শ্রাবণ-ভাদ্রে

শ্রাবণ-ভাদ্র মাস এলেই হাসু বু’র মন খারাপ হয়ে যায়। হাসু বুর খাওয়া-দাওয়া ভালো লাগে না। বিছানায় গেলে ঘুম আসে না। হাসু বু উদাস নয়নে আকাশ দেখে। কখনো নিরবে কাঁদে। চোখের জলে বুক ভাসায়। কখনো হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। কখনো কখনো একা একা কথা বলে। সংসারে কাজ-কাম করে না। রান্না-বান্না করে না। স্বামীর সেবা করে না। ছেলে মেয়েরা এখন বড় হয়েছে। ওদের নিয়ে আর হাসু বুর ভাবতে হয় না। পঁচিশ বছর আগের সেই দিনটির কথা হাসু বু’র স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। আগের দিন রাতে আকাশে মেঘ ছিল। বৃষ্টি হয়েছিলো। বৃষ্টির কারণে রাতে গরম ছিলো না। বেশ ঠাণ্ডা পড়েছিলো সে রাতে। আর ঠাণ্ডা পড়ার কারণে ভাল ঘুম হয়েছিলো হাসু বু’র। ঘুম যখন ভাঙলো হাসু বু’র তখন বেলা অনেক হয়েছে। ফজর নামাজ কাজা হয়েছিলো। হাসু বু’র মনে হয়েছিলো আল্লাহ কি তা হলে নামাজ কাজার জন্য তাকে এ শাস্তি দিলেন? তারপর অনেক দিন হাসু বু নামাজ পড়েনি। আল্লাহ’র সাথে অভিমান করে অনেক দিন পর্যন্ত জায়নামাজে বসেনি। আল্লাহর কাছে হাত তুলে প্রার্থনা করেনি। ছোট বেলা থেকেই হাসু বু নামাজ পড়ে। তার পরিবারের সবাই নামাজ পড়তো। সেদিন ঘুম ভাঙতে দেরি হওয়ার কারণে ঠিক সময় অর্থাত্ বেলা ওঠার আগে নামাজ পড়তে পারেনি। তবুও হাসু বু নামাজ বাদ দেয়নি। কাজা নামাজ পড়ে নিয়েছিলো। আল্লাহ’র কাছে নামাজ কাজার জন্য তওবা করেছিলো। নামাজ শেষ করে হাসু বু রান্নার জন্য রান্না ঘরে যায়। আগের দিন রাতে হাসু বু’র স্বামী খিচুড়ি খেতে চেয়েছিলো। খিচুড়ি রান্নার আয়োজনে হাসু বু তখন ব্যস্ত ছিলো। হঠাত্ হাসু বু দেখতে পেলো বাবার বাড়ির এক লোক হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছে। একেতো বাবার বাড়ির লোক তারপর হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসা। হাসু বু’র প্রাণটা আঁেক উঠলো। সে দৌড়ে ঘরে এলো। লোকটি হাসু বু’র পাশের বাড়ির। লোকটি তার স্বামীর কাছে আগের রাতের পুরো ঘটনা বলছে। হাসু বু’র মনে আছে লোকটি বলছে, ‘হাসু’র মা-বাবা, ভাই বোন আত্মীয়-স্বজন কেউ রেহাই পায়নি। রাতের আঁধারে সদর থেকে পাক সৈন্য এসে তার মা-বাবা, ভাই, ভাইয়ের বউদের হাসু বু’র সবচেয়ে আদরের ছোট ভাই রাসুকেও মেরে ফেলছে। ঐ রাতে বেড়াতে আসা হাসু বু’র আত্মীয়-স্বজনরাও দানবের হাতে থেকে রেহাই পায়নি। হাসু বু এটুকু শোনার পর অজ্ঞান হয়ে যায়। যখন জ্ঞান ফিরলো তখন হাসু বু হাসপাতালে। হাসু বু বাবার বাড়ি যাওয়ার জন্য অনেক কান্না-কাটি করেছে। স্বামী তাকে বাবার বাড়ি যেতে দেয়নি। তবে হাসু বু গিয়েছিলো বাবার বাড়ি, তখন বাবা-মা ভাইদের কবর ছাড়া আর কিছু পায়নি। হ্যাঁ আর পেয়েছে বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সেই মধুমতি নদীটি। যে নদীর পাড়ে হাসু বু তার আদরের ছোট ভাই রাসুর হাত ধরে ঘুরে বেড়াতো। তীরে বসে পাল তোলা নৌকা দেখতো। দেখতো জেলেরা কিভাবে নৌকায় নৌকায় মাছ ধরছে। ট্রলার কিভাবে মাঝি ছাড়া কলের বৈঠা দিয়ে যাত্রী নিয়ে দূরে কোথায় যেন চলে যাচ্ছে। হাসু বু যখন আরো ছোট ছিলো তখন তার ছোট বোন রেহানার সাথে কতদিন এ নদীতে সাঁতার কেটেছে। আঁচলে ছেঁকে ছোট ছোট মাছ ধরেছে। এ জন্য মা-বাবার কাছে কতদিন বকুনি খেয়েছে। শ্রাবণ-ভাদ্র মাস এলেই হাসু বু’র মন খারাপ হয়ে যায়। শ্রাবণ-ভাদ্র মাস এলেই হাসু বু স্বামীর বাড়ির নিষেধ অগ্রাহ্য করে ছুটে যায় মধুমতির পাড়ে। নদীর পাড়ে এলেই হাসু বু শৈশব, কৈশোরে ফিরে যায়। কিছুক্ষণ শৈশবে বিচরণ করে কিছুক্ষণ কৈশোরে বিচরণ করে। তার সবচেয়ে প্রিয়, সবচে’ আদরের ছোট ভাই রাসুকে মনে পড়ে সব চেয়ে বেশি। হাসু বু’র যে দিন বিয়ে হয়, রাসুর সেকি কান্না। হাসু বু’কে শ্বশুরবাড়ি যেতে দিবে না। সেই দিন রাসুকে ফেলে হাসু চলে গিয়েছিলো শ্বশুরবাড়ি। আজ রাসু নেই। হাসু বু বেঁচে রইলো। বেঁচে রইলো মধুমতির তীর। সবুজ গ্রাম। হাসু বু বার বার ফিরে আসে গ্রামের টানে। গ্রাম তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। যেখানে শুয়ে আছে তার আপনজনেরা। যেখানে আপনজনের সমাধি আছে। হাসু বু’র আর মৃত্যুকে ভয় নাই। সে যে কোন কিছুর মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত। নিজের জন্য হাসু বু আর ভাবে না। আজ হোক কাল হোক তাকে তো মরতে হবেই। চলে যেতে হবে আপনজনের কাছে। এখন হাসু বু ভাবে দুঃখি-অসহায় অনাথ মানুষের কথা। ওদের সেবা করে যেন হাসু বু শান্তি পায়। রাসুর মতো কাউকে পেলে বুকে জড়িয়ে পরম সুখ অনুভব করে। সুখ অনুভব করে মায়ের মত কাউকে দেখলে তাকে জড়িয়ে ধরে, তার বুকে মাথা রেখে। বাবার মতো কাউকে পেলে বাবা বলেই ডেকে ওঠে। দেশের-দশের সেবা করে তার দিন কাটে। লোকের মাঝে সে তার ভাইদের খোঁজে, খোঁজে রাসুকে। খোঁজে হারিয়ে যাওয়া মা-বাবাকে।