বই

স্বাতন্ত্র্যসন্ধানী মগ্নচিন্তা

জীবনের খণ্ডাংশের তীক্ষ-তীব্র ইঙ্গিতময় গল্প বলার উত্সাহে জন্ম ছোটগল্পের। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জহির রায়হান-আখতারুজ্জান ইলিয়াস-সেলিনা হোসেন-শওকত আলী কিংবা সৈয়দ শামসুল হক—যাঁর কথাই বলি না কেন, যুগ-পরম্পরায় এই মহান স্রষ্টাদের হাতে বাংলা কথাসাহিত্য নির্মিত হয়েছে গভীর প্রত্যয়ে। আর এ জন্যই বাংলা কথাসাহিত্যের পরিসর ব্যাপক ও বৈচিত্র্যময়। সাহিত্যের এ ধারাটি নিয়েই কিছু আলোচনা-সমালোচনা করেছেন ড. চঞ্চল কুমার বোস তাঁর ‘বাংলা কথাসাহিত্য এবং অন্যান্য প্রবন্ধ’ গ্রন্থে। মোট তেরটি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে এতে। প্রবন্ধগ্রন্থটির শিরোনামে রয়েছে বিষয়বৈচিত্র্যের প্রতিধ্বনি। সংকলিত প্রত্যেকটি প্রবন্ধ নিরীক্ষা ও গবেষণাধর্মী। ঔপনিবেশিকতার অনিবার্য উত্তরাধিকার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশ বিভাগ, হানাহনি ও সামন্ত্রতান্ত্রিক উত্পাদনব্যাবস্থার প্রভাব বাংলা কথাসাহিত্যের অনেক জায়গা জুড়ে রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়ঙ্কর উন্মত্ততাও বাংলা কথাসাহিত্যে ঘটায় মৌলিক রূপান্তর। গ্রন্থভুক্ত কয়েকটি প্রবন্ধে এই দিকগুলো গুরুত্ব পেয়েছে। কবিতা নিয়ে লেখা থাকলেও লেখকের ঝোঁক মূলত কথাসাহিত্যের দিকে। প্রকাশিত তেরটি প্রবন্ধর মধ্যে আটটি প্রবন্ধ বাংলা কথাসাহিত্য নিয়ে লেখা। কাজী নজরুল ইসলাম, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্, শওকত ওসমান ছাড়াও জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধের পাশাপাশি বাংলাদেশের ছোটগল্পের ওপর রয়েছে কয়েকটি বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধ। প্রবন্ধগুলো তাঁর স্বাতন্ত্র্যের পরিচায়ক। ছোটগল্পের আটটি প্রবন্ধের মধ্যে পাঁচটি বাংলাদেশের ছোটগল্পের বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা। এ ছাড়া বাকি তিনটি হলো:‘নজরুলের ছোটগল্প: আঙ্গিক ও ভাষাবিন্যাস’, ‘সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র ছোটগল্প: শিল্প-প্রকরণ’ এবং ‘শওকত ওসমানের ছোটগল্প: চরিত্র-চিত্রণ’। গ্রন্থের প্রথমেই রয়েছে ‘নজরুলের ছোটগল্প: আঙ্গিক ও ভাষাবিন্যাস’ শীর্ষক প্রবন্ধটি। নজরুল বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট স্বর। কথাসাহিত্যে নজরুলের তেমন সরব উপস্থিতি না থাকলেও এ ধারায় নজরুল একেবারে মলিনও নন। মানবীয় প্রেম তথা