বি শ্ব জি ত্ দা স
রাজনীতির বলি
প্রকাশ : ৩০ ডিসেম্বর ২০১২, ১৯:৩৬
বছরজুড়ে অনেক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটলেও বছরের শেষ দিকে এসে একটি হত্যাকাণ্ড নাড়িয়ে দিলো পুরো দেশকে। রাস্তার উপর একজন নিরপরাধ দর্জিকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হলেও কেউ এগিয়ে আসেনি তাকে বাঁচাতে। তবে চুপ থাকতে পারেননি রিকশাচালক রিপন। রক্তাক্ত ছেলেটিকে নিজের রিকশায় নিয়ে গেলন মিটফোর্ড হাসপাতালে। ততক্ষণে ছেলেটি বিদায় নিয়েছে পৃথিবী থেকে। ছেলেটির নাম বিশ্বজিত্ দাস। তার অপরাধ অসময়ে ভুল জায়গায় উপস্থিত হওয়া!
৯ ডিসেম্বর। স্থান পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক। বিএনপিসহ ১৮ দলের অবরোধ কর্মসূচি। সকাল ৯টা। বিরোধীদল সমর্থক আইনজীবীরা একটি মিছল বের করে। হঠাত্ ককটেল বিস্ফোরণ। এ সময় মিছিল নিয়ে বের হলো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ। রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল বিশ্বজিত্। শিবিরকর্মী সন্দেহে তার উপর চড়াও হলো ছাত্রলীগ। দৌঁড়ে তিনি পালিয়ে গেলেন পার্শ্ববর্তী দোতলা ভবনের টমাস ক্লিনিকে। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সেখানেও উপস্থিত। চাপাতি, ছুরি, রড লাঠি দিয়ে যে যেভাবে পারে তার উপর করল হামলা। আবারও দৌঁড়ে নিচে নেমে এলেন বিশ্বজিত্। আবারও আঘাত। বিশ্বজিতের রক্তে রঞ্জিত ঘাতকদের শার্ট-প্যান্ট। টেলিভিশন চ্যানেল ও সংবাদপত্রের ফটোসাংবাদিকরা ক্যামেরায় ধারণ করে নৃশংস সে হামলার চিত্র।
সারা দেশের মানুষের মনে জেগে উঠে ঘৃণা আর ধিক্কার। পুলিশ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রথমে এ হত্যাকাণ্ডের গ্রেফতার নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য দেয়। ঘাতকদের বিচারে প্রয়োজনীয় আলামত, প্র্রমাণ সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং তদারকিতে পুলিশ প্রশাসন এবং চিকিত্সকরা চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। চেষ্টা করা হয় ঘাতকদের রক্ষার। ঘাতকরা ছাত্রলীগের কর্মী নয় বলে সরকার যে বক্তব্য ও বিবৃতি দেয় তাতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এ নিয়ে দেশের গণমাধ্যমগুলোতে ঘাতকদের ছবি, নামধাম পরিচয় দিয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট প্রকাশ হতে থাকে। টনক নড়ে প্রশাসনের। ঘাতকদের গ্রেফতারে চালানো হয় অভিযান। একে একে রফিকুল ইসলাম শাকিল ওরফে চাপাতি শাকিল, মাহফুজুর রহমান নাহিদ, ইমদাদুল হক, রাশেদুজ্জামান শাওন, সাইফুল ইসলাম, এইচএম কিবরিয়া ও মো. কাইয়ূম মিয়া টিপুকে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গ্রেফতার করেছে। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তারা হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে।
বিশ্বজিতের স্বজনদের দাবি ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। বিশ্বজিতের বৃদ্ধ পিতা অনন্ত চন্দ্র দাস ও মা কল্পনা রানী ইত্তেফাককে বলেন, ‘বাবারে মামলা করে ছাত্রলীগ নামধারী কসাইদের আর কোপ খেতে চাই না। এক কলিজার ধন হারিয়ে মামলা দিয়ে আরেক ছেলেকে হারাতে চাই না।’ এ কারণে তিনি মামলা করতে বড়পুত্র উত্তম দাসকে নিষেধ করেন, ‘মামলা দিয়ে এ পুত্রকে ঘাতকদের চাপাতির নিচে ঠেলে দিতে পারি না। প্রকাশ্যে ওরা আমার বিশ্বজিতকে নির্মম ও নির্দয়ভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে। আমরা শুধু খুনীদের বিচারের রায় দেখে যেতে চাই।’ সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে এখন ইউনুছ, রাজন তালুকদার, মীর মো. নুরে আলম লিমন, ওবাইদুল কাদের তাওসীন পলাতক রয়েছে। এ ছাড়া জড়িত আরও ৫ জন পলাতক রয়েছে বলে পুলিশ জানায়।
