এডিপির টাকা নিয়ে এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যান দ্বন্দ্ব
প্রকাশ : ০৭ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:২৫
অর্থ বছরের ছয় মাস পার হলেও জেলা পরিষদের অধীন বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) টাকায় উন্নয়ন কাজ শুরুই করা যায়নি। এ টাকার ভাগাভাগি নিয়ে দেশের বেশিরভাগ জেলায় এমপি ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের মধ্যে দ্বন্দ্ব এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। এমপিরা চাচ্ছেন বরাদ্দের পুরো টাকাই তাদের দেয়া প্রকল্পে ব্যয় করতে আর উপজেলা চেয়ারম্যানরা চাচ্ছেন এমপিদের অনুকূলে একটি অংশ রেখে বাকিটা তাদের পছন্দের প্রকল্পে ব্যয় করতে। এ নিয়ে টানাপড়েনের কারণে অনেক জেলা পরিষদে প্রকল্প গ্রহণ সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অনেক জেলার এডিপি বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। চলতি অর্থ বছরের অর্ধেক পেরিয়ে গেলেও এসব জেলার এডিপি প্রকল্প গ্রহণ কিংবা অনুমোদন হয়নি। এক্ষেত্রে জেলা পরিষদের প্রশাসকরা অনেকটা অসহায়। কারণ তাদের কোনো আইনি ক্ষমতা নেই। বাস্তবে জেলা পরিষদের কার্যক্রমে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। অনেক জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নির্দেশনা চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন। কিন্তু মন্ত্রণালয় আইন অনুযায়ী কাজ করার পরামর্শ ছাড়া কিছুই বলতে পারছে না।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে এবার ৬১ জেলা পরিষদের অনুকূলে অর্থ ছাড় করা হয়। অক্টোবর মাসের মধ্যে সকল জেলা পরিষদ থেকে পাঠানো প্রকল্প অনুমোদন দেয়ার কাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যান (জেলা পরিষদের সদস্য) এবং ক্ষেত্রবিশেষ প্রশাসকদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে প্রকল্প গ্রহণে বিলম্ব হয়েছে। এ পর্যন্ত ২৬ জেলার প্রকল্প অনুমোদন দেয়া সম্ভব হয়েছে। ১৪টি জেলা থেকে কোনো প্রকল্পই আসেনি এবং তিনটি জেলার প্রকল্প এমপির পরামর্শ গ্রহণ করা নিয়ে সংশয় থাকায় তা ফেরত পাঠানো হয়েছে। বাকি জেলা পরিষদ থেকে প্রকল্প পাঠানো হয়েছে—যা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
যেসব জেলা পরিষদের প্রকল্প ফেরত দেয়া হয়েছে তা হচ্ছে কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী ও কুড়িগ্রাম। এছাড়া যে ১৪ জেলা এখনো পর্যন্ত প্রকল্প নিতে পারেনি। এগুলোর মধ্যে আছে যশোর, সিরাজগঞ্জ, চট্টগ্রাম, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, চুয়াডাঙ্গা, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর প্রভৃতি। স্থানীয় সরকার (জেলা পরিষদ) আইন অনুযায়ী পরিষদের সভায় প্রকল্প বাছাই ও অনুমোদন হওয়ার কথা। প্রশাসক নিয়োগের পর পূর্ণাঙ্গ জেলা পরিষদ গঠন করা হয়েছে। এখন জেলার অধিক্ষেত্রের সকল উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জেলা পরিষদের সদস্য। এর আগে এমপিদের পরামর্শে নেয়া প্রকল্প জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্থানীয় সরকার বিভাগের অনুমোদন নিয়ে সরাসরি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু করতেন । কিন্তু প্রশাসক নিয়োগের পর থেকে জেলা পরিষদ সভায় প্রকল্প গ্রহণ করে তা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেয়া হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে এমপির পরামর্শের কিছু প্রকল্পও বিবেচনায় নেয়া হতো।
