পুকুরে তেলাপিয়ার মনোসেক্স পোনা উত্পাদন প্রযুক্তি

অ্যালকোহলের সাথে হরমোন মিশ্রণের কৌশল ও মাত্রা: তেলাপিয়ার পুরুষ মাছ উত্পাদনের জন্য ১৭ আলফা মিথাইল টেস্টোস্টেরন নামক হরমোন প্রয়োজন। একদিনের বাচ্চাকে পুকুর থেকে ধরে হাঁপায় স্থানান্তরের পর ওই হাঁপায় হরমোন মিশ্রিত খাবার দিতে হবে। সাধারণত হ্যাচারিতে তেলাপিয়ার বাচ্চা ফুটানোর পর ৫/৬ দিন হরমোন মিশ্রিত খাবার খাওয়ানোর পরে পুকুরে স্থাপিত হাঁপায় খাবার প্রয়োগ করা হয়। এক্ষেত্রে হ্যাচারির কোনো হাউজ বা সির্স্টান ব্যবহার না করে সরাসরি পুকুরে স্থাপিত হাঁপায় খাবার দেয়া হয়। প্রথমে একটি ছোট সেপ্র মেশিনের ছোট বোতলে পরিমিত মাত্রায় হরমোন ভরে তারপর ওই হরমোনের সাথে ইথাইল অ্যালকোহল মেশাতে হবে। অ্যালকোহলে হরমোন মিশে যাবে। পরে ওই হরমোন মিশ্রিত অ্যালকোহল খাবারের উপর কমপক্ষে চারবার সেপ্র করতে হবে। অ্যালকোহলের সাথে হরমোন মেশানোর অর্থ হল- হরমোন মিশ্রিত অ্যালকোহল খাবারের উপর সেপ্র করার পর অ্যালকোহল উবে গিয়ে খাবারের মধ্যে হরমোন মিশে যাবে। এখানে অ্যালকোহল শুধুমাত্র খাবারে হরমোন মেশানোর মিডিয়া হিসেবে কাজ করে। নিচে ১ কেজি খাবার বানানোর জন্য প্রক্রিয়াসহ উপকরণাদি উল্লেখ করা হল- ১ কেজি খাবারের জন্য প্রথমে দরকার ১ কেজি ভাসমান নার্সারি খাবার। পাশাপাশি দরকার ৭৫ মি:গ্রা:১৭ আলফা মিথাইল টেস্টোস্টেরন নামক হরমোন। বিশুদ্ধ ইথাইল অ্যালকোহল লাগবে ১০০ মি:লি:। প্রস্তুত প্রণালী:প্রথমে ১ কেজি নার্সারি খাবার একটি পলিথিন কাগজের উপর পাতলা করে ছড়িয়ে দিতে হবে। সেপ্র বোতলে (এখানে সেপ্র বোতল বলতে ৫০০ মি:লি:প্লাস্টিকের বোতলে সাথে একটি সেপ্রগানসহ বোঝানো হয়েছে) ১০০ মি:লি: ইথাইল অ্যালকোহল ভরে তার মধ্যে ৭৫ মি:গ্রা: হরমোন (১৭ আলফা মিথাইল টেস্টোস্টেরন নামক হরমোন) মেশাতে হবে। অ্যালকোহলে এই হরমোন দ্রবীভূত হয়ে যাবে। হরমোন মিশ্রিত অ্যালকোহলের দ্রবণ পলিথিনের উপর প্রস্তুত রাখা নার্সারি খাবারে পর্যায়ক্রমে চার বার সেপ্র করতে হবে। প্রথমবার সেপ্র করার পর দু’হাতের তালু দিয়ে ঘষে ঘষে মেশাতে হবে। এভাবে প্রত্যেকবার সেপ্র করার পর দু’হাতের তালু দিয়ে ঘষে ঘষে মেশাতে হবে। এভাবেই খাবার প্রস্তুত হবে। এ খাবার ঘরের ছায়ায় ৮ ঘণ্টা বিছিয়ে রেখে শুকাতে হবে এবং ঘণ্টায় ঘণ্টায় হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করে দিতে হবে। তাতে অ্যালকোহল উবে গিয়ে শুকনো খাবার হিসেবে থাকে। কোনো অবস্থাতেই রোদে খাবার শুকানো যাবে না। বেশি আর্দ্রতাসম্পন্ন মেঘলা দিনে খাবার না বানানোই ভাল। মেঘলা দিনে খাবার বাননো হলে খাবারে বেশি আর্দ্রতা থাকতে পারে। ফলে খাবারে হরমোনের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। প্রয়োগ পদ্ধতি:কীভাবে বাচ্চা সংগ্রহ করতে হবে তা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। বাচ্চাগুলোকে হাঁপায় রেখে