খান সারওয়ার মুরশিদ ছিলেন সমাজের শিক্ষক

অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদের নাগরিক স্মরণ সভায় দেশের বিশিষ্টজনরা বলেছেন, খান সারওয়ার মুরশিদ ছিলেন একজন মনে-প্রাণে শিক্ষক। জীবনে বিভিন্ন সময় প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেছেন, তবে আবার শিক্ষকতাতেই ফিরে এসেছেন। সভ্য এবং সৌম্য মানুষ ছিলেন তিনি। সভ্যতার প্রতীক তিনি। এ ধরনের মানুষ সমাজে থাকলে সমাজ উন্নত হয়, সভ্যতা টিকে থাকে। তারা না থাকলে সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায়। সোমবার বাংলা একাডেমীর আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে আয়োজিত স্মরণসভায় বক্তারা এ কথা বলেন। বাংলা একাডেমী, নাগরিক উদ্যোগ, ব্রতী, আলোকিত নগরী এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন, আদর্শ শিক্ষক ছিলেন খান সারওয়ার মুরশিদ। আদর্শ শিক্ষক হতে হলে যে বিষয়গুলো করতে নেই, তিনি সেগুলো কখনো করেননি। একাগ্রতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি শিক্ষকতা করেছেন। তিনি সমাজের শিক্ষকে উপনীত হয়েছিলেন। তিনি বলেন, খান সারওয়ার মুরশিদ সমাজ উন্নয়নে অনেক কিছুই চিন্তা করতেন। অনেক কাজও হাতে নিয়েছিলেন। তার অসমাপ্ত কাজগুলো এগিয়ে নেয়াই হবে তার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা। বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন, লেখার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির সাবেক এ অধ্যাপক অসম্ভব সতর্কতা অবলম্বন করতেন। তাই তার মাত্র একটি গ্রন্থই রচনা হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও খান সারওয়ারের ছাত্র অধ্যাপক জিল্লুুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, মিস্টার পারফেকশনিস্ট হচ্ছেন খান সারওয়ার। সহজেই তাকে সন্তুষ্ট করা যেতো না। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যই সৃষ্টিকর্তা তাকে সৃষ্টি করেছেন, তার জন্যও তিনি প্রস্তুত ছিলেন। সভ্য মানুষ ছিলেন তিনি। সভ্যতার প্রতীক ছিলেন এ শিক্ষক। এ জাতিকে যতভাবে দেয়ার ছিল তার, সবটুকুই তিনি দিয়ে গেছেন। নতুন প্রজন্মের কাছে খান সারওয়ারের স্মৃতিকে স্থায়ী রূপ দিতে কিছু করার জন্য এখনই ভাবতে হবে বলে জানান জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম বলেন, সমাজটাকে বদলাতে চাইতেন এ শিক্ষাবিদ। প্রসন্নচিত্ত ও স্মিতহাসির এ রকম দৃঢ়চেতা মানুষ মেলা ভার। সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন একজন বুদ্ধিজীবী। যিনি সৃষ্টিশীল কাজে নিপুণতার বিষয়ে ছিলেন আপোষহীন। তিনি বলেন, খান সারওয়ার মুরশিদ গভীরভাবে চিন্তা করতে পারতেন। গণফোরামের আহবায়ক ড. কামাল হোসেন বলেন, সারওয়ার মুরশিদ ছিলেন একজন জীবন সংগ্রামী। স্বাধীনতা-উত্তর ও পরে দেশের রাজনীতি ও শিক্ষাক্ষেত্রে তার অবদান অবিস্মরণীয়। তিনি বলেন, মূল্যবোধের ভিত্তিতে সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামে কাজ করেছেন খান সারওয়ার। অত্যন্ত দৃঢ়চেতা, বিনয় ও সততার দৃষ্টান্ত তিনি। দেশের সব ধরনের সংগ্রামে তার অংশগ্রহণ থাকলেও তা প্রকাশ করতেন না তিনি। ড. কামাল হোসেন বলেন, ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা সম্পূর্ণতা পায়নি বলে ১৯৭১ সালে আবার আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছি। সেই স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে নেতৃত্ব দিয়েছেন মুরশিদ। তার কাজ এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। আমাদেরকে তা এগিয়ে নিতে হবে। অর্থনীতিবিদ ড. রেহমান সোবহান বলেন, দারুণ বন্ধুবত্সল ছিলেন সারওয়ার মুরশিদ। দেশের এবং কাছের মানুষের জন্য তিনি ছিলেন এক অক্লান্ত প্রানান্তকর চেষ্টাকারী বন্ধু। তরুণ প্রজন্মের জন্যতো বটেই সব প্রজন্মের জন্যই তিনি অনুসরণীয়। বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন, আজীবন মানবিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন খান সারওয়ার। দেশের সব সংগ্রামে তার ভূমিকা ছিল। শেষ জীবনে বাংলা একাডেমী তাকে পুরস্কৃত করলেও জাতীয়ভাবে তাকে যতটা সম্মানিত করা উচিত ছিল তার কিছুই করতে পারিনি আমরা। তিনি বলেন, আপাদমস্তক একজন শিক্ষক ছিলেন অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ। সমাজের শিক্ষকে উপনীত হয়েছিলেন এ অধ্যাপক। খান সারওয়ারের মেয়ে শারমিন মুরশিদ বলেন, বাবা যে সৌন্দর্যবোধ, জীবনের জয়গান রেখে গেছেন; সেই সৌন্দর্যের সাধনা ও সত্যের পক্ষে আমাদের অবস্থান ধরে রাখবো। এদিকে আলোচনা সভায় উপস্থিত হতে না পারলেও প্রেরিত বাণীতে সারওয়ার মুরশিদের ছাত্র অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, তিনি সব সময়ই আমার শিক্ষক হিসেবে থেকেছেন। আপাদমস্তক শিক্ষক ছিলেন তিনি। আমার জীবন গঠনেও ভূমিকা রেখেছেন এ শিক্ষক। জ্ঞান আহরণে আগ্রহী করে তুলতেন তিনি। তাকে কখনো কুসংস্কার ও সংকীর্ণতা স্পর্শ করেনি। অনুষ্ঠানের শুরুতে এক মিনিট নীরবতা পালনের পর কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য পাঠ করেন। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ছায়ানটের অধ্যক্ষ সন্জীদা খাতুন, মফিদুল হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান, হাসান ইমাম, ফারজানা ইসলাম, সিমিন হোসেন রিমি। গত ৮ ডিসেম্বর মারা যান শিক্ষাবিদ খান সারওয়ার মুরশিদ।