খালাফ হত্যা মামলায় ৫ আসামির মৃত্যুদণ্ড

সৌদি দূতাবাস কর্মকর্তা খালাফ আল আলী হত্যা মামলায় পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। গতকাল রবিবার দুপুরে ঢাকার চার নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মোতাহার হোসেন এ রায় ঘোষণা করেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন, সাইফুল ইসলাম ওরফে মামুন, মো. আল আমীন, আকবর আলী লালু ওরফে রনি, রফিকুল ইসলাম খোকন ও সেলিম চৌধুরী ওরফে সেলিম আহম্মেদ। এর মধ্যে সেলিম আহম্মেদ পলাতক রয়েছেন। গতকাল চার আসামিকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। দণ্ডপ্রাপ্ত এই পাঁচজনের বিরুদ্ধে দক্ষিণখান থানায় আরো একটি অস্ত্র আইনে মামলা রয়েছে। গত ৫ মার্চ রাত সোয়া ১টার দিকে গুলশানের ১২০ নম্বর সড়কে সৌদি দূতাবাস কর্মকর্তা খালাফ আল আলী সন্ত্রাসীদের দ্বারা গুলিবিদ্ধ হন। ভোরে গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনার পর ৪ জুন দক্ষিণখানের উত্তর গাওয়াইর এলাকা হতে সাইফুল ইসলাম মামুন (২৪), আল-আমিন (২৫), আকবর আলী লালু ওরফে রনিকে (২৪) গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাদের কাছ থেকে একটি কালো রংয়ের বিদেশি পয়েন্ট টুটু বোরের রিভলবার উদ্ধার করে। উদ্ধার করা রিভলবারটি জার্মানির আরমানিস কোম্পানির তৈরি। এর সিরিয়াল নম্বর-১৬১৬৮১৯। রিভলবারটির লাইসেন্স করা ছিল। পরে গ্রেফতারকৃতরা জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর খিলক্ষেতে সেবা ক্লিনিকের মালিক আবুল হোসেনের বাড়িতে ডাকাতির সময় তার লাইসেন্সকৃত রিভলবারটি নিয়ে আসে। ওই রিভলবারটি ছিনতাইয়ে ব্যবহার করতো। রিভলবারটি আদালতের অনুমতি নিয়ে সিআইডিতে ব্যালিস্টিক (অস্ত্রের রাসায়নিক পরীক্ষা) টেস্টের জন্য পাঠানো হয়। এর আগে খালাফের দেহ থেকে উদ্ধার করা পয়েন্ট টুটু বোরের গুলিটিও সিআইডি ব্যালিস্টিক টেস্ট করে। ডিবি ওই গুলিটি কোন ধরনের অস্ত্র হতে ছোঁড়ে তা নির্ধারণের জন্য সিআইডির ব্যালিস্টিক বিশারদের কাছে পাঠায়। ব্যালিস্টিক বিশারদ মতামত দেন যে, ব্যবহূত গুলিটি লাইসেন্সকৃত রিভলবার হতে করা (নিক্ষিপ্ত) হয়েছে। পরে গ্রেফতারকৃত তিনজনের দেয়া তথ্যমতে গত ২৪ জুলাই রাতে ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন মানিকদী বাজারের আদর্শ বিদ্যানিকেতনের পাশে একটি গ্যারেজ থেকে হালকা সোনালি রঙের নিশান ব্র্যান্ডের একটি প্রাইভেট কার উদ্ধার করে। এই গাড়িটি রফিকুল ইসলাম খোকন ব্যবহার করে। ডিবি মানিকদী বাজারের বাসা থেকে খোকনকে গ্রেফতার করে। এর আগে খোকন ছিনতাইয়ের অভিযোগে পুলিশের হাতে দু’বার গ্রেফতার হয়েছিল। গ্রেফতারকৃতদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। পরে ডিবি ২৪ সেপ্টেম্বর আদালতে ৫ জনকে আসামি করে এই মামলার চার্জশিট দেয়। চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়, আসামিরা পেশাদার ছিনতাইকারী। তারা এর আগেও রাজধানীতে কয়েকটি ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা