মানুষের বোধের জায়গায় নাড়া দিতেই হবে

সত্যিই যোদ্ধা বটে। সংবাদমাধ্যমসহ আপামর মানুষ তাকে সম্মান দিয়েছে। বলেছে, ‘ব্রেভহার্ট’। মৃত্যুর পর গল্পটা যেন দ্রুত পাল্টে না যায়। মেয়েটিকে উচিত শিক্ষা দিতে চেয়েছিল ওরা। অপরাধ? পাষণ্ড মানুষগুলোর বর্বর ইচ্ছা প্রতিরোধে মেয়েটি ছিল প্রচণ্ড সাহসী। এরা কি মানুষ? নিশ্চয়ই না। কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। সন্দেহ না থাকলেও, সংশয় আছে। জনসংখ্যার আধিক্যে মানুষ বাড়ছে? নাকি অমানুষ? সাহসী, প্রতিবাদী এবং যোদ্ধা হিসেবেই মাত্র ২৩ বছরেই জীবনের গল্পটা শেষ হলো মেয়েটার। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যুদ্ধ করেছে। জীবনের কাছে হেরে গিয়ে মৃত্যুর দেশে চলে যাওয়া মেয়েটি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রতিবাদ জানিয়েছে। এক মুহূর্তের জন্যও ভেঙ্গে পড়েনি। শাস্তির দাবিতে পিছিয়ে পড়েনি। মেয়েটির অভিযোগের ভিত্তিতেই ধর্ষণকারীদের গ্রেফতার করা হয়। মৃত্যুর মাত্র তিনদিন আগে ২৫ ডিসেম্বর ২০১২ প্রচণ্ড অসুস্থ অবস্থাতেও মেয়েটি মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে সাক্ষ্য দেয়। এক মুহূর্তের জন্যও হাল ছাড়েনি। পিছিয়ে পড়েনি। ভয়ও পায়নি। সত্যিই যোদ্ধা বটে। সংবাদমাধ্যমসহ আপামর মানুষ তাকে সম্মান দিয়েছে। বলেছে, ‘ব্রেভহার্ট’। মৃত্যুর পর গল্পটা যেন দ্রুত পাল্টে না যায়। কেউ যেন কখনও না বলে, ‘২৯ ডিসেম্বর ২০১২ ধর্ষিতা এক মেয়ের মৃত্যু হয়েছিল।’ সবাই যেন তাকে মনে রাখে , প্রজন্মকে গল্প শোনায় বর্বরতার বিরুদ্ধে সাহসী মেয়েটার যুদ্ধের। গল্পটা যেন পাল্টে না যায়। পুরানো গল্প নতুন মোড়কে মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ে ধর্ষণ কোন নতুন ঘটনা নয়। এ যেন পুরানো গল্প নতুন মোড়কে। এখানে, ওখানে, আনাচে, কানাচে প্রতিনিয়ত চলছে জঘন্য বর্বর এই ঘটনা। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৬৫টি দেশে প্রতিবছর আড়াই লাখের বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। পুলিশের দেয়া তথ্য মতে, দিল্লিতে প্রতি ১৮ ঘন্টায় একটি ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। ১৬ ডিসেম্বর ২০১২ এর রাতটিও ছিল অন্যান্য পৈশাচিক ঘটনারই ধারাবাহিক নতুন একটি অধ্যায়। সে রাতে দিল্লিতে বাস নিয়ে বেরোনোর আগে ছোটোখাটো একটা পার্টি করেছিল বাসের চালক রাম সিং ও তার সঙ্গীরা। সংখ্যায় ছিল ৬ জন। প্রত্যেকেই ছিল মদ্যপ অবস্থায়। রাত সোয়া নয়টায় বাসে ওঠেন প্যারামেডিক্যালের এক ছাত্রী এবং তার বন্ধু। কিছুক্ষণ পর ছাত্রীকে লক্ষ্য করে অশালীন মন্তব্য করতে থাকে তারা। প্রতিবাদ করায় ছাত্রীর বন্ধুটিকে রড দিয়ে পেটানো হয়। বাধা দিতে এলে ছাত্রীটিকে রড দিয়ে পিটিয়ে পিছনের সিটে নিয়ে উপর্যুপরি ধর্ষণ করা হয়। বাস থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয় তাদের। কি ভয়ংকর! কি নিকৃষ্ট! ঘৃণায় শরীর কেঁপে ওঠে। তিনবার অস্ত্রোপচারের পরও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ছাত্রীটিকে ২৬ ডিসেম্বর ২০১২ সিঙ্গাপুর হাসপাতালে নেয়া হয়। কিন্তু তার আগেই দুইবার তার হার্ট অ্যাটাক হয়। ফুসফুস, মস্তিষ্কে সংক্রমন ছাড়াও তলপেটেও ছিল তার মারাত্মক জখম। অসুন্দরের সাথে যুদ্ধ করে হেরে যাওয়া মেয়েটি শেষ পর্যন্ত জীবনের কাছেও হেরে যায়। ২৯ ডিসেম্বর মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে ভোর পৌনে পাঁচটায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে মেয়েটি। মৃত্যুর আগ মুহূর্তে কি ছিল তার অনুভূতি? আমরা জানি না। জানা আর সম্ভবও নয়। প্রচণ্ড ঘৃণাবোধে মানুষের ওপর সবটুকু আস্থা নিশ্চয়ই সে হারায়নি। কেন হারাবে? মানুষ তো তার পাশেই ছিল। যারা ছিল না, তারা তো মানুষ নয়, ‘অমানুষ’। সাধারণের কণ্ঠস্বর ‘আমরা এমন লোককে রাস্তায় নেমে আসতে দেখেছি যারা জীবনে প্রথম কোন বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন।’ দিল্লিতে ধর্ষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার একটি নাগরিক সংগঠনের মুখপাত্র নন্দিনী রাও বিবিসিকে একথা বলেন। এমনটাই তো হওয়ার কথা ছিল। ‘আমরা যদি না জাগি মা ক্যামনে সকাল হবে?’ সাধারণের বিক্ষোভের কাছে হার মেনেছে রাজনৈতিক দল কিংবা স্বার্থান্বেষী মহলের একচ্ছত্র আধিপত্য। নিজস্ব বোধ আর চাপা ক্ষোভে বিক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ। এ জোয়ার ঠেকায় কে? নারী সাংসদেরা এই ঘটনায় চুপ করে বসে থাকতে পারেনি। ধিক্কার জানিয়েছে চরম ক্ষোভে। বিরোধী সাংসদ এমনকি নিজের দলের সাংসদদেরও ধিক্কার শুনতে হয় ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুশীলকুমার শিন্দেকে। এই ধিক্কারের ভেতরে সাজানো কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না। রাখার উপায়ও ছিল না। কেননা বিক্ষোভের জোয়ার যে সাধারণের নিয়ন্ত্রণে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুশীলকুমার শিন্দ ধর্ষণবিরোধী আইনে পরিবর্তন আনতে রাজনৈতিক দলের মতামত চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন। গণধর্ষণের শিকার যোদ্ধা সাহসী মেয়েটার মৃত্যুর পর দিল্লি, মুম্বাইয়ের পাঁচ তারকা হোটেলগুলোতে বুকিংয়ের হার ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কমে গেছে। ইংরেজি নববর্ষ উদযাপনেও ছিল শোকের ছায়া। কোন আইনজীবী ধর্ষকদের পক্ষে দাঁড়াবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন। আর কি চাই? মানুষের জেগে ওঠা এই বিবেক প্রতিধ্বনিত হোক প্রতিনিয়ত। কি যেন নেই ১৬ ডিসেম্বর দিল্লিতে ঘটে যাওয়া পৈশাচিক নির্মমতার আগে পিছে বাংলাদেশেও ঘটেছে, ঘটছে পৈশাচিকতা, ধর্ষণ। কিছু জানা গেছে কিছু জানা যায়নি। কারও পাশে মানুষ দাঁড়িয়েছে। কেউবা নিরবে বুক ফাটা হাহাকার নিয়ে মরেই গেছে। জাতিসংঘের হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট প্রতিবেদন অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেই ধর্ষণের হার সবচেয়ে বেশি। যদিও সব ঘটনা নথিভুক্ত হয় না, তারপরও সরকারি তথ্য অনুযায়ী ২০০১ থেকে ২০১২ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে সর্বমোট এক লাখ ৭৪ হাজার ৬৯১ জন নারী ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়। অতি সমপ্রতি জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি প্রদত্ত তথ্যে জানা যায়, বিগত এক বছরে দেশে ৩১৭ জন নারী ও শিশু খুন হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকেই ধর্ষিত হয়েছিল। এছাড়া রাজনৈতিক নেতাদের হাতে ১০ জনসহ মোট ৩৯৮ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়। ৮৮ জন নারী ও কিশোরী যৌন হয়রানি ও ইভটিজিংয়ের শিকার হয় এবং নির্যাতনের মাধ্যমে প্ররোচিত হয়ে আত্মহত্যা করেছে ৪৭ জন। দিল্লিতে গণধর্ষণের পৈশাচিকতার বিরুদ্ধে যখন উত্তাল জনস্রোত ঠিক তখনই বাংলাদেশের টাঙ্গাইলে ১৪ বছরের আরেকটি মেয়ে ধর্ষণের শিকার হলো। ৬ ডিসেম্বর অন্য একটি মেয়ের সহায়তায় স্কুল ছাত্রী মেয়েটিকে একটি বাড়িতে আটকে গণধর্ষণ করা হয়। ১০ ডিসেম্বর অচেতন অবস্থায় স্থানীয় রসুলপুর রেললাইন থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। ২২ দিন পর অবস্থার অবনতি হলে তার চিকিত্সা শুরু হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ধর্ষণসহ সকল প্রকার নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সচেতন সুশীল সমাজ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, নাগরিক প্রতিনিধি, নারী নেত্রীরা তীব্র প্রতিবাদ জানায়। সবই আছে কিন্তু কি যেন নেই। সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নেই। প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধে তাদের চাওয়া পাওয়া নিশ্চুপ, নিথর। কিন্তু কেন? কেন এই শীতলতা? আস্থাহীনতা? নাকি বোধশূন্যতা? কিংবা বোধের শুষ্কতা? কারণ যাই হোক সাধারণ মানুষের বোধের জায়গায় নাড়া দিতেই হবে।