৫৩ নদীর নাব্যতা ফেরাতে ১২ হাজার কোটি টাকার মহাপরিকল্পনা

দেশের ৫৩টি নদীর নাব্যতা ফেরাতে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে একটি মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। প্রকল্পের আওতায় নাব্যতা সংরক্ষণের লক্ষ্যে ৬৫টি নৌ-পথ খননের মধ্যে ২৪টিই একনেক অনুমোদন করেছে। বাকি ২৯টি নৌ-পথ খনন অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এছাড়া ১২টি গুরুত্বপূর্ণ নৌ-পথ খনন প্রকল্প আগে থেকেই চলমান রয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় ড্রেজিংকৃত মাটি পার্শ্ববর্তী নিচু জমিতে ফেলে কৃষি ভূমিতে পরিণত করা হয়েছে। এদিকে ব্যাপক ডেজিংয়ের মাধ্যমে দেশের মৃতপ্রায় নদ-নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, বন্দর-ঘাট-পয়েন্ট উন্নয়ন, নতুন ফেরিঘাট নির্মাণ, নদীর তীরভূমি অবৈধ স্থাপনা মুক্তকরণ, রাজস্ব দ্বিগুণ বৃদ্ধির মাধ্যমে গত এক বছরে বিআইডব্লিউটিএ ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএ-র চেয়ারম্যান ড. মোঃ শামছুদ্দোহা খন্দকার ইত্তেফাককে বলেন, বিআইডব্লিউটিএকে সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হবে। বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় ড্রেজিংকৃত মাটি পার্শ্ববর্তী নিচু জমিতে ফেলে কৃষিভূমিতে পরিণত করা হয়েছে। যা জাতীয় কৃষি অর্থনীতির সহায়ক ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, সংস্থার পদক্ষেপের কারণে নদী বন্দরসমূহে অবস্থিত শিল্প-প্রতিষ্ঠানের কাছে দীর্ঘদিনের পাওনা আদায় করা সম্ভব হয়েছে। কর্তৃপক্ষ আয়ের খাতগুলো যথাযথ মনিটরিং করায় এ বছর সংস্থার আয় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে । সংশ্লিষ্টসূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন খনন ও রক্ষণাবেক্ষণ না করার কারণে দেশের নৌ-পথ ২৪ হাজার কিলোমিটার থেকে ৫ হাজার কিলোমিটারের নিচে নেমে আসে। নৌ-পথ প্রসারিত করতে এবং যাত্রীদের সুবিধা বিবেচনায় এনে নৌ-পথ উদ্ধারে নামে বিআইডব্লিউটিএ। ইতিমধ্যে সারাদেশে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোয় নতুন করে ৮শ কিলোমিটার নৌ-পথ তৈরি হয়েছে। নেয়া হয়েছে নানা প্রকল্প। ড. শামছুদ্দোহা খন্দকার বিআইডব্লিউটিএ-র চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণের পর গত এক বছরে শুধু রাজস্ব আয় বেড়েছে ১৩৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৫০ কোটি টাকা বেশি। প্রকল্পের আওতায় খনন কাজের মধ্যে মাদারীপুর-চরমুহুরিয়া, টেকেরহাট-গোপালগঞ্জ এলাকার দুই শতাধিক মৃত নৌপথ ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে। দীর্ঘ ৩৬ বছর পর একসঙ্গে তিনটি ড্রেজার সংযোজিত হয়েছে বিআইডব্লিউটিএ-র ড্রেজার বহরে। উত্তরাঞ্চলে পণ্য পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পাটুরিয়া-বাঘাবাড়ী নৌ-রুটে ২৪ ঘণ্টা খাদ্যশস্য, সার ও তেলবাহী জাহাজ চলাচলের জন্য ৫০ কিলোমিটার নৌ-পথে নাইট নেভিগেশন স্থাপন করা হয়েছে। ঢাকা শহরের চারদিকে নৌ-পথ চালুকরণ প্রকল্পের ২য় পর্যায়ের আওতায় নির্মিত কাঁচপুর ল্যান্ডিং স্টেশন ও টঙ্গী নদী বন্দর টার্মিনাল চালু করা হয়। দক্ষিণাঞ্চলবাসীর সুবিধার্থে বরিশাল নদী বন্দরে আধুনিক টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়েছে। আঞ্চলিকভাবে ডেক ও ইঞ্জিন কর্মী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু রয়েছে। মাদারীপুরের চরমুগুরিয়ায় প্রায় ৭ একর জমির ওপর একটি প্রশিক্ষণশালার কাজ শেষ পর্যায়ে। যানজট মুক্ত করার জন্য মাওয়া নদী বন্দর গড়ে তোলাসহ যাত্রীদের নির্বিঘ্নে বাসে ওঠা-নামার লক্ষ্যে ৫ লাখ বর্গফুট পরিমাপের একটি আধুনিক পার্কিং ইয়ার্ড নির্মাণ করা হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ-র চেয়ারম্যান ড. শামছুদ্দোহা খন্দকার ইত্তেফাককে বলেন, সড়ক ও রেলপথের ওপর চাপ কমানোসহ পণ্যের পরিবহন ব্যয় হ্রাসের লক্ষ্যে পানগাও অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার টার্মিনালের অবকাঠামো নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। যা বার্ষিক এক লাখ ৬০ হাজার টিইইউ’স হ্যান্ডলিং ক্ষমতাসম্পন্ন। এতে করে নৌ-পথে বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য কন্টেইনার সুবিধা রাজধানীর দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে এবং পণ্য পরিবহন ব্যয় কমে আসবে। তাছাড়া সড়ক ও রেলপথের ওপর চাপ কমে নগরীর যানজট বহুলাংশে হ্রাস পাবে এবং পণ্য নিরাপদে ও দ্রুত পৌঁছানোর কাজটি আরও সহজতর হবে। পাশাপাশি সড়ক ও রেলপথে যেখানে প্রতি কেজি পণ্য পরিবহন খরচ হয় ৪ থেকে ৫ টাকা, সেখানে খরচ হবে মাত্র ১ থেকে দেড় টাকা। ১৯৬৪ সালে কাঠের তৈরি বড় নৌকা ও এক ইঞ্জিন চালিত নিমজ্জিত নৌ-যান উদ্ধারের জন্য সংগ্রহ করা হয়েছিল হামজা। ১৯৮৩ সালে সংগ্রহ করা হয় রুস্তম। এ দুটিরই উত্তোলন ক্ষমতা ছিল ৬০ টন। সেখানে প্রতিটি ২৫০ টন উত্তোলন ক্ষমতা সম্পন্ন দু’টি নতুন উদ্ধারকারী ইউনিট সংগ্রহ করা হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে কিছুদিনের মধ্যে উদ্ধারকারী জাহাজ দু’টি দেশে এসে পৌঁছাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। বুড়িগঙ্গার তীরভূমি হতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে ঢাকা শহরকেন্দ্রিক নৌ-পর্যটন সুবিধাদি বৃদ্ধি এবং নদীর তীরে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে শ্যামপুরে উচ্ছেদকৃত ৭ একর জায়গার ওপর নয়নাভিরাম ইকোপার্ক এবং বুড়িগঙ্গার তীরে ১৫ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে।