রাধাকৃষ্ণের পদাবলী
নতুন পাঠে নতুন উপস্থাপনায়
প্রকাশ : ০৩ জানুয়ারি ২০১৩, ১৯:০২
৩০ ডিসেম্বর শিল্পকলা একাডেমীর পরীক্ষণ হলের এরিনা মঞ্চে প্রদর্শীত হলো কাব্যনাট্য ‘রাধাকৃষ্ণের পদাবলী’। নাটকটি ‘তীরন্দাজ’-এর একটি নিরীক্ষাধর্মী প্রযোজনা এবং প্রথম মঞ্চায়ন; নির্দেশক দিপক সুমন। ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’-এর আলোকে সৃজনশীল পন্থায় কাব্য-নাটকটি রচনা করেছেন শিল্পী-কবি পূর্ণেন্দু পত্রী। কাব্য-নাটকটিতে নাট্যকার ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’কে মোট পাঁচটি (তৃষ্ণা, অপেক্ষা, কালীদহ, কালীয় দমন ও মুক্তি) পর্বে রূপান্তরিত করেছেন। নাটকটিতে ধ্বনিত হয়েছে ছন্দোময়তা, কৃষ্ণের চাঞ্চল্য, প্রেমতৃষ্ণা, সাহসিকতা ও দিগ্বিজয়ী পৌরুষের জয়গান।
‘তৃষ্ণা’ পর্বে কৃষ্ণের প্রেমতৃষ্ণা, ‘অপেক্ষা’য় আয়ানঘরনি অপরূপা রাধার জন্য কৃষ্ণের অপেক্ষা বিধৃত হয়েছে।
নাটকটি নির্দেশক দিপক সুমনের নিপুণ নির্দেশনায়, কাজী রাকিবের নাট্যানুযায়ী মঞ্চ ও আলোর কারিশমায় কুশীলবদের মঞ্চে প্রবেশ এবং দর্শকদের দিকে মুখ করে প্রার্থনার মধ্য দিয়ে শুরু।
বৃন্দাবনের পথ। হঠাত্ কৃষ্ণের সাথে বড়াইয়ের দেখা। বড়াইকে কৃষ্ণের প্রশ্ন, ‘কাকে খোঁজ? সর্বস্ব কী/ পথিমধ্যে কেড়েছে তস্করে? বড়াই:সে আমার সর্বস্বেরও বেশি হতে পারে/ তাকে কি দেখেছ বাছা বনপথে এধারে ওধারে?’ অতঃপর প্রশ্নোত্তরে কৃষ্ণ পায় রাধার পরিচয়। রাধার রূপের বর্ণনা। তারপর ভালোলাগা, অন্তরে প্রেমের বসন্তবাতাসের ছোঁয়া। রাধাকে দেখার প্রবল স্পৃহায় কৃষ্ণ বড়াইকে দেয় সুগন্ধি পান। দৃশ্যান্তরে বড়াইকে রাধার জিজ্ঞাসা—বড়াই! এমন কর্পূর-গন্ধ পান কোথা পেলি? বড়াইয়ের উত্তর—আমার বাখানি শুনে/ তোর প্রেমে মজেছে একজন...। কৃষ্ণের পরিচয় পেয়ে রাধার ক্ষোভ ও প্রেমপ্রস্তাব প্রত্যাখ্যান।
রাধার জন্য কৃষ্ণের অপেক্ষাশেষে ‘কালীদহ’ পর্ব। কালীদহের পানি সাপের বিষে নীল। এই বিষে মৃত্যু ঘটে মথুরার মানুষ, পশু-পাখির। জনজীবন হয়ে পড়ে বিপর্যস্ত। এতে বিচলিত রাধার উক্তি—এ কার অপরাধ? দুর্নীতিই বা কার?’ বিচলিত হয়ে পড়ে হলভর্তি দর্শকও। রাধার আকুতি—যদি পারে, যদি পারে/ যদি আনে উজ্জ্বল উদ্ধার,/ খুলে দেব সর্ব অঙ্গ থেকে/ সর্ব অলংকার।’ একসময় শুরু হয় কালীয়-কৃষ্ণ যুদ্ধ। মুগ্ধ দর্শক বিস্ময়াভিভূত। সাপের মতো ফস্-ফস্ শব্দে আতঙ্কিত মঞ্চের চারিধার। হঠাত্ কালীয়র কণ্ঠ চেপে ধরে কৃষ্ণ। শুরু হয় দর্শকের করতালি! কালীদহে ফিরে এল হীরক-দ্যুতি জল।
কালীয় দমনের পর দেখা যায় কৃষ্ণের জন্য অপেক্ষারত রাধাকে। কৃষ্ণের আগমনে সখিদের আর বড়াইয়ের হাস্যরসে সতী রাধা কৃষ্ণকে পরিয়ে দেয় নিজের গলার হার। নাট্যের কাহিনি এ পর্যন্তই।
রাধাকৃষ্ণের পদাবলী কাব্যনাটকটির প্রথম প্রদর্শনীর প্রচারপত্রে নির্দেশক বলেছেন, ‘নাটক করার জন্য এমন একটা সহজ কল্প খুঁজছিলাম—সবাই জানে আবার সবটুকু জানে না বা সবটুকু জানে—হয়তো প্রথাগত দৃষ্টিকোণ থেকে। সেই জানা গল্প আমাদের মতো করে খুঁজে দেখার চেষ্টা এই প্রযোজনার আদিগন্ত বিস্তৃত। ...রাধাকৃষ্ণ এই ভয়াবহ সময়ের প্রতীক হিসেবেই ধরা দেয় “পূর্ণেন্দু পত্রী”র কাব্যনাট্য রাধাকৃষ্ণের পদাবলীতে। কৃষ্ণ যেমন পৌরুষের প্রতীক, সম্ভাবনার প্রতীক, সাহসের প্রতীক; রাধাও তেমনি অনুপ্রেরণার প্রতীক, আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, বিজয়ের প্রতীক। এ বিজয় অনিবার্য, এ বিজয় অবশ্যম্ভাবী।’
নাটকটির কাব্যময়তা, নির্দেশনা, দৃশ্যকল্প নির্মাণ, মঞ্চসজ্জা ও আলোর ব্যবহার সবাইকে মোহিত করে রাখলেও তরুণ কুশীলবদের অভিনয়ত্রুটি মাঝেমধ্যে ধরা পড়েছে; বিশেষ করে, নেপথ্যবাদ্যে সঙ্গে কুশীলবদের ছন্দপতন এবং কণ্ঠের ওঠা-নামার ক্ষেত্রে। তবে অধিকাংশ কুশীলবই চরিত্রের দাবি মিটিয়েছে।