মিষ্টি মেয়ে

বৃষ্টি রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি পড়া দেখছিল। একবার কুয়াশার মত আকাশের দিকে তাকাচ্ছিল, একবার রাস্তার ওপর গড়িয়ে পড়া বৃষ্টি দেখছিল, অবাক চোখে। রাস্তায় গাড়ি, রিকশা তেমন একটা দেখা যাচ্ছিল না। দু’একজন লোক ছাতা মাথায় দিয়ে হাঁটছে। কালো রংয়ের ছাতা। আকাশ থেকে পানিগুলো ছাতার উপর দিয়ে গড়িয়ে পড়তে দেখে বৃষ্টি খুব মজা পাচ্ছিল। বৃষ্টির খুব ইচ্ছে হলো ছাতা মাথায় দিয়ে হাঁটতে। উহ কি যে মজা হতো! মাথার ওপর দিয়ে পানিগুলো গড়িয়ে পড়ছে কিন্তু তার মাথা ভিজছে না! কিন্তু যত ইচ্ছেই করুক, কোনোভাবেই তা সম্ভব হবে না। মামণি শুনতে পেলেই চোখ দুটো ইয়া বড় করে চিত্কার করবে, অ্যাই শুনছো তোমার মেয়ের আহ্লাদের কথা! বাবার অবশ্য এই চিত্কারে মনোযোগ দেয়ার সময় নেই। কম্পিউটারের সামনে বসে বাবা মনিটরের দিকে তাকিয়ে দশটা আঙুল দিয়ে খুটুস খুটুস করছে। বৃষ্টি দু’একবার কাছে ঘেঁষার চেষ্টা করেছে, কিন্তু ‘কি অবস্থা মামণি’ বলেই বাবা আবার নিজের কাজের মধ্যে চোখ ডুবিয়ে দিয়েছে। ছুটির দিন মামণি, বাবা দু’জনেই বাড়িতে মহাব্যস্ত! এই কাজ করছে ঐ কাজ করছে। বাবা কম্পিউটারের সামনে আর মামণি রান্নাঘরে প্রেসার কুকার, ননস্টিক প্যান নিয়ে চুলার সামনে ব্যস্ত। কি আর করে বৃষ্টি! তাকেও তো কোনো কাজ করতে হবে, না কি! বৃষ্টি তার খেলনাগুলো নিয়ে বিছানার ওপর ছড়িয়ে খেলছিল। হঠাত্ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বৃষ্টি পড়তে দেখে বৃষ্টি। খেলনাগুলো একপাশে সরিয়ে বিছানা ছেড়ে ব্যালকনিতে আসে সে। খুব অবাক চোখে বৃষ্টি পড়া দেখে। আকাশ থেকে কেমন করে বৃষ্টি নামছে তাকিয়ে দেখে। গায়েও এসে লাগছে বৃষ্টির পানি, তাতে বেশ মজা পাচ্ছে সে। দূরে ঘরবাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখলো বৃষ্টি। কেমন ঝাপসা ঝাপসা দেখাচ্ছে। একটা লোক ভ্যানের মধ্যে কি সব নিয়ে বৃষ্টির মধ্যেই এগোচ্ছে। বৃষ্টির পানিগুলো লোকটার গায়ে পড়ছে। তারপর পায়ের নিচ দিয়ে রাস্তার পানির সাথে মিশে যাচ্ছে। লোকটার চলে যাওয়ার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতে গিয়ে মাথাটা তার রেলিংয়ের সাথে একটু ঘষা খেল। নাকেও। নাকটায় একটু ব্যথা মত মনে হলেও পাত্তা দিল না। অন্য সময় হলে এর চেয়েও কম ব্যথায় ভ্যা করে দিত। এখন করলো না। হাত দিয়ে শুধু একটু মুছে নিলো, আর তখনই বৃষ্টি দেখতে পেল, তার চেয়ে মাথায় একটুসখানি লম্বা মতো দুটো ছেলে অথবা মেয়ে (বৃষ্টি বুঝতে পারেনি) ঘাড়ের ওপর সাদা সাদা দুটো বস্তা নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। খেয়ালই করছে না! পানি মেখে দেখে খুব আনন্দ করছে বোঝাই যাচ্ছে। একজন নীচের দিকে ঝুঁকে কি যেন