ভূমধ্যসাগর ট্রাজেডির ৮ বছর

দালালের প্রতিশ্রুত অর্থ ফেরত পাননি মা জোবেদা খাতুন

ভূমধ্যসাগরে জল যেন মায়ের বুকজুড়ে কষ্টের ঢেউ তুলছে। ঝাপসা চোখে ভেসে ওঠে স্পেনে যাওয়ার আশা নিয়ে সাগর পাড়ি দিতে যাওয়া সন্তানের মুখ। কিছুতেই সেই সন্তানকে আর ছুঁতে পারবেন না মা। কারণ তার সন্তান ভূমধ্যসাগরে দিনের পর দিন ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর হয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছে। সন্তানের মুখটি যখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে তখন জলে ঝাপসা হয়ে আসে। চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকান আর অভিসম্পাত করেন যে দালাল তার ছেলেকে লোভ দেখিয়ে স্পেনে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। ভূমধ্যসাগরে সমাধিস্থ ফরহাদের মা জোবেদা খাতুন ছেলের ধূসর স্মৃতি নিয়েই দোহার উপজেলার লোটাখোলা গ্রামে বেঁচে আছেন। তিনি জানেন সাগরে ফরহাদের সমাধি হয়েছে, আর কখনোই ফিরবে না। ছেলেকে স্পেন পাঠানোর জন্য ধান, হালের বলদ বিক্রি ও জমি বন্ধক রেখে যে ৮ লাখ টাকা দালালের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল তাও ফেরত পাননি তিনি। লোটাখোলা গ্রামে জোবেদা খাতুনের মতই আরো ১৪ জন মায়ের অন্তর জুড়ে শোক। পরিবারে সচ্ছলতা আনতে অনিশ্চয়তা নিয়েই ফরহাদসহ ১৯ যুবক ২০০৪ সালের ৪ ডিসেম্বর স্পেন যাওয়ার উদ্দেশে রওনা হন দোহারের দালাল মোশতাক আহমেদের মাধ্যমে। চোখে স্বপ্ন নিয়ে যুবকরা দক্ষিণ আফ্রিকা, মালি, মৌরতানিয়া, আলজিরিয়া অতিক্রম করে মরক্কোতে উপস্থিত হন। সেখান থেকে শুরু হয় অবর্ণনীয় কষ্ট। সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পান দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, লিবিয়ার আরো ৩০ জন যুবক স্পেন যাওয়ার জন্য দালালদের মাধ্যমে এসেছে। শুরু হয় আন্তর্জাতিক মাফিয়াদের মাধ্যমে স্পেন যাওয়ার মূলপর্ব। সেখান থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় তাদের ওঠানো হয়। নৌকায় ভূমধ্যসাগরে ভাসতে ভাসতে পেরিয়ে যায় ১৪ ঘণ্টা, উপকূলের দেখা মেলেনি। এরপর অকেজো হয়ে যায় নৌকার ইঞ্জিন। খাবার ও পানিবিহীন অবস্থায় কেটে যায় ৯ দিন ১০ রাত। এরই মধ্যে একে একে মৃত্যুর কোলে লুটিয়ে পড়তে থাকে যুবকরা। তাদের লাশ ভূমধ্যসাগরের পানিতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় মারা যায় দোহারের মোসাদ্দেক আলী, হিমেল, ফরহাদ, রবিউল, মামুন, আমীরসহ ১৫ জন। বেঁচে যায় রবিউল, মামুন, মোজাম্মেল ও সোহেল। ঘটনার পর ৪ মাস চিকিত্সা শেষে ঐ ৪ জন দেশে ফিরলে এ মর্মান্তিক ঘটনা প্রকাশ হয়। এরপরই মোশতাকের বিরুদ্ধে দোহার থানায় পুলিশের পক্ষ থেকে একটি মামলা দায়ের করা হয়। মোশতাক যুবকদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার আশ্বাস দিয়ে ঐ মামলা তুলে নেয়ার জন্য পরিবারকে চাপ দিতে থাকে। পরিবার মোশতাকের আশ্বাসে মামলা প্রত্যাহারে আদালতে আবেদন করেন। কিন্তু দালাল মোশতাক ক্ষতিপূরণ না দিয়ে উধাও হয়ে যায়। ফরহাদ, আমীর, রবিউল কারো পরিবারই দালালের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ পায়নি। ফরহাদের মা জোবেদা খাতুন জানান, ছেলেকে স্পেনে পাঠানোর জন্য দালাল মোশতাক ৮ লাখ টাকা নিয়েছিল তা ফেরত দেয়নি। দোহারের লোটাখোলা গ্রামের নিহতদের পরিবারের কাছে মোশতাকের ঠিকানা মেলেনি।