রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা নিয়েই শুরু হচ্ছে নতুন বছর

আর কয়েক ঘণ্টা পরেই বিদায় নেবে ইংরেজি ২০১২ সাল, যাত্রা শুরু করবে নতুন বছর ২০১৩। দেশের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা এবং রাজনীতির জন্য ২০১৩ সাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন বছরটি একদিকে যেমন বর্তমান মহাজোট সরকারের মেয়াদের শেষ, তেমনি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বিরোধী দলের চূড়ান্ত আন্দোলনের সময়। তবে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা কি হবে, তা নিয়ে এখনও সম্পূর্ণ বিপরীত এবং অনড় অবস্থানে সরকার ও বিরোধী দল। সর্বশেষ গত শনিবার অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনে দলটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট বলা হয়েছে, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ীই আগামী নির্বাচন হবে। পক্ষান্তরে গত ২৬ মার্চ ঢাকায় গণসংযোগকালে বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়া পূর্বের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া ১৮ দল নির্বাচনে যাবে না, এমনকি দলীয় সরকারের অধীনে দেশে কোনো নির্বাচনও হতে দেয়া হবে না। বিদায়ী বছরের শেষ মুহূর্তেও দুই পক্ষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে একটুকু নড়েনি। ফলে রাজনৈতিক সমঝোতার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা নিয়েই পথ চলা শুরু করতে যাচ্ছে ২০১৩ সাল। আওয়ামী লীগের পুনঃনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম শনিবার দলের জাতীয় সম্মেলনে বলেছেন, বর্তমান সরকারের আমলে সবক’টি স্থানীয় নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়েছে। তাহলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে না? সংবিধান অনুযায়ীই আগামী সংসদ নির্বাচন হবে উল্লেখ করে তিনি এ ব্যাপারে দলীয় নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার পরামর্শ দেন। সরকারি দলের এরকম শক্ত অবস্থান সম্পর্কে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, আমরা যত আন্দোলন করছি এবং দাবি জানাচ্ছি, সরকার ততোই কঠিন মনোভাব দেখাচ্ছে। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের। আমরা চাই বর্তমান সরকার নির্ধারিত মেয়াদের শেষদিন পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকুক। আমাদের দাবি একটিই। সেটা হল—নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে, দলীয় সরকারের অধীনে দেশে কোনো নির্বাচন হবে না। তিনি বলেন, সরকার যতোই কঠোর মনোভাব দেখাক না কেন, এদেশে কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনই ব্যর্থ হয়নি, এবারও হবে না। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান মহাজোট সরকারের মেয়াদের শেষ ৯০ দিনে দশম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচনের সময়ও বর্তমান সংসদ থাকবে। ফলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, তার মন্ত্রিসভা ও বর্তমান সংসদ সদস্য সবাই ওই ৯০ দিনে স্বপদে বহাল থাকবেন। স্ব-স্ব পদে বহাল থেকেই তারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। অবশ্য কিছুদিন আগে সংসদে এক বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সংসদ ভেঙ্গে দিয়েই নির্বাচন হবে। বাংলাদেশ সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন শনিবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, তড়িঘড়ি করে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাদ দেয়া হয়েছে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান মাত্র পাঁচ মিনিটেই সম্ভব। তিনি বলেন, আমরা তত্ত্বাবধায়ক শব্দ নিয়ে টানাটানি করতে চাই না, আমরা চাই অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। জাতীয় পার্টি-জেপি’র সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে বলা হয়েছে, দেশে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অক্ষণ্ন রাখতে হবে। গত ২৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত জেপির কাউন্সিলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা অভিন্ন কণ্ঠে বলেছেন, কোনো অজুহাতেই গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করা যাবে না। আমরা এমন নির্বাচন চাই, যে নির্বাচনে সকল রাজনৈতিক দল এবং ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেবে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছাড়া গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেয়া যাবে না বলেও মত দেন তারা। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট শরিক এলডিপি’র কাউন্সিল হয়েছে গত ১ ডিসেম্বর। সেখানে ১৮ দলের নেতারা বলেছেন, তারাও চান দেশে গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বজায় থাকুক। এর আগে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কাউন্সিল থেকেও সবার অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে। রাজনীতি বিশ্লেষক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পিয়াস করিম গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে, নতুন বছরের যাত্রাপর্বে আমাদের জন্য কোনো সুখবর নেই। দেশটা দ্রুত সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সৃষ্ট দ্বন্দ্বের অবসান না হলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ভেঙ্গে যাওয়ার সমূহ আশঙ্কা দেখা দেবে বলে মনে করছেন তিনি।