স্বপ্নের মাঝখানে প্রতিবন্ধক বিজিএমইএর অবৈধ ভবন
প্রকাশ : ০২ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:৩১
সম্ভাবনা ও স্বপ্নের মাঝ-খানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে হাতিরঝিলে দাঁড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) অবৈধ ভবনটি। প্রায় দুই বছর আগে হাইকোর্ট জালিয়াতির মাধ্যমে নেয়া ভবনটি ৯০ দিনের মধ্যে মাটির সঙ্গে গুঁড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু এখনো ভবনটি ভাঙ্গা সম্ভব হয়নি। ২০১১ সালের ৫ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার জজ হাইকোর্টের রায়ের ওপর ছয় সপ্তাহের স্থগিতাদেশ দিয়েছিলেন। ছয় সপ্তাহ পেরিয়ে ১৮ মাস অতিক্রান্ত হয়েছে কিন্তু মামলা শুনানিতে উঠছে না। স্বত:প্রণোদিত হয়ে হাইকোর্ট অভিযোগটি আমলে নেয়ায় আপিল বিভাগে মামলার তদ্বিরকারকও নেই। এ মামলার পর আপিল বিভাগে আসা অন্য অনেক মামলা নিষ্পত্তি হয়ে গেলেও এটি এখনো পড়ে রয়েছে।
হাইকোর্ট ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল ভূমিরমালিকানা স্বত্ব না থাকা এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ও জলাধার আইন ভঙ্গ করায় বিজিএমইএ ভবন নির্মাণ অবৈধ ঘোষণা করে। রায়ে বলা হয়, বিজিএমইএ প্রতারণামূলকভাবে এ ভবন নির্মাণ করেছে। এ বিষয়ে ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কিনা তা তদন্তের জন্যে আইজিপি ও ঢাকার ডিসিকে নির্দেশ দেয়া হয়। হাইকোর্ট বলেছে, যে জমির ওপর ভবনটি তৈরি করা হয়েছে তা বেগুনবাড়ী খালের পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং হাতিরঝিল প্রকল্পে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। তাই ভবনটির ভিত থেকে ভেঙে ফেলতে হবে। বেগুনবাড়ি খাল পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে এনে হাতিরঝিল প্রকল্পকে মূল নকশা অনুযায়ী বাস্তবায়ন করতে হবে। বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেনকে নিয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ এ নির্দেশ দেন।
রায়ে বলা হয়, ভবন নির্মাণে বহু জালিয়াতি হয়েছে। ১৯১০ এর দশকে বা তত্পরবর্তীকালে এই জায়গা অধিগ্রহণ করা হয় ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ের জন্য। পরবর্তীকালে অর্থাত্ ২০০৬ সাল পর্যন্ত এর মালিকানা ছিলো বাংলাদেশ রেলওয়ের। বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র স্থাপনের জন্য তখন এটা রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। বিজিএমইএ যে কাগজপত্র রাজউকে দিয়েছে তাতে তারা দাবি করেছে, ২০০১ সালে জমিটি ইপিবির কাছ থেকে তারা কিনেছে। কি করে তা সম্ভব হলো তা তদন্ত করে দেখা দরকার। কেননা নথিপত্রে দেখা যায় ২০০৬ সালে ইপিবি ও বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিক্রির চুক্তি হয়েছিলো, তাহলে ২০০১ সালে বিজিএমইএ কিভাবে এই জমি পেল? এর পেছনে একটি অপরাধী চক্র জড়িত রয়েছে মন্তব্য করে আদালত বলে, সেটি ভূমি দখলের মতোই একটি ঘটনা। রাজউকের কাছে পাঠানো দরখাস্তে বিজিএমইএ বলেছে, জমির সাবকবলা দলিল সংযুক্ত করা হলো। কিন্তু এটা পাওয়া যায়নি।
রায়ে বলা হয়, অধিগ্রহণ করা জমি জনস্বার্থ ছাড়া অন্য কোনো কাজে বিক্রি করা যায় না। শুধু মালিকানাই নয়, আরো কিছু কারণে এ ভবন উচ্ছেদযোগ্য। তা হলো, জলাধার ভরাট করে এই ভবন করা হয়েছে এবং বিজিএমইএ যদি এর মালিকও হতো তাও তারা এখানে ভবন করতে পারতো না। এ মামলার অন্যতম অ্যামিকাসকিউরি এডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান শুনানিতে বলেছেন, আর্থিক শক্তি ব্যবহার করে বিজিএমইএ ভবনটি নির্মাণ করেছে ও টিকিয়ে রেখেছে। এক্ষেত্রে তারা রাষ্ট্রের অনুকম্পাও পেয়েছে। হাইকোর্ট বলেন, এ ধরনের অনুকম্পা গ্রহণযোগ্য নয়।
