পানীয়তে বিষ মিশিয়ে দুই তরুণী হত্যা!
প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:৪৭
গত বিজয় দিবসের আগের রাতে রাজধানীর স্বামীবাগে পানীয়ের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে খাইয়ে দুই তরুণীকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে । শুধু তাই নয়, তাদের লাশ গোপনে দাফন করা হয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে ছাত্রলীগের স্থানীয় দুই নেতা জড়িত বলে জানা গেছে। নিহত তরুণীরা হলেন:রেশমা (২৫) ও তুষি(১৯)। তুষি রেশমার মামাতো বোন। তারা দুজনেই অভিনয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। রাজধানীর দয়াগঞ্জ বাজারের কাছে সর্দার পট্টিতে তাদের বাসা। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তাদের অপর এক বান্ধবী ওই ঘটনার পর থেকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় আতংকে দিন কাটাচ্ছেন। তাকে চিরতরে মুখ বন্ধ করার জন্য ঘাতকরা খুঁজছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে ।
এদিকে দুই তরুণীকে হত্যা করার পর বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করে ঘাতকরা। এ জন্য কোন মামলা হয় নি এখনো। তাদের হুমকিতে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা আতংকে দিন কাটাচ্ছেন। মামলা তো দূরের কথা - থানায় গিয়ে অভিযোগ পর্যন্ত করতে সাহস পাচ্ছেন না তারা। স্থানীয় থানা বিষয়টি শুনলেও নিহত তরুণীদের কোন অস্তিত্ব খুঁজে পায় নি বলে জানিয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে স্বামীবাগ মিতালী স্কুল এবং নিহত তরুণীদের বাসায় গিয়ে তাদের অভিভাবক, প্রতিবেশী ও স্থানীয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপ করে এই রহস্যজনক জোড়াখুনের ব্যাপারে বিশদ তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
যেভাবে ঘটনাটি ঘটে
বিজয় দিবস উপলক্ষে স্বামীবাগ মিতালী স্কুলে ১৫ ডিসেম্বর রাতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। রাত ১২টা পর্যন্ত অনুষ্ঠান চলে। সেখানে অন্যদের সঙ্গে নিহত তরুণীরাও নাচ ও গান পরিবেশন করেন। অনুষ্ঠান শেষে রেশমার বাসায় আড্ডায় বসেন আয়োজকরা। সেখানে ছাত্রলীগ সুত্রাপুর থানার সভাপতি আবু হানিফ সেতু ও সাংগঠনিক সম্পাদক রাশেদ রেজা রিজভিসহ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। তরুণীদের মধ্যে রেশমা ছাড়া তার মামাতো বোন তুষি ও বান্ধবী রুমা ছিলেন। সেখানে মদ্যপানের পাশাপাশি রাতভর আমোদ-ফূর্তি চলে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনার পরদিন রেশমা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে স্থানীয় হাসপাতালে নেয়া হয়। চিকিত্সকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এর একদিন পর তুষি মারা যান। আর রুমা গুরুতর অসুস্থ হলেও বেঁচে যান।
মিতালী স্কুলের কয়েকজন ছাত্র জানায়, ওই রাতে বিষাক্ত মদ ও বিয়ার সেবন করায় ৫ তরুণী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে রেশমা ও তুষির নাম-ঠিকানা তারা বলতে পেরেছে। ওই দুই জন মঞ্চে নেচেছেন ও গান গেয়েছেন বলে তারা জানায়। স্কুল কমিটির অভিভাবক প্রতিনিধি মাহবুবুর রহমান বাদল জানান, এ ধরনের একটি ঘটনার সংবাদ তিনি শুনেছেন। তবে বেশি কিছু জানেন না।
