সহিংসতার শিকার নারী
প্রকাশ : ০৬ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৩৮
নারীর প্রতি সহিংসতা থেমে নেই। এতো প্রচার-প্রচারণা, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও ধর্ষণ-নির্যাতনের হাত থেকে তাদের রক্ষা করা যাচ্ছে না। গত ২৪ ঘন্টায় দেশের চার জেলা থেকে কমপক্ষে ৪ জন নারী ধষর্েণর শিকার হয়েছেন বলে খবর দিয়েছেন ইত্তেফাক প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা। এদের মধ্যে দু’জন শিশু, একজন সেবিকা এবং একজন কলেজ ছাত্রী। শিশুদের মধ্যে একজনকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
পিরোজপুর অফিস জানায়, জেলার নাজিরপুরে স্কুল থেকে নতুন বই নিয়ে বাড়ি ফেরার পর ধর্ষণের শিকার হয়েছে আঁখি (৮) নামের এক স্কুল ছাত্রী। এরপর তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। গতকাল রবিবার সকালে পুলিশ ওই শিশুর লাশ তার বাড়ির পাশের একটি বাগান থেকে উদ্ধার করেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় যুবক রব শেখকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
নাজিরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ-ওসি মো. খালেক হাওলাদার জানান, আঁখি উপজেলার গরঘাটার আব্দুল কাদের শেখের মেয়ে। সে চরখালী রেজিস্ট্রার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী ছিল। নিহতের ভাই মো. বাবুল শেখ জানান, গত বুধবার আঁখি স্কুল ছুটির পর বাড়িতে ফিরলে ওই দিন বিকালে পাশের বাড়ির রেজাউল শেখের বখাটে পুত্র রব শেখ (২৮) তাকে বাড়ি থেকে ডেকে পাশের বাগানে নিয়ে ধর্ষণ করে হত্যা করে। আঁখির মা ফজিলা বেগম জানান, মেয়েকে অনেক খোঁজাখুঁজির পরও পাওয়া না গেলে বিষয়টি থানায় জানানো হয়। এক পর্যায়ে গতকাল রবিবার সকাল ১১টার দিকে স্থানীয় এক কৃষক বাগানে তার লাশ দেখতে পান। খবর পেয়ে পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে। নিহতের গলায় ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ওসি জানান, আঁখিকে ধর্ষনের পর গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে রবকে স্থানীয় বাবুর হাট বাজার থেকে গ্রেফতার করা হয়। স্থানীয়রা জানান, রব শেখ নিয়মিত মাদক সেবন করে। এ ব্যাপারে গরঘাটা রেজি. প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইদুর রহমান জানান, মেধাবী ছাত্রী আঁখি নতুন বই নিয়ে যাওয়ার পর বুধবারই প্রথম ক্লাসে আসে। তার শিক্ষক ও সহপাঠীরা এ নির্মম হত্যার বিচার দাবি করেছেন।
রাজধানীর কল্যাণপুরের একটি নির্মাণাধীন ভবন থেকে মীরন ওরফে ইলন (৩০) নামে একজন মুদি দোকানদারের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এছাড়া রূপনগর এলাকায় হনুফা আক্তার রত্না (১৮) নামে এক তরুণী গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। পুলিশ তাদের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠিয়েছে।
পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্র জানায়, গতকার দুপুরে মিরপুর থানাধীন কল্যাণপুরের ১১ নম্বর সড়কের ৫৬/৩ নম্বর নির্মাণধীন আব্দুল হাইয়ের বাড়ির লিফটের গর্ত থেকে ইলনের লাশ উদ্ধার করে। দক্ষিণ পাইকপাড়ার বটতলাতে ইলনের একটি মুদি দোকান রয়েছে। বটতলাতেই তাদের বাসা। তার পিতার নাম আজাহার মোল্লা। বাড়ি শরীয়তপুরের জাজিরায়।
অন্যদিকে, গত শনিবার মধ্যরাতে রূপনগর থানাধীন দুয়ারীপাড়ার ৬ নম্বর সড়কের ৬ নম্বর বাসা থেকে রত্নার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, পারিবারিক কলহের জের ধরে সে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। তার বাবার নাম দেলোয়ার হাওলাদার। বাড়ি পটুয়াখালীর বদরপুরে।
মুন্সীগঞ্জে শিশু ধর্ষিত, গ্রেফতার ১
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, শনিবার রাত সাড়ে ৮টায় মুন্সীগঞ্জ সদরের বজ্রযোগনি ইউনিয়নের গুচ্ছগামের সাত বছরের এক শিশুকে স্থানীয় রাসেল গাজী (২০) ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাসেল পটুয়াখালীর মৃত ফয়েজুল গাজীর ছেলে। ধর্ষিতার মা জানান, ওই রাতে রাসেলের ঘরে টিভি দেখতে যায় তার মেয়ে। তখন খেলার ছলে রাসেল তাকে ধর্ষণ করে। অসুস্থ অবস্থায় গতকাল রবিবার দুপুরে মেয়েটিকে মুন্সীগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হাতিমারা ফাঁড়ি ইনর্চাজ এসআই আমিনুল ইসলাম জানান, অভিযোগের ভিত্তিতে রবিবার দুপুরে রাসেলকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সে এখন সদর থানা হেফাজতে আছে।
ক্লিনিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ
মহেশপুর (ঝিনাইদহ) সংবাদদাতা জানান, উপজেলা সদরে সালেহা ক্লিনিকের মালিক তরিকুল ও তার পার্টনার আজিমের বিরুদ্ধে ক্লিনিকের এক সেবিকাকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। গতকাল রবিবার ভিকটিম নিজেই থানায় হাজির হয়ে তাদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ করেন। ভিকটিম জানান, ওই ক্লিনিকে আসার পর থেকেই তরিকুল তাকে উত্ত্যক্ত করতেন। গত ২৫ ডিসেম্বর তরিকুল ও আজিম তাকে কৌশলে চেতনানাশক ট্যাবলেক খাইয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ করেন এবং নানা ধরনের ছবি তোলেন। তিনি এই ঘটনার বিচার দাবি করেছেন।
এদিকে এই তথ্য ফাঁস হওয়ার পর তরিকুল নিজে এবং লোকজন দিয়ে ভিকটিমকে হুমকি প্রদান করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে তরিকুল ও আজিম এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
মহেশপুর থানার অফিসার ইনচার্জ আনোয়ার হোসেন জানান, ভিকটিম বাদী হয়ে মহেশপুর থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। ইতিমধ্যে সহকারী পুলিশ সুপার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন বলে তিনি জানান।
ঝিনাইদহে লম্পট শিক্ষক জেল হাজতে
ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি জানান, ঝিনাইদহে ছাত্রীর শ্লীলতাহানির চেষ্টার অভিযোগে আটক স্কুল শিক্ষক আমিনুল ইসলামকে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। ঝিনাইদহ থানার ওসি ইকবাল বাহার চৌধুরী জানান, শনিবার শহরের শিশুকুঞ্জ স্কুল এন্ড কলেজের সহকারী শিক্ষক অমিনুল ইসলাম ৮ম শ্রেণীর এক ছাত্রীকে নতুন বই দেয়ার কথা বলে স্টোর রুমে নিয়ে যান। তিনি ছাত্রীর গায়ে হাত দেন ও তার শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন। ছাত্রীটি শিক্ষকের হাত থেকে নিজেকে কোনভাবে রক্ষা করে ঘটনাটি প্রধান শিক্ষকসহ অন্যদের জানায়। স্কুল কর্তৃপক্ষ পুলিশকে খবর দিলে ওই শিক্ষককে গ্রেফতার করা হয়। রাতে নির্যাতিত ছাত্রীর বাবা ঝিনাইদহ সদর থানায় মামলা করেছেন। গতকাল রবিবার আদালত ওই শিক্ষকের জামিনের আবেদন না-মঞ্জুর করে জেল হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
বাঘায় ধর্ষণের পর হত্যা চেষ্টার অভিযোগ
রাজশাহী অফিস জানায়, জেলার বাঘা উপজেলায় একাদশ শ্রেণীর এক ছাত্রীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের পর মুখে বিষ ঢেলে হত্যা চেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল রবিবার সকালে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিত্সাধীন ছাত্রীটি নিজে বাদী হয়ে তার পিতার মাধ্যমে বাঘা থানায় এ ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ওই ছাত্রীকে উপজেলার চন্দ্রগাতির আব্দুর আলিমের ছেলে বাঘা ইসলামী একাডেমী স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রথমবর্ষের ছাত্র শিমুল আহাম্মেদ রুমন (২২) বিয়ের প্রলোভন দিয়ে গত ৩১ ডিসেম্বর দুপুরে তার বন্ধুর বাড়িতে নিয়ে ধর্ষণ করে। পরে বিয়ের জন্য অনুরোধ করলে রুমন তার মুখে বিষ ঢেলে দিয়ে হত্যার চেষ্টা করে। রুমনের চাচাতো ভাই পিযূষ মেয়েটিকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। সে উপজেলার মোজাহার হোসেন মহিলা ডিগ্রি কলেজের ছাত্রী।
এ ব্যাপারে রুমনের মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় জানার পর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। বাঘা থানার ওসি হামিদুর রশিদ এ ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার সত্যতা স্বীকার করে জানান, তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সাভারে ছাত্রী ধর্ষণের মূল হোতা গ্রেফতার হয়নি
সাভার থেকে ইত্তেফাকে রিপোর্টার জানান, ব্যাংক কলোনী ছাপড়া মসজিদ সংলগ্ন এক বাসায় কলেজ ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনার মূল হোতা জাহিদ ওরফে রাজু (২২) এখনও গ্রেফতার হয়নি। এই মামলার অন্য ৫ জন সাভার থানায় ৪ দিনের রিমান্ডে রয়েছে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা ধর্ষণে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। ধর্ষিতার মা বাদি হয়ে সাভার থানায় ৯ জনকে আসামি করে মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় সাভার বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের অনার্স ২য় বর্ষের ছাত্র রাজুকে প্রধান আসামি করা হয়েছে।
এদিকে ধর্ষণের মামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে সাভার বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ কর্তৃপক্ষ জায়েদ ওরফে রাজু ও মুহিবুরকে বহিষ্কার করেছে।
গত ২৫ নভেম্বর ব্যাংক কলোনী ছাপড়া মসজিদ সংলগ্ন ৫ তলা বাসার নিচতলায় স্থানীয় এক কলেজ ছাত্রীকে ধর্ষণ করে তা ভিডিও করে দুর্বৃত্তরা। গত বৃহস্পতিবার ঘটনাটি জানাজানি হলে ধর্ষিতার মা সাভার থানায় মামলা করলে পুলিশ ৫ জনকে আটক করে।