গম্ভীরা গানের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়াস
মো. তসলিম উদ্দিন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে
প্রকাশ : ০৪ জানুয়ারি ২০১৩, ১৯:৩৬
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিভিন্ন বিষয়ে জনসচেতনতার মাধ্যম হয়ে উঠেছে গম্ভীরা গান। কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, বিশুদ্ধ পানি, নারীর ক্ষমতায়নসহ জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনসচেতনতার অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী গম্ভীরা গান। নানা-নাতির হাস্যরসের মধ্য দিয়ে সহজেই সাধারণ মানুষকে ধারণা দিতে গম্ভীরা গান ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। আর তাই বিভিন্ন সংস্থা কিংবা প্রতিষ্ঠান পিছিয়ে পড়া জনসাধারণকে উপরোক্ত বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন করতে এই গম্ভীরাকেই মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের মধ্যে আলাতুলি ইউনিয়ন একেবারে সীমান্ত ঘেঁষা ইউনিয়ন। পদ্মা নদীর ওপারে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এই ইউনিয়নটির জনসাধারণ বসবাস করে। অনেক বাড়িতে সৌর বিদ্যুত্ থাকলেও আধুনিকতার ছোঁয়া তেমন লাগেনি। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা খুবই অপ্রতুল। শুষ্ক মৌসুমে মোটর সাইকেলে যাতায়াত করতে পারলেও বর্ষায় বহুদূর পায়ে হেঁটে যাতায়াত করতে হয়। যোগাযোগের প্রধান বাহন এখনো গরুগাড়ি। সব রাস্তা কাঁচা। এর সাথে যোগ হয় পদ্মা নদীর তীব্র ভাঙ্গন। এই ভাঙ্গনে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে চরাঞ্চলের ইউনিয়নগুলির যোগাযোগ ব্যবস্থা। গত শুক্রবার আলাতুলি ইউনিয়ন ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে।
এ ইউনিয়নের মানুষ মূলত কৃষি নির্ভর। গরিব মানুষের সংখ্যাও অনেক বেশি। পদ্মার ভাঙ্গনে বহু পরিবার জমি-জায়গা হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়। মানবেতর জীবন যাপন করে। এমন অবস্থায় সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এসেডো কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইডের কারিগরি সহযোগিতায় এবং আইরিশ এইডের অর্থ সহায়তায় আলাতুলি ও নারায়ণপুর ইউনিয়নে গরিব মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে “নদী ও জীবন-২” নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্পের আওতায় গরিব মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিনামূল্যে ১০টি গরু, ১ হাজার ৩১২টি ছাগল, ৯শ মুরগি প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়া পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য ২ হাজার ২৪৪ পরিবারের মাঝে ১১ হাজার ২২০টি বৃক্ষ চারা বিতরণ করা হয়েছে এবং দ্বীপচরের জমিতে ঝিঙ্গে বাদাম, ভুট্টা ও সবজি চাষে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, বিশুদ্ধ পানি, নারীর ক্ষমতায়নসহ জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনসচেতনতার কাজটিও এসেডো করছে বলে জানানো হয়।
গত শুক্রবার আলাতুলি ইউনিয়নের সরকারপাড়ায় বিকালে আয়োজন করা হয় জনসচেতনতামূলক গম্ভীরা গানের। গম্ভীরাস্থলে শহরের মতো চোখ ধাঁধানো কোনো কিছু ছিল না। রাস্তার পাশে একটি বাড়ির সামনে সামান্য মাইক ব্যবহার করে উপস্থাপন করা হয় গম্ভীরা গান। দেখতে না দেখতে সকল বয়সের মানুষ জড়ো হয় সেখানে। গম্ভীরা গানের চরিত্র নানা সাইদুর রহমান ও নাতি খাবির উদ্দিন সাবলিল ভাষায় বাস্তবচিত্র তুলে ধরেন। স্বাস্থ্য, কৃষিতে ভাল ফল পাওয়া যায়, নারী ও পুরুষ যৌথভাবে কাজ করে উপার্জন করতে পারে, গাছপালা না থাকলে পরিবেশের ক্ষতি হয়, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের মানুষ কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, দ্বীপচর এলাকার মানুষ কিভাবে দুর্যোগ মোকাবেলা করবে ইত্যাদি বিষয় উঠে আসে গম্ভীরা গানে। গম্ভীরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নদী ও জীবন-২-এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক মোস্তফা মোহাম্মদ নূরুন নবী, একই প্রকল্পের অর্থ ও প্রশাসন বিভাগের কর্মকর্তা মো. নূরুজ্জামান, ইকোনোমিক ফ্যাসিলেটেটের মো. শরিয়তুল্লাহ প্রমুখ।