এলাকার অধিকাংশ বাসিন্দাই বিষয়টি জানেন। স্থানীয় কয়েকজন জানান, রেশমা স্থানীয় এক ছাত্রলীগ নেতার রক্ষিতা। তার বাসায় প্রায়ই এরকম আসর বসে। সেদিন তরুণীদের বিষাক্ত মদ পান করতে দেয়া হয়েছিল বলে তারা জেনেছেন। তুষিকে স্বামীবাগ ও রেশমাকে দক্ষিণ মৌশুণ্ডি কবরস্থানে গোপনে দাফন করা হয় বলে প্রতিবেশিরা জানান।
রেশমা ও তুষির বাসায় শোকের ছায়া
গতকাল মঙ্গলবার অপরাহ্নে দৈনিক ইত্তেফাকের আলোকচিত্র সাংবাদিক সোহেল রেজাকে সঙ্গে নিয়ে এই প্রতিনিধি রেশমাদের সর্দার পট্টির বাসায় গিয়ে শোকের ছায়া দেখতে পান। রেশমার মা বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। ছোট বোন ভয়ে ভয়ে কথা বলছে। জানা গেল, রেশমারা দুই ভাই, দুই বোন। সে সবার বড়। পিতা ফারুক হোসেন স্থানীয় মাকের্েট ছোট খাটো ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করেন। পাশেই থাকেন তুষির পিতা-মাতা। তারাও সাংবাদিক শুনে দরজা বন্ধ করে দেয়। তবে তুষির এক ভাই ঘটনার বিস্তারিত জানিয়েছে। তারা দুই ভাই ও এক বোন। পিতা মাসুম উল্লাহ ছোট খাটো ব্যবসা করে পরিবার চালান। নিম্নবিত্ত পরিবারে হলেও রেশমা ও তুষি সুন্দরী। তুষির প্রায় এক বছর আগে কাপড় বিক্রেতা সেলিমের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে। বেশিরভাগ সময় পিতা মাতার বাসায় থাকে। রেশমার মা বলেন, ‘আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছেন। আমরা গরীব, কার কাছে বিচার দেব।’ একথা বলেই তিনি মুর্ছা যান।
ওয়ারি থানার ওসি রফিকুল ইসলাম এ ব্যাপারে জানান, ঘটনা শুনেছি। ছাত্রলীগ নেতা সেতু ও রিজভি এবং তিন তরুণী ওই রাতে খাদ্যে বিষক্রিয়ায় গুরুতর অসুস্থ হয়। তরুণী দুজন মারা গেছে। তবে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে অনুসন্ধান চালিয়ে তাদের কোন ডেথ সার্টিফিকেট পাননি। কেউ অভিযোগ নিয়েও থানায় আসেনি। এ ব্যাপারে জানতে গতকাল ছাত্রলীগ নেতা সেতুর ০১৯২৪৫৪৯৯২৮ নম্বরে কয়েক দফা ফোন করলেও কোন উত্তর মিলেনি। অভিযুক্ত রিজভী জানান, মদ্যপান করে সেতু ও তিন তরুণীসহ সে গুরুতর অসুস্থ হন। সেতু ও তিনি হাসপাতালে ছিলেন। তবে তরুণী দুজন মারা গেছে বলে রিজভী স্বীকার করেন।
এদিকে এলাকাবাসীর অভিযোগ, পুলিশ তদন্ত করেও দুই তরুণীর ঠিকানা পায়নি-এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার জন্য তারা এ নাটক সাজিয়েছে। ঘটনাটি এলাকায় আয়নার মত পরিষ্কার। অনুষ্ঠানের শুরুতে স্থানীয় সংসদ সদস্য এসে ১০ মিনিট থেকে চলে গেছেন বলে এলাকাবাসী জানান। দুই তরুণীর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের অবহেলা রয়েছে কিনা- তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী ।
এ ব্যাপারে উপ-পুলিশ কমিশনার (ওয়ারি) গাজী মোজাম্মেল হক বলেন, বিষাক্ত মদ ও বিয়ার সেবনে অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনা তিনি শুনেছেন। তবে এ নিয়ে কেউ অভিযোগ করেননি।