কুড়োলো, আবার ফেলে দিল। আবার কুড়িয়ে জিনিসটা নিয়ে হুটোপুটি করলো দুজনে। একজন আরেকজনের গায়ে চাটি মারলো, ঠেলা দিল, আবার ঘাড়ে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলো। তারপর আবার হাঁটতে লাগলো। মামণি মামণি। বৃষ্টি মাকে চেঁচিয়ে ডাকলো। মা চুলো বন্ধ করে ওড়নায় হাত মুছতে মুছতে দৌড়ে এলো। কি হয়েছে সোনা? মামণি মুখের ঘাম মুছে বললো। বৃষ্টি হাত দিয়ে ওদের দু’জনকে দেখিয়ে বললো, যাব ওখানে। ওখানে যাবে, মানে? রাস্তায়? বৃষ্টিতে? মামণি চোখ ওপরে তোলে। ঐ যে ওখানে। এই বৃষ্টির মধ্যে তুমি রাস্তায় যাবে? ওদের সাথে যাবে? ওমা সে কি কথা! অ্যাই শুনছো তোমার মেয়ের আহ্লাদের কথা! রাস্তায় গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে চায়। এই পানিগুলোর নাম বৃষ্টি, মামণি? হ্যাঁ, এই যে আকাশ থেকে পড়ছে, এ হলো বৃষ্টি। আমার নামও যে বৃষ্টি! আমি কি আকাশ থেকে পড়েছি? হি হি হি, না, তুমি আকাশ থেকে পড়নি। তুমি আমার পেটের ভেতর থেকে এসেছো, সোনা। তাহলে আমার নাম বৃষ্টি কেন? তোমার বাবা পছন্দ করে রেখেছে। তাই তোমার নাম বৃষ্টি। তুমিও সুন্দর, বৃষ্টিগুলোও সুন্দর, তাই তোমার নাম রাখা হয়েছে বৃষ্টি। খুব সুন্দর। বৃষ্টি খুব সুন্দর। বলতে বলতে বৃষ্টি রেলিংয়ের বাইরে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি ছোঁয়, গালে ছোঁয়ায়। আকাশ দেখে। সেদিনের তিনবছরের বৃষ্টি এখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ছে। বৃষ্টির দিনেও সে কখনো স্কুল ফাঁকি দেয় না। মামণির সাথে রিকশায় বসে প্লাস্টিকের চাদর ঢেকে স্কুলে চলে আসে। মামণি তাকে স্কুলে দিয়ে তারপর অফিসে চলে যায়। ছুটির সময় নানু এসে তাদের বাড়িতে নিয়ে যান। সেদিন স্কুলে থাকার সময় বৃষ্টি হচ্ছিল খুব। অংক টিচার স্কুলেই আসতে পারেননি। সবাই ফাঁকা ক্লাসে খুব হৈ চৈ করছিল, গল্প করছিল, দুষ্টুমি তো ছিলই। অংক ক্লাসের পর ছবি আঁকার ক্লাস। ছবি আঁঁকার টিচার ক্লাসে ঢুকেই বললেন, ‘বৃষ্টি পড়া নিয়ে একটা করে ছবি আঁক তো দেখি, কেউ কারোটা দেখে আঁকবে না কিন্তু। সবাই নিজের নিজের মত করে আঁক।’ বৃষ্টি প্রথমে খুব ভাবলো। পেনসিল দিয়ে মাথায় ঠোকাঠুকি করলো একমিনিট। তারপর মনোযোগ দিয়ে ছবি আঁকলো। টিচার হেঁটে হেঁটে সবার ছবি আঁকা দেখতে লাগলেন। হাঁটতে হাঁটতে বৃষ্টির কাছে গিয়ে তার খাতার দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। টিচার বলে ফেললেন, অপূর্ব হয়েছে, অপূর্ব। ‘দুটো ছোট ছোট ছেলে ঘাড়ে বস্তা নিয়ে হাঁটছে। বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটায় তারা ভিজছে। তাদের মুখ দেখা যাচ্ছে না। কারণ ছবিতে পেছন দিকটা আঁকা হয়েছে। তাদের পরনে হাফ প্যান্ট। প্যান্টের এক পাশে ছেঁড়া দুজনেরই।’