ওই প্রস্তুতকৃত খাবার দিনে পাঁচবার দিতে হবে। আবার খাবার যেন বেশি না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। সাধারণত রেনুর ওজনের ২০ ভাগ খাবার দিলেই চলবে। খাবার বেশি হলে হাঁপায় গ্যাসের সৃষ্টি হয়ে রেনু মারা যেতে পারে। এ জন্য হাঁপায় এক সপ্তাহ খাবার দেয়ার পর হাঁপা পরিবর্তন করতে হবে অর্থাত্ ওই হাঁপার রেনু অন্য আরেকটি পরিষ্কার হাঁপায় স্থানান্তর করতে হবে। খাবার প্রয়োগের প্রথম দিকে রেনুগুলো কম খাবে আর সে জন্য প্রথমদিকে কম পরিমাণে খাবার দিতে হবে। এভাবে ২৮ দিন হরমোন মিশ্রিত খাবার খাওয়ালে মনোসেক্স তেলাপিয়ার পোনা বা পুরুষ তেলাপিয়া পোনা উত্পাদন হবে। উল্লেখিত প্রক্রিয়ায় ৯৫ ভাগ পর্যন্ত পুরুষ তেলাপিয়া উত্পাদন সম্ভব হয়েছে। এ পদ্ধতি অবলম্বন করে যে কেউ পুকুরে তেলাপিয়ার মনোসেক্স পোনা উত্পাদন করতে পারবেন। সুপার পুুরুষ পদ্ধতি:সুপার পুরুষ পদ্ধতিতে একটি সুপার পুরুষ মাছের সাথে যেকোনো তেলাপিয়ার স্ত্রী মাছের প্রজনন করার পর এর সব বাচ্চাই হয় পুরুষ। এক্ষেত্রে কোনো প্রকার হরমোন ছাড়াই জন্মগতভাবেই এরা পুরুষ হয়ে থাকে। অর্থাত্ কোনো পুকুরে সুপার পুরুষ ও স্ত্রী মাছ ছেড়ে দিলে তারা যে বাচ্চা দেবে তার সবগুলোই পুরুষ বাচ্চা। এ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল এবং সময়সাপেক্ষ। তবে এ প্রক্রিয়াটি সহজে যাতে করা যায় তার জন্য কাজ করছি। বিজ্ঞানীদের মতে, প্রথমে কিছু তেলাপিয়ার রেনুকে (৩ দিন বয়সী) স্ত্রী হরমোন প্রয়োগ করে সব বাচ্চাকে স্ত্রী মাছে রূপান্তরিত করতে হবে। তারপর প্রজন্ম পরীক্ষা করে রূপান্তরিত স্ত্রী মাছ শনাক্ত করতে হবে। শনাক্তের প্রক্রিয়াটি হল- স্ত্রী মাছ হরমোন প্রয়োগের ফলে রূপান্তরিত স্ত্রী মাছ (অর্থাত্ জন্মগতভাবে যে মাছটি পুরুষ এবং হরমোন প্রয়োগের ফলে স্ত্রী মাছ) অন্য আরেকটি সাধারণ পুরুষের সাথে প্রজনন করার ফলে যদি ৭৫ ভাগ পুরুষ মাছ জন্ম নেয় তাহলে বুঝা যাবে এই স্ত্রী মাছটিই হল রূপান্তরিত স্ত্রী মাছ। এখানে উল্লেখ্য যে, উক্ত ৭৫ ভাগ পুরুষ মাছের মধ্যে ২৫ ভাগ পুরুষ মাছ হল সুপার পুরুষ। আর যদি স্ত্রী মাছের সাথে আরেকটি পুরুষের প্রজননের ফলে বাচ্চাগুলো অর্ধেক পুরুষ আর অর্ধেক স্ত্রী হয় তাহলে সেটা রূপান্তরিত স্ত্রী মাছ নয়। অর্থাত্ সেটা সাধারণ স্ত্রী মাছ। এই স্ত্রী মাছগুলোকে মেরে ফেলতে হবে। উপরোল্লিখিত ২৫ ভাগ সুপার পুরুষের শনাক্তের জন্য প্রজন্ম পরীক্ষা করতে হবে। অর্থাত্ এসব পুরুষের সাথে স্ত্রী মাছের প্রজননের ফলে সব বাচ্চাই যদি পুরুষ বাচ্চা হয় তাহলে এই বাচ্চা উত্পাদনে ব্যবহূত পুরুষটিই হল সুপার পুরুষ। এটি একটি জটিল এবং সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। এ ব্যাপারে আমার অভিজ্ঞতার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ আগামী কোনো এক সংখ্যায় প্রকাশ করার ইচ্ছে রইল। (শেষ)