জানা যায়, এবার উপজেলা পরিষদের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অধীনে ৩৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তাই সরকার চাইছে নির্বাচনী বছরে জেলা পরিষদের নামে বরাদ্দ দেয়া এডিপির টাকা এমপিদের পরামর্শেই নেয়া হোক।
সূত্র জানায়, সরকারের এ রকম নীতির আলোকে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে মৌখিকভাবে জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে বলা হয়েছে যে, এমপিরা যেসব প্রকল্প দেবেন তাই জেলা পরিষদের সভায় অনুমোদন করে কেন্দ্রে পাঠাতে হবে। যদি পরিষদের সভায় উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানরা এমপির প্রকল্প কাটছাঁট করতে চান-তবে এমপির দেয়া প্রকল্প পরিষদের সভায় উত্থাপন না করে সরাসরি মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে। মন্ত্রণালয় তা অনুমোদন করে দেবে এবং বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু হবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, অনেক ক্ষেত্রে এমন সমস্যার কথা তারা জেনেছেন। কিছু জেলা থেকে এমপির তালিকা মন্ত্রণালয়ে এসেছে। মন্ত্রণালয় তা অনুমোদনও করে দিয়েছে। তিনি বলেন, উপজেলা পরিষদের জন্য এবার পৃথক বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। জেলা পরিষদের বরাদ্দ ৩৫০ কোটি টাকা। তিনি বলেন, সমস্যাটি রাজনৈতিক। রাজনৈতিকভাবে এর প্রতিকারের পথ সরকারকে খুঁজে বের করতে হবে।
জানতে চাইলে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এসোসিয়েশনের সভাপতি হারুন অর রশিদ হাওলাদার ইত্তেফাককে বলেন, জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগের পর জেলা পরিষদ এখন পূর্ণাঙ্গ। এখন আইন অনুযায়ী পরিষদের সভায়ই সব সিদ্ধান্ত অনুমোদন হওয়া উচিত। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের মৌখিক নির্দেশে এখন নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এটি কাম্য নয়। বেশিরভাগ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান যেহেতু আওয়ামী লীগের, তাই নির্বাচনী বছরে এসে উভয়ের মধ্যে এমন দ্বন্দ্ব তৈরি করা হলে তা নির্বাচনী ফলাফলের ওপরই প্রভাব পড়বে। এমপির কথা মতোই যদি জেলা পরিষদ চালাতে হয় তাহলে প্রশাসক কী ঠুঁটো জগন্নাথ?
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, অনেক জায়গায় প্রশাসকের অনুকূলে চার-পাঁচ লাখ টাকা রেখে বাকি টাকা এমপিদের পছন্দের প্রকল্পে বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও ২০ শতাংশ উপজেলা চেয়ারম্যান পছন্দের প্রকল্পের জন্য রেখে বাকি টাকা এমপিদের পছন্দের প্রকল্পে দেয়া হচ্ছে। আবার কোথাও পুরো টাকাই এমপিদের পছন্দের প্রকল্পে নিয়ে নেয়া হচ্ছে। যদিও এমপিরা জেলা পরিষদের শুধুমাত্র উপদেষ্টা। পরিষদের কাজে তাদের পরামর্শ দেয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু সে অধিকার এখন সম্পূর্ণ কর্তৃত্বে পরিণত হয়েছে বলে একাধিক উপজেলা চেয়ারম্যান অভিযোগ করেছেন।
একাধিক জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেছেন, শেষ মুহূর্তে প্রকল্প অনুমোদন করে কাজ শুরু ও শেষ করতে যে সময় পাওয়া যাবে তা যথেষ্ট হবে না। দেখা যাবে তড়িঘড়ি কাজ শেষ করার জন্য কাজের মান ভাল হয়নি। আবার অর্থের অপচয়ও হবে। অনেকক্ষেত্রে কোন রকমে কাজ করে টাকা উঠিয়ে নেয়ার ঘটনাও থাকবে।
প্রসঙ্গত জেলা পরিষদের এডিপি দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো ও সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন কাজ হয়ে থাকে। যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা না করে সংশ্লিষ্ট এমপি বা উপজেলা চেয়ারম্যান স্বীয় রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্প গ্রহণ করে থাকেন।