পাকিস্তান সফরে যাচ্ছে না বাংলাদেশ
প্রকাশ : ৩১ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:৩২
সমালোচনা, প্রতিবাদ, বিতর্ক, মানববন্ধন, সবই চলছিল। চারদিক থেকে দাবি উঠছিল, বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের যেন পাকিস্তান সফরে না পাঠানো হয়। এতোদিন পর্যন্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এ ব্যাপারে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগার কথা জানিয়েছে। অবশেষে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে বিসিবি। গতকাল আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন—আপাতত পাকিস্তান সফর করছে না বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। সেখানকার পরিস্থিতি এখনও পর্যন্ত ক্রিকেটারদের সফর করার মতো নিরাপদ বলে মনে করছে না বিসিবি। একইসঙ্গে বিসিবি সভাপতি বলেছেন, তাদের এ সিদ্ধান্তের ফলে ভবিষ্যত্ প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে; তা তারা জানেন। তারপরও ক্রিকেটারদের নিরাপত্তার স্বার্থেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানালেন তিনি।
বেশ কিছুদিন ধরে পাকিস্তান সফর নিয়ে দেশে ও দেশের বাইরে অস্থিরতা বিরাজ করছিল। মূলত পাকিস্তান নিরাপদ নয় জেনেও বিসিবি সেখানে সফর করার সিদ্ধান্ত নেয়ায় সমালোচনার ঝড় বইছিল। পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও এখন শান্ত নয়। এখনো পথে-ঘাটে আত্মঘাতী বোমা হামলার মত ঘটনা ঘটছে। এসব কারণে বিসিবি কিছুদিন ধরে নিজেরাও আলাপ-আলোচনা চালিয়ে গেছে। বিসিবি সভাপতি পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বললেন, ‘আজ এই অবস্থায় সফরটি নিয়ে আমরা শংকিত। সেখানে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির লক্ষণ নেই। বিষয়টি নিয়ে দেশবাসীও উদ্বিগ্ন। এখানকার পরিস্থিতি এবং সমস্ত ঘটনা জানিয়ে আমরা পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) কাছে তিনদিন আগে চিঠি দিয়েছি। কেন আমরা এখন পাকিস্তান সফরে যাব না সেটার ব্যাখ্যাও দিয়েছি। আসলে আমাদের এখনি পাকিস্তান যাওয়াটা সমীচীন হবে না’।
পাকিস্তান সফরে যাওয়ার ব্যাপারে অবশ্য বাংলাদেশ লিখিতভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। লিখিত প্রতিশ্রুতিটা এসেছে মূলত আইসিসি’র সর্বশেষ সভায়। বিসিবি’র সাবেক বোর্ড সভাপতি আ হ ম মোস্তফা কামাল এমপি আইসিসি’র সহ-সভাপতি হওয়ার লক্ষ্যে সভায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন; তার সে প্রতিশ্রুতি সভার কার্যবিবরণীতে লিপিবদ্ধ হয়েছে। তার প্রতিশ্রুতির কারণে আইসিসি’র সহ-সভাপতি পদের জন্য পাকিস্তানের পূর্ণ সমর্থনও পেয়েছেন তিনি। লিখিত প্রতিশ্রুতির কারণেই বিসিবি এখন সফর নিয়ে বিপাকে। কাল এ বিষয় কথা বলতে গিয়ে পাপন বলেন, ‘আমরা পিসিবি’র কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ । আইসিসি’র বোর্ড সভার কার্যবিবরণীতে সেটা লিখিতভাবে রয়েছে। পাকিস্তান সফরের ব্যাপারে ‘আনকন্ডিশনাল’ শব্দটিও লেখা আছে। এমনকি আইসিসি’র অফিসিয়াল ম্যাচ রেফারি নাও পাঠায় তবুও আমাদের যেতে হবে এই লিখিত প্রতিশ্রুতির কারণে’।
