বর্তমান প্রেক্ষাপটে কোন দলেরই এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়া কঠিন

জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছেন, সব রাজনৈতিক দলেরই কিছু কর্মসূচি থাকে। তা বাস্তবায়নের জন্যই ক্ষমতায় যেতে হয়। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে কোন দলেরই এককভাবে রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়া কঠিন। এজন্যই জোট, মহাজোট, ১৪ দল বা ১৮ দল ইত্যাদি করতে হয়। আর এই বাস্তবতার কারণেই রাষ্ট্র ক্ষমতায় গিয়েও কোনো সংগঠনই নিজ দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারছে না। আরও অনেককে সঙ্গে নিয়ে ক্ষমতায় যাবার কারণে সবাই নিজ নিজ লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অর্জনে মনোযোগী থাকে। এই অবস্থা শুধু বাংলাদেশেই নয়, পার্শ্ববর্তী ভারতেও। জেপির ২৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে আয়োজিত পুনর্মিলনী ও আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, সম্পূর্ণ আদর্শিক কারণেই জাতীয় পার্টিতে বিভাজন সৃষ্টি হয়েছিল। ’৯৬ সালে আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনে সমর্থন দেয়ার বিষয়ে জাতীয় পার্টির লিখিত সিদ্ধান্ত ছিল। পরবর্তী সময়ে বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে জাতীয় পার্টি সংসদ বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয়। তখন আওয়ামী লীগকে সমর্থন দেয়ার লিখিত সিদ্ধান্তের বিষয়টি সামনে আনা হলে তা উপেক্ষা করার কারণেই সেদিন বিভাজন দেখা দেয়। এছাড়া গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জাতীয় পার্টির অবস্থান ছিল সংসদীয় গণতন্ত্রের পক্ষে, সংসদ বর্জনের পক্ষে নয়। বিভাজন সৃষ্টির এটিও ছিল অন্যতম কারণ। এই প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, দলের গঠনতন্ত্রে বলা ছিল, বাংলায় ‘জাতীয় পার্টি-জাপা’ আর ইংরেজিতে ‘জাতীয় পার্টি-জেপি’ হিসাবে সংগঠন পরিচিত হবে। নির্বাচন কমিশন কায়দা করে একপক্ষকে ‘জাতীয় পার্টি-জাপা’ এবং অন্যপক্ষকে ‘জাতীয় পার্টি-জেপি’ দিলেও ব্যাকরণগতভাবে ও গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জাতীয় পার্টি কখনও ভাঙ্গেনি। দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আগামী নির্বাচন সম্পর্কে জেপি চেয়ারম্যান বলেন, দেশে কী হবে—১৪ দল বা ১৮ দল কেউ বলতে পারছে না। সবার অংশগ্রহণে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে, একথাই বা বিশ্বাস করতে পারছেন কতজন। সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, ‘আমরা অতীতে বঙ্গবন্ধু সেতু, পাকশী, রূপসা ও মেঘনা-গোমতীসহ ৮শ’রও বেশি সেতু করেছি। তখন এনিয়ে কোনো কথা হয়নি। এখন এক পদ্মা সেতু নিয়েই জনগণ কত কথা শুনছে।’ জেপি চেয়ারম্যান বলেন, জাতীয় পার্টি-জেপি পরিচালিত হয় নীতি-আদর্শের উপর ভিত্তি করে। এই দলে গণতন্ত্র আছে। এখানে এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় না। আলোচনার ভিত্তিতে দলের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম প্রেসিডিয়াম সর্বসম্মতভাবে সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শুভেচ্ছা জানিয়ে দলীয় নেতা-কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, হতাশ হবার কিছু নেই, এদিক-ওদিক, ডানে-বায়ে না গিয়ে নিজেরা ঐক্যবদ্ধ থাকুন, নির্বাচনের জন্য সংগঠনকে শক্তিশালী করুন। তাহলে মূল্যায়ন যা হবার তা এখানে থেকেই অর্জন করা সম্ভব। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় জেপি মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম বলেন, যে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে জাতীয় পার্টি গঠিত হয়েছিল, জেপি-ই সেটির প্রকৃত পতাকা বহন করছে। স্বৈরতান্ত্রিক কিংবা একনায়কতান্ত্রিক পন্থায় এই দলে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয় না। এ দলে গণতন্ত্র ও পরমতসহিষ্ণুতা রয়েছে। দীর্ঘ ২৭ বছরের মধ্যে ১৪-১৫ বছরের যে নতুন অভিযাত্রা সেখানে জেপি নিশ্চয়ই অগ্রসর হয়েছে। একথা সত্য যে, জেপি এ সময়ে জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন প্রক্রিয়ায় শরিক হয়নি। সাংগঠনিক শক্তির দিক থেকে জেপি ছোট হতে পারে, কিন্তু এ দল আদর্শকেই বড় করে দেখে। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দল আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম নয়, যে কোনো দলেরই ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্য থাকে। তবে জেপির একমাত্র লক্ষ্য ক্ষমতায় যাওয়া নয়, এর ভেতরের মূল সুর হচ্ছে জনকল্যাণ। জেপির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ঢাকা মহানগর কমিটির আহ্বায়ক আব্দুর রহিম বলেন, স্বাধীনতার ৪১ বছরেও আমরা দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। এখানে একজনের জন্য এক রকম, আরেকজনের জন্য ভিন্ন আইন। দলের অতিরিক্ত মহাসচিব সাদেক সিদ্দিকী বলেন, জেপি গণতন্ত্র ও আদর্শের উপর ভিত্তি করে রাজনীতি করে। আগামী দিনে যোগ্য, আধুনিক নেতৃত্ব ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গড়ার ক্ষেত্রে জেপি অগ্রণী ভূমিকা রাখতে সক্ষম। তিনি আরও বলেন, সামনে নির্বাচন আসছে। নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা তৈরির ক্ষেত্রে জেপিও ভূমিকা রাখার অবস্থানে রয়েছে। আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য কর্নেল (অব.) আব্দুল লতিফ মল্লিক, আবু সাঈদ খান, এডভোকেট বদরুদ্দোজা আহমেদ সুজা, এজাজ আহমেদ মুক্তা, ভাইস চেয়ারম্যান শেখ মো. জয়নাল আবেদীন, নাজমুন্নাহার বেবী, যুগ্ম-মহাসচিব খলিলুর রহমান খলিল, যুগ্ম প্রচার সম্পাদক হুমায়ুন কবির তালুকদার রাজু, জাতীয় যুব সংহতির সভাপতি এম এ কাইয়ুম ও জাতীয় মহিলা পার্টির সাধারণ সম্পাদক জাহানারা আরজু প্রমুখ। সভায় উপস্থিত ছিলেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য মফিজুল হক বেবু, মিসেস আমেনা বারী, যুগ্ম-মহাসচিব আলহাজ্ব জামিলুল হক বকুল, দপ্তর সম্পাদক এম. সালাহ উদ্দিন আহমেদ ও প্রকাশনা সম্পাদক কে এম মজিবুর রহমান মজনু প্রমুখ। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন বিপুল উত্সাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয় জাতীয় পার্টি-জেপির ২৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। দিবসের শুরুতে গতকাল সকালে জেপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ দেশের সকল দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। বিকেলে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আলোচনা সভা শেষে বিশাল আকৃতির কেক কাটেন আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও শেখ শহীদুল ইসলাম।