সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স

সরকারি চাকরি পাইতে আবেদন করিবার বয়সসীমা বাড়াইবার দাবিতে সাধারণ ছাত্র পরিষদের ব্যানারে আন্দোলনে নামিয়াছে শিক্ষার্থীরা। গত শনিবার এই দাবিতে তাহারা রাজপথ অবরোধ করিয়াছে। প্রায় তিন ঘন্টা তাহারা সড়ক অবরোধ করিয়া রাখেন। এই কর্মসূচিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও নগরীর অন্যান্য কলেজ-ভার্সিটির শিক্ষার্থীরা অংশ গ্রহণ করেন। আন্দোলনকারীদের দাবি সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়স ৩০ হইতে বাড়াইয়া ৩৫ করিতে হইবে। ১৩ জানুয়ারির মধ্যে তাহাদের দাবি মানিয়া নেওয়া না হইলে আন্দোলনের বৃহত্তর কর্মসূচি দেওয়া হইবে বলিয়াও ঘোষণা দেওয়া হয়। অর্থাত্ ৩৪ তম বিসিএস পরীক্ষার জন্য দরখাস্ত করিবার তারিখ উত্তীর্ণ হইবার আগেই তাহারা এই ব্যাপারে সরকারের সিদ্ধান্ত চাহিতেছেন। পক্ষান্তরে কিছুদিন আগে জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী জানাইয়াছিলেন যে, সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়স সীমা বৃদ্ধি করিবার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নাই। বিদ্যমান বাস্তবতায় বিষয়টি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের এই দাবির যৌক্তিকতাও অস্বীকার করা যায় না। দেশে চাকরিপ্রার্থী বেকারের মিছিল দীর্ঘ হইতে দীর্ঘতর হইতেছে। প্রতি বত্সর শত-সহস্র যুবক উচ্চতর ডিগ্রি লইয়া বাহির হইতেছেন, নাম লেখাইয়া চলিয়াছেন কর্মপ্রার্থীর তালিকায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী তরুণদের বেশির ভাগেরই আশা সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়া। বর্তমানে দেশে বেসরকারি খাতেও অনেক আকর্ষণীয় সুযোগ সৃষ্টি হইয়াছে সত্য। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি মিলাইয়া নূতন চাকরির যত সুযোগ সৃষ্টি হয় , তাহার তুলনায় প্রার্থীর সংখ্যা যে বহুগুণে বেশি সে বলাই বাহুল্য। সরকারি চাকরির বয়সসীমা ৩০ হওয়ায় বাস্তব কারণেই সমস্যাটি প্রকট হইয়াছে। শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বেকারত্ব অনেকের দীর্ঘস্থায়ী হইতেছে। লেখাপড়ার সাথে সামঞ্জস্য নাই— এমন কর্মে বাধ্য হইয়াই অনেকে যোগ দেন এবং নৈরাশ্যপূর্ণ জীবন যাপন করেন। সরকারি চাকরির বয়স চলিয়া গেলে অর্থাত্ তিরিশোর্ধ্ব যে কোন তরুণ ভাবিতে শুরু করেন যে তিনি বৃদ্ধ হইয়া গিয়াছেন, তাহার জীবনের আর কোনো আশা নাই। ইহাতে তাহাদের মনের ওপর যে চাপ পড়ে, তাহাতে উদ্যম ও কর্মস্পৃহা হারাইয়া ফেলা বিচিত্র নহে। বয়স হইয়া যাওয়া চাকরি না পাওয়াদের ‘দূর দূর’ করিবার মত লোকেরও অভাব এই দেশে নাই। যাহার সরকারি চাকরির বয়স গিয়াছে বেসরকারি খাতেও তাহার কদর নাই। অথচ আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে যে রূপ বিশৃংখলা তাহাতে ২৭-২৮ বত্সর চলিয়া যায় লেখাপড়া শেষ করিতেই। চার বত্সরের কোর্স শেষ করিতে সাত বত্সর লাগিয়া যায় এমন দৃষ্টান্তও রহিয়াছে এন্তার। সর্বাধিক সংখ্যক তরুণ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষার্থে অধ্যয়ন করেন। সেখানে সেশনজট কত প্রকার এবং কত দীর্ঘ তাহা কমবেশি সকলেই জানেন। ্এমতাবস্থায় পাস করিয়া বাহির হইবার পর দম লইতে না লইতেই তাহারা দেখিতে পান যে সরকার নির্ধারিত যৌবনসূর্য অস্তাচলগামী এবং দেখিতে দেখিতে তাহাদের দিবাবসান ঘটিয়া যায়। তাহার পর থাকে শুধু বয়স পেরুনো নিরাশার বালুচর। অথচ বাস্তবে তিরিশ হইতে চল্লিশই হইল যৌবনের মুখ্য সময়। ইসলামের শিক্ষা, চল্লিশের আগে ব্যক্তিত্ব পূর্ণতা লাভ করে না। অন্যদিকে আমাদের বয়সের হিসাব ও বিবেচনার মধ্যেও রহিয়াছে গরমিল এবং স্ববিরোধিতা। আঠার বত্সর না হওয়া পর্যন্ত আমরা প্রাপ্তবয়স্ক ধরি না। তাহার পরে মাত্র ১২ বসন্তে যৌবন শেষ। অতঃপর প্রৌঢ়কাল তিরিশ হইতে ঊনষাট, কাহারো ষাট, কাহারো পঁয়ষট্টি। সরকারি চাকরির অবসরের বয়স করা হইয়াছে ঊনষাট। মুক্তিযোদ্ধাদের বেলায় ষাট। কোনো কোনো চাকরিতে রিটায়ারমেন্টের বয়স করা হইয়াছে ৬৫ বত্সর। আর চুক্তিভিত্তিক চাকরিতে নিয়োগের বেলায় তো বয়সের কোনো বালাই-ই নাই। বিপত্তি যত চাকরিতে প্রবেশের বেলায়। আমরা বিষয়টির প্রতি সরকারের সহূদয় মনোযোগ আকর্ষণ করি।