যে লাউ সেই কদু

রাজনৈতিক দলে যাঁরা সাবেক হয়ে যান বা দল থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত, বহিষ্কৃত, দলের কাছে গুরুত্বহীন হয়ে যান বা করে দেওয়া হয় তাঁরাই নিজেদের সুশীল সমাজের ব্যক্তি হিসেবে ভাবেন । আমরা বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের টক শো , কোনো পত্রিকার বিষয়ভিত্তিক গোলটেবিল আলোচনায়, বিভিন্ন সেমিনারে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে তাঁদের আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে দেখি । অবশ্য যারা ঐ অনুষ্ঠান বা টক শোর আয়োজন করেন তাঁরাই তাঁদের আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসেন। আবার বিভিন্ন পেশাজীবী ঊর্ধ্বতন ব্যক্তি যেমন স্কুল,কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকও বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠনের নেতা বিভিন্ন দলের হয়ে তোষামোদী করে দল ক্ষমকাসীন হলে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের লোভনীয় পদ পেয়ে যান এতে তাদের যোগ্যতা থাক আর না থাক। আর দল ক্ষমতাসীন না হলে ভবিষ্যতে দল ক্ষমতায় এলে তাদের ভাগ্য খুলবে এই নির্লজ্জ আশায় থাকেন । এখানে সেইসব সুবিধালোভী ব্যক্তির কথা বলা হচ্ছে— যাঁরা দলীয় বৃত্তে থেকে ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যার বিচার করেন না। নিজের জ্ঞান-গরিমা, মান-সন্মান, ব্যক্তিত্ব জলাঞ্জলি দিয়ে দেন অসত্ রাজনীতির পদতলে। তারা সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের লোভনীয় পদে থেকে জনস্বার্থের জন্য হিতকর কোনো কাজ করেন তো নাই, বরং নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকেন যেন কত যুগ তারা এ ক্ষেত্রে ভুখা। তাঁরা যতদিন পদে বহাল থাকেন খুব দাপটেই থাকেন। কী রাজনৈতিক কী সামাজিক, কী সাংস্কৃতিক কোনো ক্ষেত্রেই তারা দেশের স্বার্থে,জনগণের কল্যাণে কোনো দায়িত্ববোধের পরিচয় তো দেনই না, উপরন্তু নিজের স্বার্থটাই আগে বাগানোর মতলবে থাকেন। রাষ্ট্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বলি হয়ে যায় তাঁদের সংকীর্ণ ব্যক্তি স্বার্থের কাছে। এঁরাই যখন সাবেক হয়ে যান, দল পরিত্যক্ত হয়ে যান, দলের কাছে মূল্যহীন হয়ে যান তাঁরা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর আলোচনা-সমালোচনামূলক বিষয়ভিত্তিক লেখা লিখে পত্রিকার কলাম লেখক হয়ে ওঠেন। ইদানীং একটা সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে যে বড় রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে বললেই নিজেকে ধোয়া তুলসিপাতা মনে হয় । বড় বড় বাণী, উপদেশ, পরামর্শ বিতরণ করা শুরু করেন দেশের, সমাজের, জনগণের তাঁদের সাক্ষাত্কারে, বিভিন্ন টক শোতে, আলোচনার টেবিলে, নাগরিক সমাজের সভা-সমাবেশে। এভাবে আস্তে আস্তে নিজেদের সুশীল সমাজের বলে ভাবতে থাকেন। আর যখন আদতেই দায়িত্বে থাকেন তখন তিনি এ ব্যাপারে কালা-বোবা, বয়রা হয়ে থাকেন। সুশীল বালক কাহকে বলে সে প্রসঙ্গে একটি গল্প রয়েছে। গল্পটি এরকম— এক বালক তার কৃষক বাবার সঙ্গে খেতে কাজ করছে। বালকের বিড়ি খাবার নেশা রয়েছে। তো বালকের ঐ মুহূর্তে বিড়ি খাবার ইচ্ছা জাগলো । তাই বলে সে তো বাবার সামনে বিড়ি খেতে পারে না । তাই সে বাবাকে বিনয়ের সঙ্গে বললো— বাবা তুমি একটু দূরে যাও তো আমি এখন বিড়ি খাবো। তো একই বলে সুশীল বালক! আমাদের আলোচ্য সুশীল সমাজের উল্লিখিত ব্যক্তিদের অবস্থাও তাই। আবার কিছু ব্যক্তি রয়েছেন যাঁরা বড় বড় রাজনৈতিক দলের চরম ব্যর্থতার পেছনে ‘তৃতীয় শক্তি তৃতীয় শক্তি’ রব তোলেন । অথচ তাঁরাও কিন্তু কোনো না কোনো বড় রাজনৈতিক দল থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত, বহিষ্কৃত, দলের কাছে গুরুত্বহীন হয়ে যাওয়া ব্যক্তি, সরকারি সুযোগ -সুবিধাভোগকারী সরকার-শাসিত কোনো প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্তা-ব্যক্তি ছিলেন। এখন সাবেক হয়ে গেছেন । এখন সুযোগ-সুবিধা পান না তাই খান না । এঁবাই মাঝে মাঝে তথাকথিত তৃতীয় শক্তি গড়ার কথা বলেন! হাঁক ডাক দিয়ে কত না শুদ্ধ(!) রাজনৈতিক দল গঠন করেন। কিন্তু ভালো কিছু হলো কৈ! আমরা দেখলাম সবই আবার একই গর্তে ঢুকে গেলো— বিশেষ কোনো দল বা জোটের পেটে। যে লাউ সেই কদু। আর বাকিরা একে অপরকে ডাকছে‘ নতুন কিছু করি এসো নতুন কিছু করি’। কোনো স্থানীয় বা জাতীয় নিবার্চনে দল থেকে মনোনয়ন না পেলে কিছু ব্যক্তি গণ্যমান্য(!) ব্যক্তিদের নিয়ে নাগরিক কমিটির প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা করেন বা নিজেকে নাগরিক কমিটির প্রার্থী বলে ঘোষণা করেন। অবশ্য কিছু ক্ষেত্রে যে নাগরিক কমিটি থেকে সবার গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি পাওয়া যায় না তা নয়। সেটা স্বতস্ফূর্তভাবে জনগণের মাঝে থেকে উঠে আসে। নিজের ঢোল নিজেকে পেটাতে হয় না। মোদ্দা কথা অপরাজনীতি বা অসত্ রাজনীতির এই প্রদোষকালে ‘পলিটিক্স’ মুক্ত সত্ বিবেকসম্পন্ন রাজনীতি দরকার। আমাদের মাঝে সত্যের, সুন্দরের, মানবতার আলোকবর্তিকা হয়ে রয়েছেন আজকের অসত্ রাজনীতিমুক্ত সত্যিকারের সুশীল সমাজের অনেক মহত্প্রাণ ব্যক্তি। প্রয়োজন শুধু তাঁদের পরামর্শ, উপদেশ মতো তাঁদের নির্দেশিত পথে চলা । ঢাকা