জ্বলছে না চুলা
প্রকাশ : ৩০ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:২০
শীতে প্রতিবারের মত গ্যাস সংকট এবারও শুরু হয়েছে। শীত আর এই সংকট যেন এক সঙ্গে গাঁথা। ঠান্ডা, তাই পাইপে গ্যাস সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় চাপ কমে যাচ্ছে। আর এই চাপ বাড়াতে যেন কারো হাতে কোন উপায় নেই। তাই অপেক্ষা গরমের।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উত্পাদন আগের মতই হচ্ছে। ব্যতিক্রম কিছু নেই। শুধু শীতের কারণেই সংকট। আগামী বছর সংকট কমবে বলে কোন নিশ্চয়তা নেই। আবাসিক, শিল্প, বিদ্যুত্ সব শ্রেণীর গ্রাহক গ্যাস সমস্যায় ভুগছে। পাইপে যে গ্যাস আসছে তা দিয়ে প্রয়োজনীয় কাজ মিটছে না। দিনে গ্যাসের চাপ কম। রাতেও টিম টিম করে জ্বলে। শিল্পের চাকা যেমন ঠিকমতো ঘুরছে না, তেমনই জ্বলছে না বাসা-বাড়ির রান্নার চুলা। কর্তৃপক্ষ বলছে, পাইপ লাইনের সীমাবদ্ধতার কারণে সমস্যার সমাধান করা যাচ্ছে না। গ্রাহক বেড়েছে কয়েকগুণ। কিন্তু পাইপ লাইন বাড়েনি মোটেও। ফলে যখন সবাই একসঙ্গে গ্যাস ব্যবহার করছে তখন চাপ কমে যাচ্ছে। যেখানে আছে এক ইঞ্চি পাইপ সেখানে প্রয়োজন পাঁচ ইঞ্চি পাইপ লাইন। কিন্তু সেই এক ইঞ্চি পাইপ পরিবর্তন হচ্ছে না। সাথে যোগ হয়েছে শীত। উত্পাদনের তুলনায় চাহিদাও বেড়েছে। প্রয়োজনে আবাসিক গ্রাহকদের সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহারের অনুরোধ করেছে কর্তৃপক্ষ।
পাইপ লাইনের গ্যাস গ্রাহকদের সমস্যার সাথে সাথে যারা সিলিন্ডার ব্যবহার করেন তাদেরও ভোগান্তি বেড়েছে। সরকারের নির্দিষ্ট করা দামে কোন স্থান থেকেই সিলিন্ডার গ্যাস বা এলপি গ্যাস কেনা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরকারের নির্ধারণ করা দামের থেকে দ্বিগুণ দামে কিনতে হচ্ছে এলপি গ্যাস। সিলিন্ডার গ্যাসের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোন উদ্যোগ নেই। নেই কোন তদারকি। ব্যবসায়ীরা যেখানে যেমন ইচ্ছে দাম নিচ্ছেন। যখন তখন দাম বাড়াচ্ছেন।
কাগজে কলমে গ্যাসের নতুন সংযোগ না দিলেও চাহিদা বাড়ছে। নতুন গ্রাহক না হলেও বর্তমান গ্রাহকদের চাহিদা বেড়েছে বলা হচ্ছে। এছাড়া অবৈধ সংযোগের সংখ্যাও বেড়েছে। ফলে গ্যাসের চাহিদা বেড়ে গেছে। কিন্তু একই পরিমাণে উত্পাদন বাড়েনি। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী নিকট ভবিষ্যতে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ার কোন সম্ভাবনা নেই। বরং গ্যাস ভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ উত্পাদনে আসলে এই সংকট আরো বাড়বে। দেশে বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা আছে দৈনিক গড়ে প্রায় ২৫০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু গড়ে সরবরাহ করা হচ্ছে ২০০ কোটি ঘনফুট। বিদ্যুতে গ্যাসের চাহিদা ছিল তুলনামূলক কম। সার উত্পাদনের জন্য চাহিদা ছিল গড়ে ৩০ কোটি ঘনফুট। এছাড়া শিল্প, সিএনজি, আবাসিক ও অন্য গ্রাহকদের মধ্যে সরবরাহ করা হয়েছে অবশিষ্ট গ্যাস।
দৈনিক প্রায় ২০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্পাদন হচ্ছে। এরমধ্যে দেশীয় কোম্পানিগুলো উত্পাদন করছে গড়ে ৯০ কোটি ঘনফুট। যার মধ্যে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড লি. গড়ে ৭৫ কোটি ঘনফুট, সিলেট গ্যাস ফিল্ড লি. ৯ কোটি ঘনফুট ও বাপেক্স উত্পাদন করে দৈনিক তিন কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট। বিদেশি কোম্পানিগুলোর মধ্যে শেভরন জালালাবাদ থেকে গড়ে ২০ কোটি, মৌলভীবাজার থেকে ৪ কোটি ৫০ লাখ এবং বিবিয়ানা থেকে ৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্পাদন করছে। এছাড়া তাল্লো বাঙ্গুরা থেকে ৩৯ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্পাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করছে।
ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকার আবাসিক গ্রাহকরা অভিযোগ করে বলেন, দিনের বেলা একেবারেই গ্যাস থাকে না। নিভু নিভু করে যা থাকে তাতে কোন কাজই করা যায় না। রান্না খাওয়ার খুব ঝামেলা। রাতে অল্প অল্প গ্যাস আসে। যার কারণে এক সাথে বেশি করে রান্না করে রাখতে হয়। ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয়, তবু গ্যাসের দেখা পাওয়া যায় না। এ অভিযোগ শুধু গৃহিণীদের না। শিল্প- বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিকদেরও।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. হোসেন মনসুর এবিষয়ে ইত্তেফাককে বলেন, সংকট কিছু আছে। শীত আসলে এ সংকট হবেই। ঠান্ডার কারণে পাইপ লাইনে গ্যাসের সঙ্গে থাকা তেল জমে যায়। এই কারণে পাইপের ব্যাস কমে যায়। এতে গ্যাসের চাপও কমে যায়। তাপমাত্রা যত কমবে তত গ্যাসেরও সমস্যা হবে। পাইপের সীমাবদ্ধতার কারণে সে উত্পাদন বাড়াতে পারছি না। শীতের সময় এ সমস্যা একটু মেনে নিতেই হবে। রাজধানীর সব এলাকায় গ্যাস সমস্যা একেবারে মেটাতে পুরো পাইপ লাইন নতুন করে করতে হবে। সরকার একাজের উদ্যোগও নিয়েছে। তবে তার জন্য সময়ের প্রয়োজন। চেয়ারম্যান বলেন, গত দুই বছরে প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের উত্পাদন বেড়েছে। আবাসিক এলাকায় গ্যাসের বেশি সমস্যা হলে সিলিন্ডার ব্যবহারের অনুরোধ করেন পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান।
তিতাসের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা বলেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় ঘাটতি তো হচ্ছেই। পাশাপাশি শীতের কারণে চাহিদা আরো বেড়েছে। শীতে গ্যাসের পাইপ লাইনে গ্যাসের সঙ্গে থাকা তেল জমেও সরবরাহ কিছুটা বিঘ্নিত করে। গ্যাস সংকটের অভিযোগ পেলেই তিতাস খতিয়ে দেখছে। সম্ভব হলে সঙ্গে সঙ্গেই সমাধানের উদ্যোগও নিচ্ছে।