খরগোশের খামার
ফজল-এ-খোদা লিটন, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৭ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:২২
‘প্রথমে আমি বিশ্বাস করিনি যে খরগোশের মাংস খাওয়া যায় এবং এটি রোগ প্রতিরোধক। খরগোশ পালন এবং বাজারজাতকরণ সম্পর্কেও আমার কোন ধারণা ছিল না। কিন্তু একটি অনুষ্ঠানে খরগোশের মাংস খেয়ে আমার সে ধারণা পুরোপুরি পাল্টে যায়। সেই থেকে আমি প্রায়ই বাড়িতে খরগোশ জবাই করি এবং সুস্বাদু ও পুষ্টিকর খাবার হিসেবে এর মাংস খাই।’ কথাগুলো বলছিলেন সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ উপজেলার বোয়লিয়া গ্রামের নায়েব আলীর স্ত্রী আকলিমা বেগম (৪০)। তিনি আরো বলেন, এক সময় মানুষ বাড়িতে খরগোশ পালন করতো শখের বশে। কিন্তু এখন এটাকে লাভজনক পেশা হিসেবে নিয়েছেন অনেকেই।
আকলিমা তাদেরই একজন; যারা এই জেলায় খরগোশ পালনের কাজকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন। নিজে স্বাবলম্বী হয়েছেন, সংসারের অভাব দূর করেছেন। আবার অনেকে অন্য পেশার পাশাপাশি বাড়তি আয়ের জন্য নিজের বাড়িতে খরগোশের খামার গড়ে তুলেছেন। আয়ের পাশাপাশি পরিবারের আমিষের চাহিদা মেটাচ্ছেন।
আকলিমা বলেন, ‘খরগোশ আমার ভাগ্যকে পরিবর্তন করেছে, আমাকে আশার আলো দেখিয়েছে। বর্তমানে আমি খরগোশ পালন ও বাজারজাত করে বেশ ভালো লাভ করছি। আমি ব্যবসাকে আরো প্রসারিত করতে চাই। কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থ না থাকায় তা করতে পারছি না।’ এ ব্যাপারে তিনি সরকারি সহায়তা কামনা করেছেন।
একই উপজেলার সোলাপাড়া গ্রামের নীপেন চন্দ্র প্রামাণিকের স্ত্রী দুর্গা রানী (৩৮) বলেন, খরগোশ পালনের ব্যবসা তার ভাগ্যের দ্বার উম্মুক্ত করেছে। তিনি স্বাবলম্বী হয়েছেন। বর্তমানে তার ছেলে কলেজে পড়ে। ইতিমধ্যেই তিনি খরগোশ পালনের আয় থেকে একটি আধাপাকা বাড়ি নির্মাণ করেছেন। তিনি সন্তানের লেখাপড়ার খরচ জোগাচ্ছেন এই ব্যবসা থেকেই। এছাড়া তিনি ভবিষ্যতের জন্য একটি ভাল সঞ্চয়ও গড়ে তুলছেন।
দুর্গা জানান, স্বামী বেকার থাকায় এক সময় সংসার নিয়ে চরম দুর্বিষহ জীবন-যাপন করেছেন। দুই বছর আগে, এক প্রতিবেশীর কাছে খরগোশ পালনের বিষয়টি জানতে পারেন। পরে ‘প্র্যাক্টিক্যাল একশন’ নামের একটি এনজিও’র আর্থিক সহযোগিতায় ‘মানব মুক্তি’ নামের অপর একটি এনজিও’র ‘ভিটুআর’ প্রকল্পের সদস্য হিসেবে নাম অন্তর্ভুক্ত করেন। সেই প্রকল্পের আওতায় সাতদিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে বাড়িতে মাত্র তিনটি খরগোশ দিয়ে একটি খামার স্থাপন করেন। বর্তমানে তার খামারে অনেক খরগোশ রয়েছে। এরপর তাকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি।
শুধু আকলিমা ও দুর্গা রানী নয়, উপজেলার বোয়ালিয়া ও সোলাপাড়া গ্রামের আরো অনেকেই এখন খরগোশ পালন করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। খুঁজে পেয়েছেন জীবিকার নতুন পথ।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রেতারা খরগোশ পালনকারীদের বাড়িতে ভিড় করছেন। তারা প্রতিটি খরগোশ ২৫০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা এবং প্রতি জোড়া ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় কিনছেন। খরগোশ পালনকারীরা এ প্রতিবেদককে জানান, খরগোশ বিক্রির জন্য তাদেরকে খুব কমই বাজারে যেতে হয়। বরং ক্রেতারাই তাদের বাড়িতে এসে এসব কিনে নিয়ে যান। তবে মাঝে মাঝে তারাও স্থানীয় হাট-বাজারে খরগোশ বিক্রি করে থাকেন। তারা আরও জানান, খরগোশ পালনকারী মহিলারা বাড়িতে স্বল্প পরিসরে খাঁচা-পদ্ধতিতে খরগোশ পালন করেন। সংসারের অন্যান্য কাজের পাশাপাশি খরগোশের দেখা শোনার কাজ করেন। এতে বাড়তি খরচ বা সময় নষ্ট হয় না।
এ প্রসঙ্গে ‘প্র্যাক্টিক্যাল একশন’ বাংলাদেশ-এর সিরাজগঞ্জ অফিসের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মো. আশরাফউদ্দিন বলেন, বহু মানুষ এখন খরগোশ পালন ও সেবনে আগ্রহ প্রকাশ করছে। কারণ এটি খুব সহজে, স্বল্প খরচে ও স্বল্প পরিসরে করা যায়। এছাড়া প্রতিটি খরগোশ মাত্র দু’মাসের মধ্যেই খাওয়ার উপযোগী হয়ে ওঠে। ফলে যে কেউ চাইলেই সংসারের অন্যান্য কাজের ফাঁকে খরগোশ পালন করে স্বাবলম্বী হতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ থাকলে ভালো হয়। তিনি বলেন, তারা আগ্রহীদেরকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তুলছেন এবং দারিদ্র্য মোকাবেলা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছেন।
সিরাজগঞ্জ জেলা প্রাণী ও পশুসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা ডা. শফিকুল ইসলাম বলেন, খরগোশের মাংস সুস্বাদু, রোগ প্রতিরোধক এবং পুষ্টিমান সম্পন্ন। তাই এখন অনেকেই খরগোশ পালনকে পেশা হিসেবে নিচ্ছেন এবং স্বাবলম্বী হচ্ছেন।