গফরগাঁওয়ে ইটভাটার কবলে ৩ নদী
প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:২০
গফরগাঁও উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত শীলা এবং ময়মনসিংহের গফরগাঁও, ভালুকা ও গাজীপুর জেলার শ্রীপুর জেলার সীমানাবর্তী সুতিয়া ও ক্ষীরু নদী দখল ও ভরাট করে প্রভাবশালী মহল গড়ে তুলেছে অবৈধ ইটভাটা। ফলে পরিবর্তন হয়ে গেছে শীলা, সুতিয়া ও ক্ষীরু নদীর গতিপথ। বর্ষাকালে ভাঙ্গনের কবলে পড়ে নদীপাড়ের ঘরবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার ও ফসলি জমি। শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রবাহ বন্ধ হওয়ায় ‘শীলা নদী উপ-প্রকল্প’ এবং ‘আপার শীলা নদী-উপ প্রকল্প’ নামে দু’টি সেচ প্রকল্প অকার্যকর হয়ে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
সরেজমিনে শীলা, সুতিয়া ও ক্ষীরু নদীর তীরবর্তী গফরগাঁও উপজেলার নিগুয়ারী ইউনিয়নের চামুর্থা, গৈয়ারপাড়, ছোট্ট বারইহাটি, সুতারচাপড়, নিগুয়ারী, পাইথল ইউনিয়নের বড় বড়াই, ভালুকা উপজেলার উড়াহাটি, ধামলাই, শ্রীপুর উপজেলার কাওরাইদ, নান্দিয়া সাঙ্গুনসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং এলাকাবাসী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে কথা বলে ইটভাটায় নদী দখল ও ভরাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে ইটভাটার মালিকরা বলছেন, তারা নিজেদের জমিতে অথবা জমি ভাড়া নিয়া ইটভাটা করেছেন। আর জমি ভাড়া দেয়া ব্যক্তিরা বলেছেন, ইটভাটার কাছে ভাড়া দেয়া অধিকাংশ জমি নিজেদের, কিছু জমি নদীর বা খাস থাকতে পারে।
নিগুয়ারী সাইদুর রহমান মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামছুল আলম খান বলেন, শ্রীপুর উপজেলার নান্দিয়া সাঙ্গুন গ্রামে সুতিয়া নদী দখল করে নদীর বুকে বিশাল আকারের এইচএমবি ইটভাটা নির্মাণ করা হয়েছে। ইটভাটার কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। পানি প্রবাহ বিদ্যালয় সীমানায় আঘাত হানে। ভাঙ্গনও দেখা দেয়। সহকারী শিক্ষক শাহবাজ উদ্দিন খান বলেন, ইটভাটার কালো ধোঁয়া বিদ্যালয় এলাকার পরিবেশ নষ্ট করছে। নিগুয়ারী ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য নাসিরউদ্দিন খান জানান, বর্তমানে যেখানে সুতিয়া নদীর অবস্থান সেখানে নিগুয়ারী ইউনিয়ন পরিষদ ভবন ও পাটের গুদামগুলো নদীগর্ভে চলে গেছে। ধীরে ধীরে এই এলাকাগুলো গফরগাঁওয়ের সীমানা অতিক্রম করে শ্রীপুর উপজেলার অংশ হয়ে গেছে। সুতারচাপর গ্রামের মজিবর রহমান (৬০) জানান, নদীর একপাড় ইটভাটা দিয়ে ভরাট করায় নিগুয়ারী, সুতারচাপড় ও মুক্তিযোদ্ধা বাজার ভাঙ্গনের হুমকির মধ্যে পড়েছে। গফরগাঁও উপজেলার বড়বড়াই গ্রামে দীর্ঘদিন ইটভাটা দিয়ে সুতিয়া নদী দখলের ফলে সুতিয়া নদী গতিপথ পরিবর্তন