অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার :একটি অভিমত

নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিয়ে সরকার ও প্রধান বিরোধী দল বিপরীতমুখী একটি সংঘাতময় অবস্থানে আছে। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অভিজ্ঞতায় সরকারি দলের অবস্থান নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিপক্ষে। অন্যদিকে অনির্বাচিত ব্যক্তি দ্বারা সরকার পরিচালনা সংবিধান পরিপন্থি বিধায় সুপ্রিমকোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে অবৈধ, অসংবিধানিক বলে রায় দিয়েছেন। দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে আস্থা রাখতে পারছে না বিরোধী দল। সরকারের যুক্তি— অনির্বাচিত প্রতিনিধি দ্বারা সরকার পরিচালনা সংবিধান পরিপন্থি এবং বিরোধী দলের যুক্তি— বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার নির্বাচনে জয়লাভের জন্য ক্ষমতায় থেকে প্রভাব বিস্তার করার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করেছেন। উভয় পক্ষই নিজ নিজ অবস্থানের পক্ষে অনড়। সরকার ও বিরোধী দলের এই সংঘাতময় পালটাপালটি অবস্থান হরতাল ধর্মঘট আন্দোলন সংগ্রামে দেশের স্থিতিশীলতা বিঘ্ন, বিনিয়োগ বিনষ্ট, উন্নয়ন ব্যাহত এবং জনগণ সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। বিশ্বজিতের মতো টগবগে তরুণদের অকাতরে জীবন দিতে হচ্ছে। রাস্তায় গাড়ি পোড়ানো যেন উত্সবে পরিণত হয়েছে। হরতাল নামক গণতান্ত্রিক কর্মসূচি যেন যমতালে পরিণত হয়েছে। হরতালের আগের দিন ভয়ে ভীত নগরীর জনগণ, রাস্তায় গাড়ি পোড়ানো, প্রচণ্ড যানজট। হরতালের দিন সীমাহীন জনদুর্ভোগ, অফিস আদালত, স্কুল কলেজ যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান শিল্প কারখানায় ক্ষতি, কাঁচাবাজারে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি— এ যেন এক চরম নৈরাজ্য। হরতালের পরের দিন ঠিক আগের দিনের মতো রাস্তায় যানজট। স্বাধীনতার ৪১ বছরে জাতি আমাদের সরকার এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলের কাছে কোনো মতেই এটা আশা করে না। জাতি আশা করে দুই নেত্রী নির্বাচনকালীন সরকার, জাতীয় ঐক্য ও অগ্রগতি প্রশ্নে একমত হয়ে দেশের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির জন্য কাজ করুক। জনগণ শান্তি চায়, জনগণ স্বস্তি চায়, জনগণ চায় তাদের জীবনের নিরাপত্তা। ৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পর এই দুটি দলই পালাক্রমে ক্ষমতাসীন হয়েছে। জাতির এই দিনে তারা কি তাদের আত্মপক্ষ অবস্থানে অনড় থাকবে না দেশ ও জনগণের সার্বিক স্বার্থে কিছুটা হলেও ছাড় দিয়ে সমঝোতায় পৌঁছবে? জনগণ হরতাল নামক নৈরাজ্যের বিপক্ষে, জনগণ নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা প্রশ্নে দুই নেত্রীর ঐক্যমতের পক্ষে, জনগণ শান্তি সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির পক্ষে। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনার জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশন স্বাধীন না থাকলে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব হয় না। নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য, অবাধ, নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছ করার জন্য অবশ্য অবশ্যই নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণরূপে স্বাধীন করতে হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন নির্বাচনকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় যেমন জন প্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় নির্বাচন কমিশনের অধীনে রাখতে হবে। স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের জন্য অবশ্যই নির্বাচন কমিশনকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনতামুক্ত করতে হবে। জাতীয় সংসদে আইন করে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, জনবল কাঠামো তৈরি, কমিশনের কর্মপদ্ধতি, জবাবদিহিতা, অর্থের সংস্থান, নির্বাচন অনুষ্ঠানের সকল বিধি-বিধান তৈরি করে নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করতে হবে। জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সরকারি দল থেকে ১৫ জন সংসদ সদস্য এবং প্রধান বিরোধী দলসহ জাতীয় সংসদে নির্বাচিত সকল দলের মধ্য থেকে ১৫ জন সংসদ সদস্য সর্বমোট ৩০ সদস্য নিয়ে নির্বাচনকালীন সময়ের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা যায়। অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারে বর্তমান মন্ত্রিসভার সদস্যগণ অন্তর্ভুক্ত থাকবেন না। জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী বিরোধী সকল দলের ন্যূনতম একজন করে সদস্য এ অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারে থাকবেন এবং প্রধান বিরোধীদলসহ যে সব দলের সদস্য বেশি তাদের আসন সংখ্যানুপাতে সদস্য মনোনয়ন করতে হবে— যেমন ক) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-৫জন, খ) জাতীয় পার্টি (জাপা)-৪জন, গ) বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-১ জন, ঘ) বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলাম-১জন, ঙ) বাংলাদেশের ওয়ার্কাস পার্টি-১ জন, চ) বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)-১জন ছ) লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)-১ জন। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ অর্থাত্ সরকারি দল থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হবেন, প্রধান বিরোধী দল থেকে হতে পারে উপপ্রধানমন্ত্রী, অন্যান্য দলের সদস্যগণের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় বণ্টন করা যেতে পারে। এই সরকারের ভূমিকা হবে শুধুমাত্র অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা, কোনো নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা বাতিল না করা বা নির্বাচনে প্রভাব পড়ে, নির্বাচন কমিশনের ওপর প্রভাব পড়ে এমন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করা। অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারে থেকে যাঁরা জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন তাঁরা তাঁদের নির্বাচনী এলাকায় মন্ত্রীর কোনো প্রটোকল ব্যবহার করতে পারবেন না, নির্বাচনী এলাকায় একজন প্রার্থী যে প্রটোকল পান তাই ভোগ করতে পারবেন। প্রশাসন প্রভাবিত হয় এমন কোনো কাজ করতে পারবেন না, প্রতিদ্বন্দ্বী অপর প্রার্থীগণের মতো সমান সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করবেন। এরূপ অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হলে একদিকে সরকারি দলের বক্তব্য অনুযায়ী নির্বাচনকালীন সময়ে যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হবে, সেটি জনগণ দ্বারা নির্বাচিত সরকারই হবে। অন্যদিকে বিরোধী দলের যে বক্তব্য— দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে ক্ষমতাসীন দল প্রভাব বিস্তার করে জয়লাভের চেষ্টা করবে, সকল দলের অংশগ্রহণের মাধমে সরকার গঠিত হলে তা সম্ভব হবে না এবং সরকারের সকল কর্মকাণ্ড সকলের কাজে স্পষ্ট থাকবে। সরকার ও বিরোধীদলসহ সকল রাজনৈতিক দলই জনগণের শান্তি চায়, জনগণের সেবা করতে চায়, দেশের উন্নয়ন করতে চায়, জনগণের ঐক্য চায়। তবে কেন হরতালের নামে জ্বালাও পোড়াও, ধ্বংসাত্মক কাজকর্ম, নৈরাজ্য আর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়? জনগণ হরতাল চায় না, জনগণ তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে রাজপথে সরকারবিরোধী এ যুদ্ধ দেখতে চায় না। ষোল কোটি জনগণের কথা বিবেচনা করে সংবিধানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে জাতীয় স্বার্থে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে প্রস্তাবিত অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে দেশের চলমান নৈরাজ্য এবং ভবিষ্যত্ অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি থেকে দেশকে রক্ষার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের মাননীয় নেত্রীসহ অন্য সকল রাজনৈতিক দলের এগিয়ে আসা উচিত। ঢাকা