বিজিএমইএ ভবনের কিছু অংশ ইজারা এবং বিক্রির মাধ্যমে হস্তান্তর করা হয়েছে উল্লেখ করে আদালত বলে, এই ভবনে অন্য যেসব প্রতিষ্ঠান ক্রয় ও ইজারার মাধ্যমে দখল পেয়েছেন তাদের বিনিয়োগের আগেই চিন্তা করা উচিত ছিলো তারা কোন বৈধ সম্পত্তির অধিকারী হচ্ছেন কিনা? তবে তারা চাইলে চুক্তি আইন ও জালিয়াতির অভিযোগে প্রতিকার চাইতে পারেন।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, জলাধার আইনের লঙ্ঘন ফৌজদারি অপরাধ। আইন অনুযায়ী যেখানে বৃষ্টির পানি জমে থাকে তাও জলাধারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। যে স্থানে বিজিএমইএ ভবন গড়ে উঠেছে তা জলাধারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। স্থানটি ভরাট করে ভবন নির্মাণ করে বিজিএমইএ ফৌজদারি অপরাধ করেছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষেরও (রাজউক) এখতিয়ার নেই এ ধরনের ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয়ার। রাজউক এক্ষেত্রে অনুমোদন দেয়নি।
রায়ে বলা হয়, বিজিএমইএ অর্থনৈতিকভাবে একটি প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি অবৈধভাবে সুবিধা আদায় ও দায়মুক্তির জন্যে তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে। আর্থিক শক্তির কারণে যদি ভবনটি ভেঙ্গে ফেলার নির্দেশ দেয়া না হয় তবে মনে হবে, ধনীদের জন্য আইনের কোন প্রয়োগ নেই। আইনের প্রয়োগ শুধু দরিদ্রদের জন্য। আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনা করে যদি আমরা তাদের ক্ষমা করে দেই তবে তা আইনের শাসনের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়, আমরা এখানে বসেছি জনগণের স্বার্থ রক্ষার জন্য।
রায়ে আরো বলা হয়, বিজিএমইএ যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে তা জনকল্যাণে নয়, ব্যক্তিস্বার্থে। তবে এ অর্থ উপার্জন তাদেরকে আইনের ঊর্ধ্বে নিতে পারে না। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন।
যেভাবে গড়ে উঠে এ বহুতল ভবন :১৯৯৮ সালে অবৈধ বিজিএমইএ ভবনটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০০৬ সালে এর উদ্বোধন ঘোষণা করেন তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ভবনটি নির্মাণের পর বেশকিছু ফ্লোর বিজিএমইএ বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেয়।
২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ঢাকার খালের পানি প্রবাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলে বেগুনবাড়ী খাল পাড়ে নির্মিত বিজিএমইএ ভবনটি ভেঙে ফেলার বিষয়টি আলোচনায় আসে। পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠন ভবনটি ভেঙে ফেলার দাবিতে মানববন্ধন, স্মারকলিপি দেয়াসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। বিজিএমইএ ভবন নির্মাণাধীন অবস্থায় ২০০৪-০৫ সালে বেগুনবাড়ী খাল এলাকায় রাজউকের ১৩ একর জমিসহ রেলওয়ে এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের পুরো জায়গা নিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দল সমীক্ষা করে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিলো, বেগুনবাড়ী খাল এলাকায় কীভাবে পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন করা যায় তার দিক-নির্দেশনা দেয়া। সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, বিজিএমইএ ভবনটি বেগুনবাড়ী খালের গতিপথে বাধা হিসাবে কাজ করছে। ভবনটি ওই এলাকার পরিবেশের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।