঘদিন যাবত বিভক্তির দুই মেরুতে অবস্থানকারী সাংবাদিক নেতাদের এমন ইতিবাচক ভূমিকায় উদ্বেলিত হয়ে প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসা মন্তব্য করেন, সাগর-রুনি তাদের জীবন দিয়ে বৃহত্তর সাংবাদিক সমাজের বিরাট উপকার করে গেছেন। তারা খুন না হলে বিভক্ত সাংবাদিক সমাজের নেতারা কখনও হয়তো ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চিন্তাই করতেন না। সাগর-রুনির খুনের ঘটনা যেমন ২০১২ সালজুড়ে দেশের অন্যতম প্রধান আলোচিত ঘটনা ছিল, তেমনি এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে বেফাঁস মন্তব্য করে দারুণ আলোচিত হন এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান। লন্ডনে বাংলাদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে এক অনুষ্ঠানে আলাপচারিতায় তিনি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে মেহেরুন রুনির চরিত্র নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। এমনকি এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও বাচাল বলে মন্তব্য করেন বলে সংবাদ প্রকাশ হয়। নিজের প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিক মেহেরুন রুনি সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করায় মাহফুজুর রহমানের ওপর বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন সাংবাদিক সমাজ। তারা মাহফুজুর রহমানের গ্রেফতারের দাবিতে বিক্ষোভ-সমাবেশ, মানববন্ধন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেন। এ ধরনের একটি কর্মসূচিতে জনৈক সাংবাদিক নেতার ওপর এটিএন বাংলার কয়েকজন কর্মীর হামলার ঘটনা সাংবাদিকদের আন্দোলনে যেন ঘি ঢেলে দেয়। তার পরিণতিতে এটিএন বাংলার ৮ জন সাংবাদিককে বহিষ্কার ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয় সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠনের তরফ থেকে। এক পর্যায়ে মাহফুজুর রহমানের গ্রেফতারের দাবিতে এটিএন বাংলা ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করেন সাংবাদিক নেতারা। এর বিপরীতে সাংবাদিক নেতাদের বিরুদ্ধে আদালতে একটি মামলা ঠুকে দেন এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান। যদিও এক পর্যায়ে তিনি লন্ডনে দেওয়া বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। কিন্তু ততদিনে আন্দোলনের পানি গড়িয়ে যায় অনেক দূর। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, ২০১২ সালের অন্যতম আলোচিত ঘটনা সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে সাংবাদিকদের চলমান আন্দোলন ২০১৩ সালকেও অনেকখানি উত্তপ্ত রাখবে। আর এই ঘটনার সূত্রে দ্বিধাবিভক্ত সাংবাদিক ইউনিয়ন যদি শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত ঐক্য লাভ করে, তবে সেটা হবে দেশের সাংবাদিক সমাজের জন্য ইতিহাসের নতুন এক অধ্যায়।