ঘটিয়েছে। ঘটনার দিন গুলশান ১২০ নম্বর সড়কে বিদেশি ব্যক্তিকে হাঁটতে দেখে ডলার পাওয়ার আশায় খালাফকে ঘিরে ধরে। এ সময় ছিনতাইকারীদের সঙ্গে খালাফের ধস্তাধস্তি হয়। এরই এক পর্যায়ে আসামি সাইফুল ইসলাম মামুন পয়েন্ট টুটু বোরের রিভলবার দিয়ে গুলি করে। । গত ৩১ অক্টোবর মামলার চার্জগঠনের পর মাত্র দুই মাসেই এ বিচারকাজ শেষ করলো ট্রাইব্যুনাল। ৬ ডিসেম্বর চার্জশিটভুক্ত ৩৩ সাক্ষীর সাক্ষ্য শেষ হয়। ১৭ ডিসেম্বর মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে। ২০ ডিসেম্বর আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪ এর বিচারক মো. মোতাহার হোসেন গতকাল রবিবার রায় ঘোষণার তারিখ ধার্য করেন। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের পরিচয় : সাইফুল ইসলাম ওরফে মামুনের বাড়ি বাগেরহাটের শরণখোলার মধ্য খমতাকাটা গ্রামে। তিনি মৃত আব্দুল মোতালেব হাওলাদারের ছেলে। আল আমিনের বাড়ি পটুয়াখালীর হাজিখালী গ্রামে। তার পিতার নাম ফারুক ঘরামি। আকবর আলী লালু ওরফে রনির বাড়ি শরিয়তপুরের ডামুড্ড্যার গোয়ালকোয়া গ্রামে। তার পিতার নাম আব্দুল জলিল। রফিকুল ইসলাম খোকনের বাড়ি ময়মনসিংহের কোতয়ালী থানার নাটকঘর বাইলেনে। তার পিতার নাম আব্দুস সালাম। পলাতক সেলিম চৌধুরী ওরফে সেলিম আহম্মেদের বাড়ি ভোলা জেলার শশীভূষণ থানাধীন উত্তর চরমঙ্গলে। তার পিতার নাম সিদ্দিক আহমেদ চৌধুরী। রায় ঘোষণার পর আসামিরা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। রায় ঘোষণা শেষে আসামিদের প্রিজনভ্যানে তোলার সময় আত্মীয়-স্বজনরা চিত্কার করে কান্নাকাটি করলে আসামিরা তাদেরকে সান্ব্তনা দেন। এ সময় আসামি আল আমিনের বাবা ফারুক, আকবর আলী লালু ওরফে রনির স্ত্রী নূরজাহান আদালত প্রাঙ্গণে চিত্কার করে কান্নাকাটি করছিলেন। তারা আসামিদের নির্দোষ দাবি করে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়া হয়েছে বলে দাবি করেন। তারা বলেন, ‘আসামিরা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নয়। তারা ন্যায় বিচার পাননি। সরকারের চাপেই ট্রাইব্যুনাল আসামিদের ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন।’ রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আসামিপক্ষের আইনজীবী হাবিবউল্লাহ জানান, এ মামলার কোনো প্রত্যক্ষ সাক্ষী নেই। আসামিরাই যে খালাফকে হত্যা করেছে, তা রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে পারেনি। শুধু রাষ্ট্রীয় চাপেই আসামিদের এ দণ্ড দেয়া হয়েছে। এ রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করবেন বলেও জানান তিনি। তবে রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সংশ্লিষ্ট আদালতের বিশেষ পিপি এসএম রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ডাকাতি করতে গিয়ে হত্যা মামলার কোনো প্রত্যক্ষ সাক্ষী থাকে না। পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য প্রমাণ দ্বারাই আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল এ রায় দিয়েছেন।’