সরকারের ঋণ :যত চাপ বাণিজ্যিক ব্যাংকের ওপর

চলতি অর্থবছরের (২০১২-১৩) প্রথম ছয় মাসে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকার ১০ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এ সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ গ্রহণ করলেও কেন্দ ীয় ব্যাংককে দুই হাজার ৭০৩ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে সরকার। অর্থাত্ বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কেন্দ ীয় ব্যাংকের দেনা পরিশোধ করা হচ্ছে। আর বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকারের অব্যাহত ঋণ নেয়ার কারণে ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে। এতে ব্যাংক ঋণের সুদের হার না কমায় ব্যবসা-বাণিজ্যে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত জুলাই থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নিট সাত হাজার ৯২৬ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছে। যদিও আগের বছরের প্রথম ছয় মাসে এ পরিমাণ ছিল ১৫ হাজার ৬৩০ কোটি ২৮ লাখ টাকা। কেন্দ ীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ ৯৯ হাজার ৭৫৩ কোটি ৪৬ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ ঋণের মধ্যে কেন্দ ীয় ব্যাংকের কাছে ৩৫ হাজার ৩০২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা এবং তফসিলী ব্যাংকগুলোর কাছে ৬৪ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা। প্রসঙ্গত, কেন্দ ীয় ব্যাংকের কাছ থেকে এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে সরকার ঋণ গ্রহণ করে থাকে। আগে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে পিডি (প্রাইমারি ডিলার) ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে শুধু সরকার ঋণ নিতে পারত। সম্প্রতি ২৫টি নন-পিডি ব্যাংকও এ তালিকায় সংযুক্ত করা হয়েছে। ফলে কেন্দ ীয় ব্যাংকের ওপর চাপ খানিকটা কমেছে। সরকারের চাহিদা মাফিক ঋণের ৬০ শতাংশ পিডি ব্যাংক পূরণ করার পর বাকি ৪০ শতাংশ নন-পিডি ব্যাংকগুলোকে দিতে হয়। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর সরকারের ঋণের অধিকাংশ চাপানোর এ সুযোগটা কাজে লাগাচ্ছে কেন্দ ীয় ব্যাংক। ব্যাংকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কেন্দ ীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ বাড়লে মূল্যস্ফীতিও বাড়ে। কারণ কেন্দ ীয় ব্যাংক নতুন নোট ছাপিয়ে সরকারকে ধার দেয়। অন্যদিকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা ঋণ পায় না। এতে বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার ২৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার প্রস্তাব করেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চলতি বছর যে ধারায় চলছে তাতে মনে হচ্ছে বাজেটে নির্ধারিত টাকার অংক ছাড়িয়ে যাবে। তবে আগামী অর্থবছরে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় ওই বছরের সরকারের ব্যাংক ঋণ অনেক বাড়বে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা। এ বিষয়ে একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, সরকারের ব্যাংক ঋণের কারণে ঋণের সুদহার কমছে না। আর ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেশি হওয়ায় শিল্পোদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিলেও এতে উত্পাদন খরচ অনেক বেড়ে যায়। তবে ব্যাংকগুলোতে যথেষ্ট পরিমাণে তারল্য রয়েছে বলে জানান তিনি। হাতেগোনা দু’-একটি ব্যাংকের তারল্য সঙ্কট রয়েছে স্বীকার করে তিনি বলেন, এটা তাদের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যাবে। এর ফলে দেশের ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা ব্যাংক থেকে ঋণ পাবে না। এতে বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণায় ব্যাংক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার কথা বললেও ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেয়ায় ব্যাংকিং খাতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।