নরনারীর হূদয়বৃত্তির বর্ণাঢ্য উদ্ভাসে নজরুলের ছোটগল্প উজ্জ্বল। ‘নজরুলের ছোটগল্পের আঙ্গিক ও ভাষাবিন্যাস’ নামে লেখা প্রবন্ধটিতে ড. বোস ছোটগল্পে নজরুল-শৈলী খোঁজার চেষ্টা করেছেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার মহাকাব্যিক সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্ব। ঔপনেবেশিক ইংরেজদের ১৯০ বছরের দুঃশাসন পেরিয়ে হিন্দুরা পায় হিন্দুস্থান আর মুসলমানরা পায় পাকিস্তান। এরপর ২৪ বছর চলে পাকিস্তানি সরকারের দুঃশাসন। এ সময় পীড়িত মানুষের মর্মচিত্কার ধ্বনিত হয় সর্বত্র। লাড়াকু বাঙালি এ বঞ্চনা মেনে নেয়নি। তাই অনিবার্যভাবে আবার রক্ত দিতে হলো একাত্তরের। বাঙালির এই ইতিহাস কালিক মাত্রা পেয়েছে বাংলা কথাসাহিত্যে। ‘বাংলাদেশের ছোটগল্পে মুক্তিযুদ্ধ:বিষয় ও প্রকরণ’ প্রবন্ধে বাংলাদেশের ছোটগল্পের বিষয় ও প্রকরণ নিয়ে আলোকপাত করেছেন ড. বোস। প্রসঙ্গত এ আলোচনায় উঠে এসেছে জহির রায়হান, সৈয়দ শামসুল হক, শওকত ওসমান, ইমদাদুল হক মিলন, হাসান আজিজুল হকসহ কয়েকজন কথাসাহিত্যিকের বেশ কয়েকটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছোটগল্প। বাংলাদেশের ছোটগল্প নিয়ে যেসব প্রবন্ধ রচিত হয়েছে, তার মধ্যে যে প্রবন্ধটির কথা আলাদা করতে হয়, সেটি হলো ‘বাংলাদেশের ছোটগল্পের বর্ণন-বৈশিষ্ট্য’ প্রবন্ধটি। দীর্ঘ প্রবন্ধটি যেমন তথ্যে ভরপুর তেমনি নিরীক্ষায় বহুমাত্রিক। বাংলাদেশের ছোটগল্পের কালপর্ব ধরে চমত্কার আলোচনা করে যে সারাংশ টানা হয়েছে, তা এককথায় অসাধারণ। আঞ্চলিক জীবনের রূপায়ণ যেকোনো সাহিত্যের বৈচিত্র্য ও বর্ণাঢ্যতাকে প্রকাশ করে। বাংলাদেশের ছোটগল্পে আঞ্চলিকতার রূপায়ণের চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ‘বাংলাদেশের ছোটগল্পে আঞ্চলিক জীবন’ প্রবন্ধে। সোমেন চন্দ, সৈয়দ শামসুল হক, আলাউদ্দিন আল আজাদ, শওকত আলী ও মঞ্জু সরকারের গল্পের আলোচনা করে ছোটগল্পে শ্রেণীচেতনার বিষয়টি দীর্ঘ কলবরে আলোচিত হয়েছে ‘শ্রেণিচেতনা ও বাংলাদেশের ছোটগল্প’ প্রবন্ধে। ব্যাপকভাবে না হলেও বাংলাদেশের অনেক লেখকের লেখায়, গল্পে উঠে এসেছে দাঙ্গার ইতিবৃত্ত। ১৯৩৯ সালের জিন্নাহর দ্বি-জাতিতত্ত্ব, ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগসহ বিভিন্ন ঘটনা উপমহাদেশের পীড়িত মানুষের মনে যে আগুন জ্বেলেছিল, তারই চরম প্রকাশ সামপ্রদায়িক দাঙ্গা। দাঙ্গার বিষয়টি বাংলাদেশের ছোটগল্পে কীভাবে উঠে এসেছে, তা ব্যাখ্যাত হয়েছে ‘বাংলাদেশের ছোটগল্প:প্রসঙ্গ দাঙ্গা’ শীর্ষক প্রবন্ধের আলোচনায়। সোমেন চন্দ, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আবু রুশদ, হাসান হাফিজুর রহমানসহ রাহাত খানের ছোটগল্পে দাঙ্গার প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে এ প্রবন্ধে। লেখক-গবেষক ‘বাংলা কথাসাহিত্য এবং অন্নান্য’ প্রবন্ধগ্রন্থে মানিকের উপন্যাস নিয়ে তিনটি দীর্ঘ প্রবন্ধ সংযুক্ত করেছেন—‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস:পরাভূত পুরুষের স্বপ্নবৃক্ষ’, ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস: বৃত্তভাঙ্গা নারী’ এবং ‘মানিক সাহিত্যে মাতাল চরিত্র’। প্রবন্ধ তিনটি নিঃসন্দেহে শিল্পোত্তীর্ণ। প্রবন্ধের নামকরণেও রয়েছে শৈল্পিকতার ছোঁয়া। শওকত ওসমান বাংলা ছোটগল্পের এক বিশিষ্ট স্রষ্টা। তাঁর ছোটগল্পে উঠে আসা চরিত্র চিত্রণের বিষয়টি উঠে এসেছে ‘শওকত ওসমানের ছোটগল্পের চরিত্র-চিত্রণ’ নামের প্রবন্ধে। সবশেষে জীবনানন্দকে নিয়ে ‘জীবনানন্দের কবিতা :মৃত্তিকায় প্রণীত জীবন’ ও ‘জীবনানন্দের কবিতায় পুরাণ ও লোক-ঐতিহ্য’ নামের দুটি প্রবন্ধ সংযোজিত হয়েছে, যার একটিতে জীবনানন্দের কবিতায় গ্রামীণ জীবনের রূপায়ণ দেখানো হয়েছে এবং অন্যটিতে জীবনানন্দের কবিতায় পুরাণ-প্রসঙ্গ ও লোক-ঐতিহ্যভাবনা প্রকাশিত হয়েছে। বাংলা কাব্যসাহিত্যে জীবনানন্দের বিশিষ্টতা অত্যুজ্জ্বল। ড. বোস এ প্রবন্ধে জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে বলেছেন, ‘যুগের কালো অন্ধকার থেকে মুক্তির প্রত্যাশায় কবি যেন আশ্রয় নিয়েছেন পুরাণের ঐশ্বর্যে।’ প্রকৃতির যে শাশ্বত বহমানতার মধ্যে জীবনের স্থিতি ও আশ্বাস পেতে চেয়েছেন কবি, সেই প্রকৃতি-আশ্রয়ী জীবনের মহিমা অন্বেষণে জীবনানন্দ পুরাণ ও লোক-ঐতিহ্যের মায়াবি ভুবনে বিচরণ করেছেন। এ ছাড়া ‘জীবনানন্দের কবিতা:মৃত্তিকায় প্রণীত জীবন’ থেকে একটি পাঠ নেওয়া যেতে পারে, ‘জীবনানন্দের কবিতায় জীবনের যে অনেকান্ত প্রকাশ, তার মর্মমূলে প্রায়শ ধ্বনিত হয় নিভৃত পল্লির মেঠো সুর। ধূসর পাণ্ডুলিপি (১৯৩৬) থেকে রূপসী বাংলা (১৯৫৭) পর্যন্ত জীবনানন্দ নিঃসঙ্গ পরিব্রাজকের মত ঘুরে বেড়িয়েছেন গ্রামীণ ধূলিধূসর পথে।’ বাংলা সাহিত্যের বিস্তীর্ণ ভুবনে ড. বোসের গবেষণাধর্মী প্রবন্ধগ্রন্থটি স্বল্পপ্রয়াস হলেও তা বাংলা সাহিত্যের বাতিঘরের দীপশিখা বলা যায়। বাংলা কথাসাহিত্যের দিকিনর্ণয়ে কিংবা বিশিষ্টতা সন্ধানে গ্রন্থটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।