চার বছরেও লাভজনক হয়নি রাষ্ট্রায়ত্ত চিনি কলগুলো

বর্তমান সরকারের সময়কালে রাষ্ট্রায়ত্ত মৃতপ্রায় চিনিকলগুলোকে লাভজনক করার উদ্যোগ নেয়া হলেও এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ সফলতা আসেনি বলে জানালেন শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া। তিনি জানান, ফরিদপুর সুগার মিলস্- এর বিএমআরই এবং ৭টি সুগার মিলের আধুনিকায়ন কাজ সমাপ্তির পথে। খুব শীঘ্রই এর ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে। গতকাল শিল্প মন্ত্রণালয়ে মহাজোট সরকারের ৪ বছরে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অর্জন তুলে ধরতে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান চিনিকলে কো-জেনারেশন অব পাওয়ার প্রকল্পের আওতায় বিদ্যুত্ উত্পাদন, ‘র’ সুগার থেকে রিফাইন্ড সুগার উত্পাদন, নতুন ডিস্টিলারি ইউনিট স্থাপন, প্রেসমাড ও স্পেন্ট ওয়াস থেকে বায়োফার্টিলাইজার বা জৈব সার উত্পাদনের প্রচেষ্টা চলছে। সুগারবিট থেকে চিনি উত্পাদনের লক্ষ্যে প্রায় সকল সুগার মিলে ইতিমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে সুগার বিট উত্পাদন শুরু হয়েছে। আখ চাষে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে আখের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। চিনিকলগুলো লাভজনক করার এ উদ্যোগে আমরা এখনো শতভাগ সফল না হলেও প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে শিল্পপ্রতিমন্ত্রী ওমর ফারুখ চৌধুরী, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ফরহাদউদ্দীনসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। শিল্পমন্ত্রী জানান, আমরা চিনিকলগুলোর অপচয়রোধ, আখ ক্রয়ে স্বচ্ছতা ও চাষিদের হয়রানিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। এ লক্ষ্যে সকল চিনিকলে ডিজিটাল পুর্জি বা ই-পুর্জি পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। এর ফলে আখ চাষিগণ এখন এসএমএস এর মাধ্যমে নির্ধারিত মোবাইল ফোনে আখ/পুর্জি সরবরাহের অর্ডার পেয়ে যাচ্ছেন। বর্তমান সরকারের ৪ বছরের সাফল্য তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশে সারের সংকট নেই। আসছে বোরো মৌসুমের জন্য ৮ লাখ ৪১ হাজার মেট্রিক টন সার মজুত রয়েছে। তবে গ্যাসের অভাবে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে সার উত্পাদন করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, আমাদের ছয়টি সার কারখানা রয়েছে। এর উত্পাদন ক্ষমতা ১৮ লাখ মেট্রিক টন। অথচ গ্যাসের অভাবে ১০ লাখ মেট্রিক টন উত্পাদন সম্ভব হচ্ছে। গত চার বছরে সারের জন্য কৃষককে দৌড়াতে হয়নি। কৃষকের পেছনে সার দৌড়িয়েছে। সার ব্যবস্থাপনায় আমরা সফল হয়েছি। ফলে উচ্চ ফলন হয়েছে। আমরা বর্তমানে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি। তিনি জানান, বিগত চার বছর আমাদেরকে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার নেতিবাচক প্রভাব এবং শিল্পখাতে দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত জঞ্জাল ও সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়েছে। অগ্রগতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির চলমান ধারা ও রূপকল্প-২০২১-এর সাথে সমন্বয় করে জাতীয় শিল্পনীতি-২০১০ প্রণয়ন করা হয়েছে। পরিবেশবান্ধব জাহাজ ভাঙ্গা ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা নিরসন করে সাভারের পরিবেশবান্ধব চামড়া শিল্পনগরীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্যশোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণের কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে সিইটিপি নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এটি নির্মাণ সম্পন্ন করে হাজারিবাগের ট্যানারি শিল্পকে সাভারের পরিবেশবান্ধব স্থানে স্থানান্তরে সক্ষম হবো বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। আমদানিকৃত ও উত্পাদিত ইউরিয়া সার সংরক্ষণের জন্য চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরে ২টি নতুন বাফার গুদাম নির্মাণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আওতাধীন বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (বিএমটিএফ) বাফার গুদাম দু’টি নির্মাণ করেছে। প্রতিটি ২৫ হাজার মেট্রিক টন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন গুদাম দু’টিতে ৫০ হাজার মেট্রিক টন সার সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। নতুন সার কারখানা স্থাপন ঃ দীর্ঘ ২০ বছর পর বার্ষিক ৫ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন ক্ষমতাসম্পন্ন শাহজালাল সার কারখানা নামে একটি নতুন ইউরিয়া সার কারখানা নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে এ সার কারখানার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন। এটি চালু হলে, দেশে সার ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যুক্ত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। উল্লেখযোগ্য সাফল্যের মধ্যে বর্তমান সরকারের সময়কালে চলচ্চিত্র নির্মাতা, প্রযোজক, পরিচালক, শিল্পী ও কলাকুশলীদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে চলচ্চিত্রকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। জাতীয় মান নির্ধারণী সংস্থা বিএসটিআই’র আধুনিকায়নের পাশাপাশি এর জনবল বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। গত চার বছরে দেশব্যাপী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পায়ন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। জেলা পর্যায়ে অবস্থিত বিসিক শিল্প সহায়ক কেন্দ্রে ৬৪টি এবং বিভিন্ন ট্রেড বডিতে ৭টি এসএমই হেল্পলাইন সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত ১শ‘ ৭৭টি সম্ভাবনাময় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ক্লাস্টার চিহ্নিত করেছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ফাউন্ডেশন। ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের মাঝে সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ১৩ কোটি টাকা জামানতবিহীন ঋণ প্রদান করেছে। শতকরা ৯ ভাগ হার সুদে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ ঋণ দেয়া হয়েছে। খুব শীঘ্রই আরো ছয় কোটি টাকা জামানতবিহীন ঋণ দেয়া হবে। এছাড়া মহিলা উদ্যোক্তাদেরকে সাত লাখ টাকা থেকে ২৪ লাখ টাকা পর্যন্ত বন্ধকীবিহীন ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন শিল্পমন্ত্রী।