আইসিসি’র সহ-সভাপতির জন্য পিসিবি’র কাছে লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সাবেক বোর্ড সভাপতি। দৃশ্যত এই বিষয়টির জন্য সমালোচিত হচ্ছেন তিনি। ব্যক্তিস্বার্থের জন্য মোস্তফা কামাল এ ধরনের লিখিত চুক্তি করেছেন বলেও কথা উঠেছে অনেক। তবে বোর্ড সভাপতি মোস্তফা কামালের প্রসঙ্গ এড়িয়ে বর্তমান বোর্ড সভাপতি বললেন, ‘আমি মনে করি না এটা ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য করা হয়েছে। এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিসিবি, প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ। তবে সে সময় কেন এই প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে এটা আমার জানা নেই’।
পাকিস্তান সফরে যাওয়ার জন্য আইসিসি’র একটি নিরাপত্তা দলও পাঠানোর কথা ছিল। এমনকি তাদের ম্যাচ রেফারিও সেখানে পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতির পর আইসিসিও বিসিবি’র সাথে এই সফর নিয়ে যোগাযোগ করছে না। এ প্রসঙ্গে বিসিবি সভাপতি বলেন, ‘আমরা এ পর্যন্ত আইসিসিকে পাঁচটি চিঠি দিয়েছি কিন্তু কোন জবাব নেই। অন্য বিষয়ে চিঠি দিলে সঙ্গে সঙ্গে জবাব পাই, অথচ এই বিষয়ের কোন জবাব নেই’।
বাংলাদেশ দলকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা দিবে পিসিবি। কিন্তু সে দেশের মন্ত্রীদেরই তো নিরাপত্তা নেই! বিমানবন্দরে বোমা হামলা হচ্ছে। গাড়িতে আত্মঘাতী বোমা হামলা ঘটেছে। গত শনিবার পেশোয়ারের পুলিশ ব্যারাক থেকে ২১ পুলিশকে ধরে নিয়ে হত্যা করেছে তালেবান জঙ্গিরা। এতকিছুর পরও সাবেক বোর্ড সভাপতি কিভাবে পাকিস্তানকে লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন- তা নিয়েই সমালোচনার ঝড় বইছে। বাংলাদেশ দল পাকিস্তানে না গেলে দুই দেশের সম্পর্কে ফাটল ধরবে। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) খেলোয়াড় পাঠাবে না। ২০১৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দল পাঠাবে না তারা। অনেক জটিল সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে বাংলাদেশ। বিষয়টি অস্বীকারও করেননি বোর্ড সভাপতি। পাপন বলেন, ‘সমস্যাটা জটিল। সেখানে দল না গেলে অনেকগুলো পরিস্থিতি খারাপের দিকে যেতে পারে। বিপিএলে হয়তো তারা খেলোয়াড় পাঠাবে না। পাকিস্তান ক্রিকেট দলও বাংলাদেশে আসবে না। এমনকি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও তারা অংশ নাও নিতে পারে। যেহেতু আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছি তাই সেটা রক্ষা করা উচিত। তবে আপাতত সেখানে যাওয়া হচ্ছে না। কখন পাকিস্তান সফর করবো সেটা নির্ধারণ করা হয়নি’।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের ৩ মার্চ পাকিস্তানের লাহোরে শ্রীলংকান দলকে বহন করা বাসে সন্ত্রাসীদের হামলায় আটজন নিরাপত্তাকর্মী মারা যান। যদিও শ্রীলংকান খেলোয়াড়রা অক্ষত ছিলেন। এরপর থেকে আন্তর্জাতিক কোন দল পাকিস্তান সফর করেনি। পাকিস্তানও স্বাগতিক হিসেবে দুবাই ও আবুধাবিতে ক্রিকেট সিরিজ খেলেছে। প্রায় চার বছর পর ফের আন্তর্জাতিক ম্যাচ হওয়ার সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছিল সেখানে কিন্তু নিরাপত্তার কারণে সেটাও বাতিল হল।