পাঁচ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আরো ২৬ মামলা
প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:৪৪
সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল শাখা থেকে হলমার্ক স্টাইলে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় আরও ২৬টি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর রমনা থানায় অভিযুক্ত পাঁচ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা ও সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এসব মামলা করা হয়। মামলায় পাঁচ প্রতিষ্ঠানের ১৮ জন এবং সোনালী ব্যাংকের ১৭ জনসহ মোট ৩৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। সবগুলো মামলাতেই আসামি করা হয়েছে এসব অপকর্মের অন্যতম হোতা সোনালী ব্যাংকের ডিজিএম ও রূপসী বাংলা হোটেল শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক কেএম আজিজুর রহমান এবং হলমার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তানভীর মাহমুদকে। দুদক সূত্র জানায়, হলমার্ক গ্রুপের পাশাপাশি এ পাঁচটি প্রতিষ্ঠান একই সময়ে সোনালী ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতে জড়িত ছিল। অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে। তবে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। তাদের ননফান্ডেড বিভিন্ন জালিয়াতি অনুসন্ধান শেষে আরও মামলা করা হবে।
প্রসঙ্গত, এর আগে ৪ অক্টোবর সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল শাখা থেকে হলমার্ক গ্রুপের নামে ফান্ডেড ১ হাজার ৫৬৮ কোটি ৫৯ লাখ ৩৪ হাজার ৮৭৭ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ১১টি মামলা করে কমিশন। ওইসব মামলায় ব্যাংকের ২০ জন ও হলমার্কের ৭ জনকে আসামি করা হয়েছে।
অভিযুক্ত পাঁচ প্রতিষ্ঠান
মামলায় অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- টি অ্যান্ড ব্রাদার্স, প্যারাগন নিট অ্যান্ড কম্পোজিট, খানজাহান আলী সোয়েটার, নকশি নিট কম্পোজিট এবং ডি এন স্পোর্টস। প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকিং খাতের প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট (পিএসসি), ফরেন বিল পারচেজ (এফবিপি), পেমেন্ট অ্যাগেইনস্ট ডকুমেন্ট (পিএডি) ও ইনল্যান্ড বিল পারচেজে (আইবিপি) অনিয়মের মাধ্যমে ওই অর্থ লুটপাট করেছে ।
দুদক কর্মকর্তারা জানান, তসলিম হাসানের মালিকানাধীন টি অ্যান্ড ব্রাদার্স সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা থেকে পিএসসি, এফবিপি ও পিএডির মাধ্যমে ৩২০ কোটি টাকা আত্মসাত্ করে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ১৪টি মামলা করা হয়। সাইফুল ইসলামের মালিকানাধীন প্যারাগন গ্রুপের বিরুদ্ধে ১৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে পাঁচটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। প্রায় ৩ কোটি টাকা আত্মসাত্ করার অভিযোগে বেগম ফাহমিদা আকতার চৌধুরীর মালিনাকাধীন কোম্পানি ডি এন স্পোর্টস-এর বিরুদ্ধে তিনটি, ১ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আবদুল মালেকের নকশি নিটের বিরুদ্ধে তিনটি এবং এক কোটি ১৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আবদুল জলিল শেখের প্রতিষ্ঠান খানজাহান আলী সোয়েটারের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করা হয়।
মামলার আসামিরা
হলমার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তানভীর মাহমুদ পাঁচটি ও প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক তুষার আহমেদ ৩টি মামলায় আসামি হয়েছেন। এছাড়া টি অ্যান্ড ব্রাদার্সের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় আসামি করা হয়েছে এর চেয়ারম্যান জিনাত ফাতেমা, ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাওহীদ হোসেন ও পরিচালক তসলিম হাসানকে। প্যারাগন নিট অ্যান্ড কম্পোজিটের মামলায় এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল হাসান রাজা, পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন ও মো: মকুল হোসেনকে (অস্তিত্বহীন খান ট্রেডার্সের স্বত্ব্বাধিকারী) আসামি করা হয়। নকশি নিটের মামলায় আসামি এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুল মালেক ও চেয়ারম্যান আমেনা বেগম। খানজাহান সোয়েটারের মামলায় প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মো. তাজুল ইসলাম মোল্লা, ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল জলিল শেখ, পরিচালক মীর মো. শওকত আলী ও রফিকুল ইসলামকে আসামি করা হয়েছে। অন্যদিকে ডিএন স্পোর্টসের মামলায় চেয়ারম্যান মোতাহার উদ্দিন চৌধুরী, তার মেয়ে পরিচালক ফাহমিদা আখতার (শিখা) ও ফাহমিদার স্বামী প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিকুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে।
এছাড়া ২৬টি মামলার প্রতিটিতেই সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক এ কে এম আজিজুর রহমান, সাবেক সহকারী উপমহাব্যবস্থাপক মো. সাইফুল হাসান, নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল মতিন, ধানমন্ডি শাখার বর্তমান জ্যেষ্ঠ নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেরুন্নেসা মেরী, ব্যাংকটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ূন কবির, ডিএমডি মাইনুল হক ও আতিকুর রহমান, মহাব্যবস্থাপক আ ন ম মাশরুরুল হুদা সিরাজী, ননী গোপাল নাথ ও মীর মহিদুর রহমান, সাবেক জিএম সবিতা সিরাজ, শেখ আলতাফ হোসেন, এজিএম মো. কামরুল হোসেন খান, আশরাফ আলী পাটোয়ারী, খুরশিদ আলম, ডিজিএম মো. সফিজউদ্দিন আহমেদ ও কানিজ ফাতেমা চৌধুরীকে আসামি করা হয়েছে।
৩৫ আসামির মধ্যে তানভীর মাহমুদ, তুষার আহমেদ, এ কে এম আজিজুর রহমান, মীর মহিদুর রহমান, শেখ আলতাফ হোসেন ও সফিজউদ্দিন আহমেদ গ্রেফতার হয়েছেন। মামলার বাদীরা হলেন- দুদকের জ্যেষ্ঠ উপ-পরিচালক মীর জয়নুল আবেদীন শিবলী, উপ-পরিচালক এসএমএম আখতার হামিদ ভুঞা, সহকারী পরিচালক মো. মশিউর রহমান, উপ-সহকারী পরিচালক মো. মজিবুর রহমান , মো. জয়নুল আবদীন, সেলিনা আখতার ও মো. নাজমুচ্ছায়াদাত।
দুদক সূত্র জানায়, গত বছর জুন মাসে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে হলমার্ক গ্রুপসহ ৬টি প্রতিষ্ঠান সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল শাখা থেকে ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা আত্মসাতের সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরমধ্যে শুধু হলমার্ক গ্রুপ একাই নিয়েছে ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। আর অপর ৫টি প্রতিষ্ঠান নিয়েছে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি। ওই সংবাদকে আমলে নিয়ে দুদক ৬ মাসের বেশি সময় ধরে অনুসন্ধান শেষে ফান্ডেড ৩৫০ কোটি টাকার জালিয়াতির প্রমাণ পায়। গত বুধবার প্রতিষ্ঠানের অনুসন্ধান দল কমিশনে প্রতিবেদন জমা দেন। পরে কমিশনের অনুমোদন নিয়ে গতকাল মামলাগুলো দায়ের করা হয়।