খাবার স্যালাইন উত্পাদনে নিয়ন্ত্রণ নেই ওষুধ প্রশাসনের
প্রকাশ : ৩১ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৪১
ডায়রিয়ায় জীবন রক্ষাকারী খাবার স্যালাইন (ওরস্যালাইন) উত্পাদনে ওষুধ প্রশাসনের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই বললেই চলে। ফলে বিষাক্ত দ্রবণ সংমিশ্রণে তৈরি নকল ও ভেজাল স্যালাইনে বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। এসব নকল ও ভেজাল স্যালাইন সারাদেশে প্রকাশ্যে বাজারজাত করা হচ্ছে। ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর বিষয়টি জানলেও এগুলো বন্ধে কার্যকর কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধিদফতরের দুই শীর্ষ কর্মকর্তা বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে জানান, এসব স্যালাইন কেউ কেউ ‘ফুড সাপ্লিমেন্ট’ হিসেবে তৈরি করে বাজারজাত করছে। এটা এক ধরনের প্রতারণা। আবার অনেকে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউট- বিএসটিআই এবং বাংলাদেশ কাউন্সিল অফ সায়েন্টিফিক এন্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ-বিসিএসআইআর অনুমোদিত দেখিয়ে দেদারসে স্যালাইন বাজারে ছাড়ছে। ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় বাজারজাত করা এসব খাবার স্যালাইনের ৯৮ ভাগই নিম্নমানের ও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক দিয়ে তৈরি বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, শুধু চিনি ও লবণ দিয়ে স্যালাইন তৈরি করা হয়েছে।
ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরির একজন কর্মকর্তা বলেন, ওরস্যালাইনে সোডিয়াম ক্লোরাইড, পটাসিয়াম ক্লোরাইড ও গ্লুকোজ থাকতেই হবে। তাহলে ডায়রিয়া প্রতিরোধে ওই স্যালাইন কাজ করবে। এসব উপকরণ ছাড়া তৈরি স্যালাইন খেলে ডায়রিয়া আরও বাড়তে পারে। এতে কিডনি দ্রুত নষ্ট হয়ে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এছাড়া শারীরিক দুর্বলতা ছাড়াও অন্যান্য জটিল ব্যাধি হওয়ার আশংকা থাকে বলে ওই কর্মকর্তা জানান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দেশে মাত্র ২/১টি নামিদামি কোম্পানি মানসম্মত খাবার স্যালাইন তৈরি করে থাকে। কিন্তু নকল ও ভেজাল স্যালাইনের দাপটে আসলগুলো বাজারে খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর। অভিযোগ উঠেছে, দেশে টেস্টি স্যালাইনের নামে ডায়রিয়া রোগীদের ‘বিষ’ খাওয়ানো হচ্ছে। পরীক্ষায় টেস্টি স্যালাইনে চিনি, লবণ ও সাইট্রিক এসিড থাকার প্রমাণ পেয়েছে ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরি। শুধুমাত্র খেতে যেন একটু টক টক লাগে সে কারণে সাইট্রিক এসিড দেয়া হচ্ছে; যা সবক্ষেত্রে উপকারী না-ও হতে পারে বলে ল্যাবরেটরি কর্মকর্তারা জানান।
সূত্র আরো জানায়, ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরি থেকে নকল ও ভেজাল খাবার স্যালাইন বিষয়ক রিপোর্ট নিয়মিত ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরে পাঠানো হয়। কিন্তু এসব খাবার স্যালাইন প্রস্তুতকারী কোম্পানির বিরুদ্ধে কোন ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না। উল্টো এসব ভেজাল স্যালাইন উত্পাদন ও বাজারজাতকারী কোম্পানির কাছ থেকে অধিদফতরের এক শ্রেণীর কর্মকর্তা নিয়মিত মোটা অংকের উেকাচ পেয়ে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে এসব খাবার স্যালাইন নিয়ন্ত্রণে অধিদফতর কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এ ব্যাপারে প্রশাসন ‘চিরনিদ্রায়’ রয়েছে-এমন মন্তব্যও করেছেন অনেকে ।
তবে অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেন, ওষুধ হিসেবে নয়, ‘ফুড সাপ্লিমেন্ট’ দেখিয়ে অধিকাংশ ওরস্যালাইন বাজারজাত করা হচ্ছে। কোন কোন ওরস্যালাইনের গায়ে বিএসটিআই ও সায়েন্স ল্যাবরেটরির অনুমোদিত বলে উল্লেখ থাকে। এ কারণে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর ওইগুলো ভেজাল ও নিম্নমানের জেনেও সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে না। তারা আরও জানান, রোগ প্রতিরোধমূলক যে কোন উপকরণ ওষুধ হিসেবে ধরা অত্যাবশ্যকীয়। ডায়রিয়া প্রতিরোধে কিংবা দুর্বলতারোধে ওরস্যালাইন তৈরি করলে তা ওষুধ হিসেবে অধিদফতরের তালিকাভুক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু ফুড হিসেবে বাজারজাত করায় এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এসব স্যালাইন জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ বলেও তারা মন্তব্য করেন।
এ ব্যাপারে বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক একে ফজলুল আহাদ ইত্তেফাককে জানান, বিএসটিআইয়ের তালিকায় ওরস্যালাইন থাকার প্রশ্নই ওঠে না। তাছাড়া ওরস্যালাইন উত্পাদনের অনুমোদনও আমরা দেই না। কেউ আমাদের নাম ব্যবহার করলে এটা অবশ্যই প্রতারণা। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে বিসিএসআইআর এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক এআই মোস্তফা বলেন, কয়েকটি কোম্পানিকে আমাদের ফর্মুলায় খাবার স্যালাইন তৈরির অনুমোদন দেয়া হয়েছে, তবে সেই সংখ্যা খুবই কম। তবে ভেজাল ও নকল স্যালাইন কাদের সে ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না বলে জানান।