তাজরীন ফ্যাশনের ভেতরের লোকই আগুন লাগাতে পারে

আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা পরিকল্পিত হতে পারে বলে মনে করছে পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর তদন্ত কমিটি। আর এ ঘটনায় কারখানার অভ্যন্তরের কিছু লোক জড়িত থাকতে পারে। আগুন লাগার আগে বহিরাগত কেউ প্রবেশ করেছিল এমন কোন সাক্ষ্য বা প্রমাণ পায়নি তদন্ত দল। কারখানার মধ্যম সারির কয়েকজন কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করে তদন্ত কমিটি বলেছে, তাদের আইনের আওতায় নিয়ে এসে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে রহস্য উন্মোচিত হবে। গতকাল রাজধানীর কাওরান বাজারের বিজিএমইএ মিলনায়তনে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। বিজিএমইএ সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন তা পড়ে শোনান। এসময় বিজিএমইএ দ্বিতীয় সহ-সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান, সহ-সভাপতি (অর্থ) ও তদন্ত কমিটির প্রধান এসএম মান্নান কচিসহ তদন্ত কমিটির অন্য সদস্য ও বিজিএমইএ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সাংবাদিক সম্মেলনে বলা হয়, কারখানায় আগুন লাগার প্রত্যক্ষদর্শী ও কারখানা কর্তৃপক্ষ এবং আহত শ্রমিকসহ বিভিন্ন জনের সঙ্গে কথা বলে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে তদন্ত কমিটি। ১১ সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, একদিকে যেমন কারখানায় প্রশাসনিক ব্যবস্থা যথাযথ ছিল না, অপরদিকে প্রথম তলায় কর্মরত লোডার, গার্ড, বয়লার অপারেটর এবং কিছু মধ্যম সারির কর্মকর্তার সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড ও গতিবিধি এবং শ্রমিকদের কারখানা থেকে বের হতে বাধা প্রদান উদ্দেশ্যমূলক একটি ঘটনার যথেষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। তবে সার্বিক বিষয় পর্যালোচনায় কারখানার অভ্যন্তরের কিছু লোক ইমপ্লামেন্টেড (প্রোথিত) ছিল এবং এই অগ্নিকাণ্ডের পেছনে তাদের কোন খারাপ উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে প্রতীয়মান হয়েছে। বিষয়টি আওতায় নিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত করার জন্য সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। গত ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরের ওই কারখানায় আগুন লেগে ১১২ জন নিহত এবং ৮০ জন আহত হয়। পরদিনই বিজিএমইএর পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ?তাজরীন কারখানার নিচতলায় যদি অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত গুদাম না থাকত, অথবা গুদামের চারপাশ যদি দেয়াল দিয়ে ঘেরা থাকত এবং ভবনের প্রতিটি সিঁড়ি যদি কারখানার বাইরে এসে শেষ হতো, তাহলে হতাহতের সংখ্যা এতো বেশি হতো না। গোডাউনে মজুদ করা পদার্থে আগুন লাগায় বিষাক্ত ঘণকালো ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়, পরে ভবনের বিদ্যুত্ লাইনের মেইন সুইচ বন্ধ করে দেয়ায় অন্ধকার ও ধোঁয়ার মধ্যে উপরের তলা থেকে শ্রমিকরা একই সময়ে নামতে গিয়ে বাধা পায়। ফলে জটলার সৃষ্টি হয়। আর এতে শ্রমিকরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ায় হুড়োহুড়ি করে বের হতে যাওয়ার সময় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায়। পরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এসব লাশও পুড়ে যায় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রতিবেদন বলা হয়েছে, ওই কারখানার ৪ জন কাটিং লোডার, সিকিউরিটি ইনচার্জ, নিরাপত্তা প্রহরী, বয়লার অপারেটর, লোডার ও লোডার সর্দারকে ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেটিং টিমের মাধ্যমে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা যেতে পারে। সর্বোপরি যে সকল কর্মকর্তা ফায়ার এলার্ম বাজার পরে শ্রমিকদের নিচে নেমে আসতে বাধা প্রদান করেছিল, তাদেরকেও ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেটিং টিমের মাধ্যমে তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদ প্রকৃত তথ্য উদঘাটন ও আইনের আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে। এর আগে গত ১৭ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাজরীন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ড বিষয়ে একটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যেখানে এ ঘটনাকে নাশকতা উল্লেখ করা হয় এবং শতাধিক শ্রমিকের প্রাণহানির জন্য তাজরীন ফ্যাশনসের মালিক দেলওয়ার হোসেনসহ প্রতিষ্ঠানটির আরো নয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করা হয়। এছাড়া নাশকতার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করতে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে কমিটি করতে বলে ওই তদন্ত কমিটি। এদিকে তাজরীনের ঘটনা খতিয়ে দেখতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, প্রশাসন, ফায়ার ব্রিগেড ও পুলিশের পক্ষ থেকেও আলাদা কমিটি করা হয়।