চিত্র প্রদর্শনী
বিমূর্ত শব্দকল্প
প্রকাশ : ০৩ জানুয়ারি ২০১৩, ১৯:০৮
লাল সূর্যটা ডোবে পশ্চিম আকাশে। উজ্জ্বল আলো হয়ে ওঠে পুব আকাশে। ত্রিশ লক্ষ মানুষের লাল রক্তে রঞ্জিত এ মাটির গন্ধ বীরেন সোমের শিরায় শিরায় ধাবিত। ছবির জমিন ভরে যায় লাল রঙে। মূর্ত ধারায় ভাবনার প্রকাশভঙ্গি এবার একেবারে ভিন্ন। পটুয়া-শিল্পী কামরুল হাসানের সহযাত্রী হয়ে মুজিবনগর সরকারের তথ্য ও প্রকাশনা মন্ত্রণালয়ের শিল্পী হিসেবে কাজ করেছেন মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে। চার দশকের শিল্পনির্মাণে নিমগ্ন সাধক বীরেন সোম কাজ করেছেন নানান মাধ্যমে, বিষয়ে। প্রকৃতির রূপ আর মায়া তাঁর ছবিতে উপস্থিত হয়েছিল দীর্ঘ সময় ধরে। গত সাতটি একক প্রদর্শনীতে আমরা বাস্তবমুখী নির্মাণের একটি বার্তা পেয়ে যাই। তা হলো প্রকৃতির বন্দনা। নিভৃচারী, মৃদুভাষী বীরেন সোম নানান মাধ্যমে শিল্প সৃষ্টি করেছেন। শিশুতোষ গ্রন্থের অলঙ্করণ থেকে শিক্ষাকার্যক্রমে পাঠযোগ্য সহজ বইয়ের প্রকাশনায় তিনি একসময় মনোযোগী ছিলেন। ছাত্রজীবনে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন এ দেশের বিমূর্ত অভিব্যক্তি চিত্রকলার জনক মোহাম্মদ কিবরিয়াকে। তাঁর ছায়ায় বেড়ে উঠেছেনস বীরেন। সেই সূত্রে ষাটের দশকে বাংলাদেশের চিত্রকলার গতিপথ নির্মাণে তাঁর কাজ অনিবার্য হয়ে ওঠে। বাস্তবরীতির আশ্রয়ে তাঁর শিল্পকর্ম ভাব বা রসবোধ-বঞ্চিত মনে হয়নি একটুও। প্রকৃতি দর্শনে শিল্পী ধ্যানী। বাংলার নিসর্গ তাঁর মনোভাবনায় নিবিড় মমতায় থিতু হয়ে আছে এখনও।
অষ্টম একক প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া চিত্রকর্মের সংখ্যা ৭০টি। ক্যানভাসে তেলরং, অ্যাক্রিলিক ছাড়াও রয়েছে কলোগ্রাফ ছাপচিত্র। এ প্রদর্শনীর জ্যামিতির আশ্রয়ে গড়া কাজের প্রসঙ্গে শিল্পী মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধ, প্রকৃতি, মানুষ, আবহমান বাংলার নিসর্গ তাঁর ছবির বিষয়—মানুষ ও প্রকৃতির মাঝে আমরা যা প্রতিনিয়ত দেখছি। এসব শিল্পীর নিবিড় চোখে দেখা। উপলব্ধি আর ভাবনার মিশেলে শুদ্ধতার প্রকাশ ঘটে। এবারের কাজগুলো অন্তর্গত চেতনার বিশুদ্ধ শব্দকল্প। প্রকৃতি, আবহমান, বাংলার রং আর ফর্ম অবলোকনের নিবিষ্টতা এ প্রদর্শনীতে স্পষ্ট। চিত্রতলের ব্যবস্থাপনার জন্য তিনি বিশিষ্টতা অর্জন করেছেন। একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাওয়ার জন্য বীরেন সোমের দীর্ঘ চার দশকেরও অধিক সময়ের অভিযাত্রার আয়োজন বর্তমান প্রদর্শনী। তেল রঙের পরিপক্ব আচরণ, অ্যাক্রিলিক মাধ্যমের ধোয়া পদ্ধতির অনুসরণে কাজগুলো ঋদ্ধ। শিল্পমাধ্যমের নিরীক্ষা প্রতীয়মান হয়েছে। ‘ডাউন পুওর টাচি দ্য ইমোশন’ ছবিটিতে দুটি আকৃতি বিভক্ত হয়ে লাল রং এসে কালো রঙের সাথে মিশেছে। রক্তের সে াতধারা কিংবা আবেগময় রক্তিম আভার মিশেল শিল্পীর অন্তর্গত ভাষার দলিল। এ রকম রং প্রয়োগের অভ্যেসের মধ্যে বীরেন হাজির হন। ক্যানভাস বুনটের আভাস দেয়, কারণ জ্যামিতি ও বুনটের মিশ্রণে তৈরি হয়েছে ছবির ভাষা।
প্রকৃতির রহস্য ধরা দেয় বীরেন সোমের ‘দি ক্রিয়েশান অন মাই উইন্ডো সিল’ বা ‘জানালার পাশ ঘেঁষে গড়ে ওঠা প্রকৃতির সৃষ্টি’ ছবিতে। জানালার পাশ বেয়ে বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ার মুহূর্ত ক্যানভাসে তুলে আনেন শিল্পী। বেশ কয়েকটি ছবিতে বর্গাকৃতির ক্যানভাসের মাঝে বৃত্ত স্থাপন করে নীল ও ধূসর রং যুক্ত করেছেন তিনি। বৃত্তের ভেতর নীল-কালো অবিরাম ঘূর্ণমান। এ অবস্থাকে শিল্পী নিজের ভেতর চলতে থাকা মনোজাগতিক চলন হিসেবে বোঝাতে চেয়েছেন।
‘ফ্লামেংকো অব রেডনেস’, ‘স্প্লাটেরনিং রেইনড্রপ অন দ্য ওয়েসাইড’—ক্যানভাস দুটি উলম্ব আকৃতির; ধোয়া পদ্ধতিতে লাল ও কালো রঙের ওয়াশ ক্রমে ক্যানভাসে বিস্তৃত হয়েছে।
প্রদর্শনীর অধিকাংশ কাজে লাল রঙের উপস্থিতি লালের প্রতি শিল্পীর পক্ষপাতিত্বকে নির্দেশ করে। রঙের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় শিল্পী সফল—তাঁর কাজগুলোই এ কথা বলে দেয়। ১ জানুয়ারি বেঙ্গল গ্যালারিতে শুরু হওয়া এ প্রদর্শনী শেষ হবে ১২ জানুয়ারি।
বীরেন সোম :১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ (প্রাক্তন চারুকলা ইনস্টিটিউট) থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ঢাকার বিভিন্ন গ্যালারিতে ইতিপূর্বে ৭টি একক প্রদর্শনীর আয়োজন ও দেশ-বিদেশে ৭০টির অধিক দলীয় প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ে ডিজাইনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্বেরিয়াম, বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ডিজাইনার (১৯৭১—২০০৫) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি স্বাধীন শিল্পী হিসেবে কাজ করছেন।