আদালতে তিন ঘাতকের জবানবন্দি, পুলিশের সুরতহাল রিপোর্ট ও ময়না তদন্ত রিপোর্টের মধ্যে ব্যাপক গড়মিল থাকায় বিষয়টি ঘাতকদের পক্ষে যায়। এ দুইটি কারণে ন্যায় বিচার পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে এমন মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি শরীফুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলামের নেতৃত্বে অবরোধ চলাকালে ওইদিন বাহাদুর শাহ পার্কের কাছে মিছিল হয়েছিল। এখনও পর্যন্ত কিছুই হয়নি তাদের। তারা এখনও বহাল তবিয়তে। অভিযোগ আছে ক্যাডার বাহিনী থেকে চাঁদা আদায়, মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাস ও নানা অপরাধমূলক কাজ থেকে তারা নিয়মিত ভাগ নিতেন।
গতকাল ২৭ ডিসেম্বর সরেজমিনে বিশ্বজিতের লক্ষ্মীবাজার ঋষিকেশ দাস রোডের বাসায় গিয়ে আশপাশের বাসিন্দা এবং স্বজনহারা কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে কথা বললে তারা কেঁদে ফেলেন। বলেন, ‘বাবারে দিনে দুপুরে একজন মানুষ আরেকজনকে এভাবে কোপাতে পারে ভাবতেই গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়।’ সহজ সরল, ভদ্র নম্র বিশ্বজিত্ প্রতিদিনের মতো শাঁখারী বাজারে নিজ দোকানের দিকে যাচ্ছিল। ঘটনার সময় পরিচয় দিলো, সে কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নয়। তার সব ধরনের আবেদন ঘাতকরা উড়িয়ে দিয়ে মারদাঙ্গা সিমেনার শুটিংয়ের মতো ভিলেনরা নায়ককে রড-লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছে, কেউ কিরিচ-চাপাতি দিয়ে কোপাচ্ছে। ঘাতকরা বিশ্বজিতকে অনুরূপ কায়দায় হত্যা করে বীরদর্পে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। ছাত্রলীগ নেতারা বলে ঘাতকরা ছাত্রলীগের কেউ না। কোনো কোনো শীর্ষ ও দায়িত্বশীল মন্ত্রী বলেন, ঘাতকরা জামায়াত-শিবিরের কিংবা বিএনপির সক্রিয় কর্মী। তাহলে তারা ছাত্রলীগে এল কীভাবে যে নেতারা এসব অনুপ্রবেশকারীদের দলীয় কর্মী দাবি করছেন, তাদেরকে গ্রেফতার করা উচিত। তাহলে মন্ত্রীর দাবি সঠিক হবে বলে এলাকাবাসী দাবি জানান।
পাটুয়াটুলী, ইসলামপুর ও সদরঘাট এলাকার মার্কেটে এবং ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে ও দোকানে বিশ্বজিতের ঘাতকরা ছাত্রলীগের কর্মী পরিচয়ে নির্ধারিত হারে চাঁদা আদায় করত। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সেখান থেকে ভাগ নিতেন। কোনো কোনো বড় ব্যবসায়ীকে নেতাদের টেলিফোনে ধরিয়ে দিত চাঁদার জন্য। এমন তথ্য ওই এলাকায় পাঁচজন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন।
পুলিশের অপরাধ বিশেষজ্ঞগণ বলেন, বিশ্বজিতের লাশ সত্কার করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় দফা ময়না তদন্ত করা সম্ভব নয়। ঘাতকদের বিরুদ্ধে রায় প্রদানকালে ময়না তদন্তের রিপোর্টের ভূমিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সুরতহাল ও ময়না তদন্ত রিপোর্ট এবং ঘাতকদের জবানবন্দির মধ্যে গড়মিল থাকায় জড়িতরা বেশি লাভবান হতে পারে বলে তারা অভিমত ব্যক্ত করেন।
উপপুলিশ কমিশনার (ডিবি, দক্ষিণ) মনিরুল ইসলাম বলেন, সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে রাজন তালুকদার, মীর মো. নূরে আলম লিমন, ওবাইদুল কাদের তাওসীন, ইউনুছসহ সাতজন পলাতক রয়েছে। তাদের গ্রেফতারে ডিবির একাধিক টিম কাজ করছে। সরকারের শীর্ষ প্রশাসন থেকেও জড়িতদের গ্রেফতারে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে বলে তিনি জানান।
এভাবেই আইনি নিয়মে এখন চলতে থাকবে বিশ্বজিত্ হত্যার তদন্ত। হয়তো বা একদিন বিচারের কাঠগড়ায়ও দাঁড়াবে আসামীরা। কিন্তু প্রকাশ্য দিবালোকে এভাবে কুপিয়ে হত্যার দৃশ্য ভুলতে পারবে না এদেশের সাধারণ মানুষ। তাদের কাছে হয়তো সারাজীবন বিশ্বজিত্ থেকে যাবে এক ভ্রান্ত রাজনীতির শিকার।