বেড়ায় খাচ্ছে ক্ষেত!

চোরাচালান ঠেকানর জন্যই নিরাপত্তা কর্মী; কিন্তু সেই নিরাপত্তা কর্মীরাই সরাসরি সহায়তা করছেন পণ্য পাচারে। সাম্প্রতিক সময় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে স্বর্ণ ও মুদ্রাসহ অন্যান্য অবৈধ পণ্য পাচারের অভিযোগে গ্রেফতার হন সিভিল এভিয়েশনের সুপারভাইজার নিজাম উদ্দিন, নিরাপত্তাকর্মী আবুল কালাম, কর্মী আব্দুল লতিফ, কবির আহমেদসহ ১১ জন। এদের মধ্যে কয়েকজন নিজেদের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও দিয়েছেন। সব মিলিয়ে বাস্তবতা এমনটাই যে, ক্ষেত পাহারার জন্য বেড়া দেয়া; কিন্তু সেই বেড়াই এখন খেয়ে ফেলছে ক্ষেত। এ বক্তব্য খোদ বিমান বন্দরেরই একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার। তিনি বলেছেন, এরা এতই শক্তিশালী যে, এদের রিরুদ্ধে কোনো কর্মকর্তা ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিলে তাকেই শেষ পর্যন্ত বিদায় নিতে হয়। এ চক্রের শেকড় অনেক দূর। সিভিল এভিয়েশনের পরিচালক (প্রশাসন) ক্যাপ্টেন একরামউল্লাহ ক্ষোভের সঙ্গে বলেছেন, নিরাপত্তা বিভাগের কতিপয় কর্মচারীর অপকর্ম বেড়ায় ক্ষেত খেয়ে ফেলার মতোই। তিনি বলেন, যারা ইতিমধ্যে ধরা পড়েছে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবসা গ্রহণ করা হয়েছে। এটা কর্তৃপক্ষের জন্যও চরম বিব্রতকর। গতকাল তিনি বিমানবন্দর টার্মিনাল ভবন পরির্দশন করে কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। সর্তক করে দিয়েছেন নিরাপত্তা শিফটে দায়িত্ব পালনকারী নিরাপত্তা সুপারভাইজার ও নিরাপত্তা কর্মীদের। যাতে আগামীতে কেউ যদি ধরা পড়ে তার দায়দায়িত্ব নিরাপত্তা সুপারভাইজারদের বহন করতে হবে। বিমান বন্দরের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা আবুল কাশেমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বলেন, কিছুদিন আগে তিনি যোগদান করেছেন। এখনো তিনি নিরাপত্তা বিভাগের সবকিছু তদারকি করে উঠতে পারেননি। তবে তিনি বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এদিকে গত সোমবার ৭ কেজি স্বর্ণের বারসহ গ্রেফতারকৃত সিভিল এভিয়েশনের নিরাপত্তা কর্মী কবির আহমেদসহ তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গতকাল মঙ্গলবার ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি (উত্তর) মোল্লা নজরুল ইসলাম বলেন, এর আগে সাড়ে ১৩ কেজি স্বর্ণ আটকের ঘটনায়ও বেশ কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মী গ্রেফতার হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা বেশ কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মীর নাম প্রকাশ করেছেন। তবে ঘটনার পর তারা আত্মগোপনে রয়েছে। তিনি বলেন, বেশ কিছুদিন ধরে নিরপত্তাকর্মী কবির আহমেদকে নজরে রাখা হচ্ছিল। তারই ধারাবাহিকতায় ৭ কেজি স্বর্ণ পাচারের সময় নিরাপত্তা কর্মী কবির আহমেদসহ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদেরকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। মামলার তদন্ত সূত্র জানায়, পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে কবির আহমেদ জানান, তিনি সিভিল এভিয়েশনের দৈনিক (মাস্টার রোল) ভিত্তিক নিরাপত্তা কর্মী। চাকরির পাশাপাশি তিনি নিয়মিতভাবে চোরাকারবারিদের সহযোগিতা করতেন। সোনার বারগুলো পাচারে সহযোগিতা করার জন্য মোর্শেদ তাকে ৩০ হাজার টাকা দিতে চেয়েছিলেন। তাছাড়া স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে সিভিল এভিয়েশন কর্মী গাউসুল আজম জড়িত ছিলেন। তার বাড়ি যশোরে। গাউসুল আজম নিরাপত্তা বিভাগের স্থায়ী কর্মী। তিনি নিজেকে চোরাচালানিদের কাছে নিরাপত্তা সুপারভাইজার পরিচয় দিত। কারণ নিরাপত্তা বিভাগে কাজী গাউছুর রহমান নামে এক সুপারভাইজার রয়েছেন। ডিবি কর্মকর্তারা জানান, ঘটনার সময় ৪ নম্বর বোডিং ব্রিজে তার উিউটি ছিল। স্বর্ণ আটক হবার পর পরই তিনি আত্মগোপন করেন। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। এপিবিএনের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার বলেন, স্বর্ণ বার বহনকারী যাত্রী আবদুস সাত্তার বিমান বন্দরে পৌঁছেন সকাল ১০টায়। তিনি বোডিং ব্রিজের ৪ নম্বর গেটে টয়লেটে গিয়ে ৭ কেজি ওজনের সোনার বারের চারটি প্যাকেট হস্তান্তর করে সিভিল এভিয়েশন নিরাপত্তা কর্মী কবির আহমেদের কাছে। পরে তিনি মোবাইল ফোনে স্বর্ণের মালিক মোর্শেদ আলমকে জানিয়ে নিরাপদে বিমান বন্দর ত্যাগ করেন। এরপর নিরাপত্তা কর্মী কবির শরীরের মধ্যে লুকিয়ে বিমান বন্দর বহুতল কারপার্কিংয়ের ছাদে গিয়ে মোর্শেদের হাতে তুলে দেন। এসব এপিবিএন ও ডিবি পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করে কবির মোর্শেদ ও তার গাড়ি চালক হেলাল মিয়াকে। কবিরের সঙ্গে গ্রেফতার হওয়া মোর্শেদও (স্বর্ণের মালিক) পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে একই তথ্য জানিয়েছেন। মোর্শেদ আরো জানিয়েছেন, সিভিল এভিয়েশনের নিরাপত্তা কর্মীদের সহায়তায় গত তিন বছর তিনি স্বর্ণালংকারসহ ইলেক্ট্রনিক সামগ্রী বিদেশ থেকে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে দেশে আনেন। এর আগে আরো ছয় বার একই কায়দায় সোনার বার চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে আনেন। ৭ কেজি সোনার বার আটকের ঘটনায় মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর জাহাঙ্গীর আলম বাদী হয়ে বিমান বন্দর থানায় মামলা করেছেন। মামলায় ৬ আসামির মধ্যে গ্রেফতারকৃত কবির আহমেদ, মোর্শেদ আলম ও তার গাড়ি চালক হেলালসহ অপর তিন আসামি হচ্ছেন- যাত্রী আবদুস সাত্তার, রাজমনি জুয়েলার্সের মালিক সঞ্জয় ও উত্তরার একজন স্বর্ণ ব্যবসায়ী।