নির্বাচন কমিশন যথেষ্ট স্বাধীন আর শক্তি বৃদ্ধির দরকার নেই

সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটিএম শামসুল হুদা মনে করেন, নির্বাচন কমিশনকে আর শক্তিশালী করার দরকার নেই। নতুন করে আরপিও (গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা নির্বাচনী আইন) সংশোধনেরও দরকার নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, নির্বাচন কমিশন এরই মধ্যে যথেষ্ট স্বাধীন হয়েছে। এখন শুধু আইন পালনের মনোবৃত্তি তৈরি হলেই বর্তমান আইনের আলোকে কমিশন সচ্ছন্দে কাজ করে যেতে পারবে। গতকাল সোমবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম ও নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এই অভিমত ব্যক্ত করেন। সিভিল সোসাইটির সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন এই আলোচনার আয়োজন করে। প্রসঙ্গত, ২০১২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদ থেকে বিদায় নেয়ার পর এই প্রথম বর্তমান কমিশন নিয়ে মুখ খুললেন ড. শামসুল হুদা। সুজনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সাবেক মন্ত্রী সরদার আমজাদ হোসেন, রাজনীতিবিদ মাহমুদুর রহমান মান্না, পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান ড. সাদাত হোসাইন, পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক প্রধান মোহাম্মদ আনোয়ারুল হক, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) সাখাওয়াত হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোস্তফা চৌধুরী প্রমুখ। সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন। বিচারপতি কাজী এবাদুল হকসহ আরও অনেক বিশিষ্টজন এতে উপস্থিত ছিলেন। শামসুল হুদা বলেন, ‘২০০৮ সালে সংসদ নির্বাচনের আগে আমরা শুনতে পেলাম যে সাবেক একজন মন্ত্রিপরিষদ সচিবসহ ডজনখানেক সদ্য অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেছেন। তখন আমরা একটি আইন করেছিলাম যে, সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর অন্তত তিন বছর নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া যাবে না। এদের ঠেকাতেই তখন এ আইন করা হয়। এখন প্রয়োজনে আইনটি পরিবর্তন করা যেতে পারে।’ বর্তমানকে কমিশনকে সবার সঙ্গে পরামর্শ করে আরপিও সংশোধন করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘এ কমিশন কি করছে না করছে আমি জানি না। শুনেছি কমিশন আরপিও সংশোধন করবে। আরপিও সংশোধনের কোনো দরকার আছে বলে মনে হয় না। তারপরও যদি করতেই হয় তাহলে রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যমসহ অন্যদের সঙ্গে সংলাপের ভিত্তিতেই তা করা উচিত। কারণ নির্বাচন করতে গেলে এদের নিয়েই করতে হবে। যদিও আরপিও সংশোধন বিষয়ে কারো সঙ্গে আলোচনা করতে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই। তবে আমরা এই সংলাপ ব্যবস্থা চালু করেছিলাম ক্ষমতাসীন সরকারের প্রভাব দুর্বল করার জন্য।’ নির্বাচন কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে শামসুল হুদা বলেন, ‘আইনে আছে সংসদের বাজেটে টাকা ছাড় হওয়ার পর কেউ নির্বাচন কমিশনের টাকা আটকাতে পারবে না। কিন্তু বাস্তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ে এসে এ টাকা ছাড়ের বিষয়টি আটকা পড়ে থাকে। প্রশাসনের মধ্যে একটি অংশ আছে যারা বিশেষ উদ্দেশ্যে এটা করে থাকে। তারা হয়তো চায়, নির্বাচন কমিশন এসে তাদের কাছে ধরনা দেবে।’ পাঁচ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে সাবেক এ সিইসি বলেন, ‘২০০৭-০৮ সালে যখন আমরা নির্বাচন কমিশনে গিয়েছিলাম, ‘তখনকার পরিস্থিতি আর এখনকার পরিস্থিতি এক নয়। তখনকার সরকার আমাদের সহায়তা করেছিল। বর্তমান সরকারও দায়িত্ব পালনে কোনো হস্তক্ষেপ করেনি। তবে হয়তো অনেক সময় সহযোগিতা পাইনি। এছাড়া সংসদ সদস্যরা ব্যক্তিগতভাবেও হস্তক্ষেপ করেন।’ তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন বিষয়ে আমরা বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক দলগুলোকে চিঠি দিয়েছিলাম। তারা প্রায় একই ভাষায় উত্তর দেয়। এই ক্ষেত্রে বিএনপি আর আওয়ামী লীগের ভাষাও প্রায় অভিন্ন। আমি জানি না, তারা আলোচনা করে উত্তর দেন কিনা। একজন নেতা আমাকে বলেছেন, পাল্টাতে সময় লাগবে। অনেক দিনের কালচার (সংস্কৃতি)। আমিও আশাবাদী। আইন যখন হয়েছে, সবাই এক সময় মানতে বাধ্য হবে। আমাদের হাতে তো পুলিশ-আর্মি নাই যে আমরা তাদের ধরে নিয়ে আসবো। তাই ভবিষ্যতের দিকেই তাকিয়ে আছি।’ স্বতন্ত্র প্রার্থীদের একভাগ ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহের নিয়ম সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এ নিয়ম যুক্তরাষ্ট্রেও আছে। এটা না হলে ড্যামি প্রার্থী নির্বাচনে দাঁড়িয়ে প্রভাবশালীদের কাছে এজেন্ট বিক্রি করে।’ মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, বর্তমান কমিশন সম্পর্কে নাগরিকদের ভাবনা ভালো না। কারণ, তারা এক তরফাভাবে কয়েকটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে বাজে পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ড. সাদাত হোসাইন বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে যতগুলো নির্বাচন হয়েছে একটাতেও সরকারি দল হারেনি। অথচ তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন নির্বাচন দিতে নারাজ। এ অবস্থায় দলীয় সরকারের অধীনে এক দল আরেক দলকে বুঝিয়ে নির্বাচনে নিয়ে আসবে এটা হয় না। এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করতে হলে সর্ব প্রথম ভাবতে হবে কোন লোকগুলোকে সেখানে পাঠানো হচ্ছে। দায়িত্বপ্রাপ্তরা কমিশনে গিয়ে আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে পারবে কিনা। তিনি বলেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সবচেয়ে বড় সমস্যা তারা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। তাদের আস্থার সংকটও রয়েছে। এ কমিশন নিজের কাজ অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দায় এড়াতে চায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। আলী ইমাম মজুমদার বলেন, নির্বাচনী কাজে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাজার হাজার সদস্যসহ প্রশাসন জড়িত থাকে। এ জায়গাগুলোতে যেভাবে দলীয়করণ করা হয়েছে সেখানে শুধু নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব নয়। আগে এ জায়গাগুলো নিরপেক্ষ করতে হবে। সরকার না চাইলে আইন দ্বারা সবকিছু করা সম্ভব নয়। যেমন দুদক শক্ত আইন দ্বারা স্বাধীন হলেও তারা কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে সেটা এখন বিরাট প্রশ্ন। মোস্তাফা চৌধুরী বলেন, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ক্ষমতাসীনরা নির্বাচনকে প্রভাবিত করাসহ অনেক কিছু করতে পারে। তাই নির্বাচন কমিশনকে আস্থা ও নিরপেক্ষতার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। যারা পদে যাবেন তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে। অন্যায়কারীদের বিচার করতে হবে।