করে শ্রীপুর উপজেলার কাওরাইদ এলাকায় ঢুকে পড়েছে। ভালুকা উপজেলার উড়াহাটি গ্রামে মনু মিয়ার ইটভাটা ও ধামলাই গ্রামে সুরুজ তালুকদারের দুইটি ইটভাটার কারণে ক্ষীরু নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে সুতিয়ার এদিক দিয়ে নৌকা চলাচল করতে পারে না। উড়াহাটি এবং নদীর অপর পাড়ের শ্রীপুর উপজেলার পূর্ব সোনাবো গ্রামের চাষীরা সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
গফরগাঁও উপজেলার নিগুয়ারী চামুর্থা, গৈয়ারপাড়, ছোট্ট বারইহাটি গ্রামে বাবুল খান, জুয়েল খান, আশরাফুল, হাফিজ উদ্দিনসহ ১০/১১ জন মালিক শীলা নদীর মধ্যে কমপক্ষে ১২টি ইটভাটা গড়ে তুলেছে। নদীর পাড় কেটে, ইটের খোয়া ও মাটি ফেলে নদী ভরাট করায় প্রবাহমান শীলা মরে যাচ্ছে। কালীবানার (শীতলক্ষ্যা), সুতিয়া হয়ে ব্রহ্মপুত্রের স্বাভাবিক স্রোতধারা যে স্থান দিয়ে শীলায় প্রবেশ করে শীলা নদীকে সজিব রাখতো সেখানে এবং আশপাশে শীলা নদী দখল ও ভরাট করে ইটভাটা নির্মাণ করায় নদীটি শুকিয়ে গেছে। দেখে বুঝার উপায় নাই যে এটি নদী। ফলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় ১৯৮৬ থেকে শুরু হয়ে ১৯৯৪ সালে সমাপ্ত ৭১১.৩৫ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ‘শীলা নদী উপ-প্রকল্প’ এবং ৭৩৫.৪০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ‘আপার শীলা নদী উপ-প্রকল্প’ নামে দুইটি সেচ প্রকল্প কাজ প্রায় মৃত। প্রকল্পভুক্ত শতকরা ৯০ ভাগ কৃষি সেচ সংকটের মুখে পড়েছে। বত্সরে দেড় লাখ মেট্রিক টন অতিরিক্ত খাদ্যশস্য উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ১৯৯৪ সালে চালু হওয়া ২টি সেচ প্রকল্প আর কার্যকর না থাকায় প্রকল্পভূক্ত এলাকায় ধান উত্পাদন করে যে কৃষকরা স্বনির্ভর ও স্বচ্ছল জীবন যাপন করতো তারা ইটভাটায় নদী দখল হওয়ার কারণে বোরো মৌসুমে সেচ দিয়ে ধান উত্পাদন করতে পারছে না। ফসলহীনতায় কয়েক বছরের ব্যবধানে তারা নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।
ত্রিমোহনী নান্দিয়া সাঙ্গুনের হুমায়রা ইটভাটার ব্যবস্থাপক শংকর সাহা দাবি করেন, তারা জমি ভাড়া নিয়ে ইটভাটা করেছেন। নদীর কোন অংশ ভরাট বা দখল করেননি। নান্দিয়া সাঙ্গুন গ্রামের ইটভাটার কাছে ভাড়া দেয়া জমির মালিক হেলাল উদ্দিন দাবি করেন, যেসব জায়গায় ইটভাটা হয়েছে সেসব জায়গা ব্যক্তি মালিকানাধীন।
গফরগাঁও ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার মোসলেম উদ্দিন বলেন, নদীর জায়গা ভরাট করে সরকারি খাস জমিতে ইটভাটা হয়েছে কিনা তা জরিপ ছাড়া বলা যাবে না। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ জসিম উদ্দিন বলেন, নদী ভরাট করে ইটভাটা তৈরি করা হলে সেই ইটভাটা এবং মালিকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।