‘সামাজিক বৈষম্য কমাতে জন-অংশগ্রহণমূলক ও জনবান্ধব বাজেটের বিকল্প নেই’

সামাজিক বৈষম্য কমাতে জন-অংশগ্রহণমূলক জনবান্ধব বাজেট প্রণয়নের বিকল্প নেই এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা না গেলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা হুমকির মধ্যে পড়বে। রবিবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে 'শান্তি ও সমতার জন্য বাজেট' শীর্ষক দিনব্যাপী 'জন-বাজেট সংসদ ২০১৯ বিকল্প বাজেট অধিবেশন' এর প্রথম অধিবেশনে বক্তারা এসব কথা বলেন। 

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, 'খাত ধরে ধরে বাজেট প্রণয়নের বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হয়নি ফলে বাজেটের সঙ্গে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো যায়নি। জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে বাজেট কাঠামোরই আমূল পরবির্তন দরকার'। 

তিনি আরো বলেন, 'ধনী-গরিব বৈষম্য আগের চাইতে অনেক বেশি বেড়েছে, ফলে এই বিষয়টি মাথায় রেখেই আগামীর বাজেটটি প্রণয়ন করতে হবে। যদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা না যায় তাহলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা হুমকির মধ্যে পড়বে। অধিকাংশ সংসদ সদস্য ব্যবসায়ী হওয়ায় বাজেট জনবান্ধব না হয়ে অনেকক্ষেত্রে ব্যবসায়ী বান্ধবও হয়ে উঠছে। তবে নিজ নিজ জায়গা থেকে আন্দোলন গড়ে তুললে একটি গণতান্ত্রিক বাজেট আদায় করা সম্ভব'।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, 'সরকারের কাছে কোনো খাতই কম গুরুত্ব বা বেশি গুরুত্বের নয়। সরকার সবখাতকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে বাজেট প্রনয়ন করে। শুধু বাজেট নয়, বিদ্যমান যে শ্রম আইন আছে সেটি যদি প্রতিষ্ঠানগুলো মেনে চলে তাহলে দেশের উন্নয়ন করা সম্ভব'।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানের বলেন, 'রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে বাজেট সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করে তোলার পাশাপাশি তরুণদের অনেক বেশি বাজেট সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। তাদের মধ্য থেকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানসহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হলে সরকারও বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে সচেতন হবে। বিষয়টিকে আন্দোলনে রূপ দিতে হবে। এছাড়া বাজেট ঘোষণার পর ৭ দিন বাজেট অধিবেশন মুলতবি রেখে সেটি সংসদীয় কমিটির কাছে আলোচনার জন্য পাঠানোর সুপারিশ করেন তিনি। এতে করে সংসদীয় কমিটিগুলো বাজেট নিয়ে সংশ্লিষ্ট সেক্টরগুলোর মতামত নিতে পারবে'।

অনুষ্ঠানের সভাপ্রধানের বক্তব্যে জাতীয় পরিকল্পনা ও বাজেট সম্পর্কিত সংসদীয় ককাসের আহ্বায়ক ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, 'প্রান্তিক অঞ্চলের কথা মাথায় রেখেই বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। এর জন্য জেলা বাজেটের বিকল্প নেই। প্রবৃদ্ধি বাড়ার পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্যও বেড়েছে। শহরের সঙ্গে গ্রামের বৈষম্য কমাতে জেলা বাজেটের বিষয়টি এবারের বাজেট আলোচনায় উত্থাপন করা হবে'। 

এছাড়াও সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, 'ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক বাজেট প্রত্যাশা করা যায় না। তবে জনগণের সচেতনা বৃদ্ধি ও শক্তিশালি বাজেট আন্দোলন গড়ে তুললে গণমুখি বাজেট প্রণয়ন সম্ভব। তবে বাজেটের আকার বাড়লেও  প্রবাসী, আদিবাসী, কৃষক, শ্রমিক, প্রতিবন্ধিসহ সব ধরণের নাগরিকের জন্য কল্যানকর বাজেট এখনও প্রণয়ন হয় না। আমলা দ্বারা প্রণীত ও ব্যবসায়ী দ্বারা পরিচালিত বাজেট জনগণের কথা বাজেটে ফুটিয়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে'।

জাতীয় পরিকল্পনা ও বাজেট সম্পর্কিত সংসদীয় ককাসের আহ্বায়ক ফজলে হোসেন বাদশার সভাপতিত্বে জনবাজেট সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি মুজিবুল হক চুন্নু, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন। প্রথম অধিবেশনে আরও উপস্থিত ছিলেন, মাটি ও মানুষের পরিচালক রেজাউল করিম রানা ও বিএনকেএসর নির্বাহী পরিচালক হালা সিঙনু।

এরপর বিকেলে দ্বিতীয় অধিবেশনে বাজেটে জনঅংশগ্রহণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে আলোচনা করেন সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা, শিরিন আখতার, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জিব দ্রং, সেন্টার অন বাজেট অ্যান্ড পলিসি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কাজী মারুফ ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স। জাতীয় পরিকল্পনা ও বাজেট সম্পর্কিত সংসদীয় ককাস, সেন্টার অন বাজেট অ্যান্ড পলেসি ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়, অ্যাকশন এইড ও গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলনের সমন্বিত আয়োজনে এই অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে ঢাকাসহ সারাদেশের ৫০টি জেলা থেকে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মাট ৬০০ জন অংশ নেন। 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি