বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশ
সুবিধা :যুক্তরাষ্ট্রের কঠিন শর্ত
প্রকাশ : ০৮ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৫৫
বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা পাওয়া নিয়ে কঠিন শর্ত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির শর্ত হচ্ছে বাংলাদেশকে আগে ট্রেড এন্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট বা টিকফা চুক্তি সই করতে হবে। আর বাংলাদেশ চায় আগে শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা। তবে বাংলাদেশ যে সব পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়, যুক্তরাষ্ট্র তা বাতিলের ঘোষণায় সংকট নতুন মোড় নিয়েছে। অবশ্য টিকফা চুক্তি নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বাণিজ্যমন্ত্রী জিএম কাদের আগামী দুই-একদিনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বৈঠক করবেন। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশ টিকফা চুক্তি স্বাক্ষরের বিপক্ষে।
উল্লেখ্য, টিকফা চুক্তির অধীনে যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের বিষয়ে সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। দুই দেশের পদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা বছরে অন্তত একবার বৈঠকে বসে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বিষয়ে কৌশলগত কাঠামো এবং নীতি প্রণয়ন করবেন। এছাড়া এ চুক্তির অধীনে বাজার প্রবেশাধিকার, শ্রমিক অধিকার সংরক্ষণ ইস্যু, পরিবেশ, মেধাস্বত্ব আইন প্রভৃতি বিষয় উল্লেখ থাকবে।
জানা গেছে, টিকফা চুক্তি নিয়ে সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্বিমত রয়েছে। টিকফার জন্য গঠিত মন্ত্রিসভা কমিটির সভাপতি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের সভাপতিত্বে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ চুক্তি স্বাক্ষরের পক্ষে মত দেয়া হয়; কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী চান আগে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা নিয়ে তারপর টিকফা চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে। সরকারের এ মনোভাব জানার পর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহারের কথা জানিয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর গত ডিসেম্বরের শেষের দিকে বাণিজ্যমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা বাতিলের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে দিয়েছিল।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা বাতিলের যে বিষয়টি তুলেছে, তা টিকফা চুক্তি সইয়ের জন্য একটি পরোক্ষ চাপ। তবে এক্ষেত্রে তাদের অন্য তিনটি ইস্যু যেমন কারখানার শ্রমিকদের জীবনমান, শ্রমিক নেতা আমিনুল হত্যার বিচার এবং তাজরীন গার্মেন্টসের অগ্নিকাণ্ডের বিষয়টিও একদম ফেলে দেয়া যায় না। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা দিলেও এ বিষয়গুলো সবসময় আমলে রাখবে।
গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ যেমন তুরস্ক, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার পোশাক রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও বাংলাদেশের রপ্তানি কমে আসায় উদ্বিগ্ন সংশ্লিষ্টরা। একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রেই বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি তৈরি পোশাক রপ্তানি করে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের কাস্টমস ডিপার্টমেন্টের তথ্য অনুযায়ী ২০১২ সালে আগের বছরের তুলনায় মার্কিন বাজারে তুরস্কের রপ্তানি বেড়েছে শতকরা ২০ ভাগ, ভিয়েতনামের ৭ দশমিক ৯ ভাগ এবং কম্বোডিয়ার ৬ দশমিক ৪ ভাগ। অথচ বাংলাদেশের বেড়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৩৩ ভাগ। জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের কোনো পোশাকেরই শুল্কমুক্ত বাণিজ্য প্রবেশাধিকার নেই। বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা ১৫ শতাংশেরও বেশি শুল্ক দিয়ে এ পণ্যটি রপ্তানি করে থাকেন।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের যে চার দশমিক আট বিলিয়ন ডলারের বাজার রয়েছে তার মধ্যে মাত্র শূন্য দশমিক ৫৪ শতাংশ পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়। রপ্তানির হিসাবে এর পরিমাণ দুই কোটি ৬০ লাখ ডলার। এ পণ্যের মধ্যে রয়েছে টোব্যাকো, সিরামিকস, ফার্নিচার, প্লাস্টিক পণ্য এবং খেলনা। রপ্তানির সাথে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এত অল্প পরিমাণ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিলেও যুক্তরাষ্ট্র সবসময় বাংলাদেশকে কঠোর শর্তে রেখেছে। বিশেষ করে কারখানার কাজের পরিবেশমান বজায় না থাকলে দেশটি জিএসপি সুবিধা বাতিলের কথা জানিয়েছে। তারা জানান, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশগুলোতে জিএসপি সুবিধার আওতায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের শতভাগ বিনা শুল্কে যাচ্ছে। এরপরও এ অঞ্চলের কোনো দেশ এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশকে পূর্বশর্ত দেয়নি। ২০১১-১২ অর্থ বছরে বাংলাদেশ ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে মোট ১১ হাজার ৩৭৫ মিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধার বিষয়ে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, এ সুবিধা আদায়ের জন্য আমরা ইতিপূর্বে তিনটি লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করেছি। সরকারও একটি লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ দিয়েছে; কিন্তু তাতে কোনো ফল হয়নি। এ পর্যায়ে এসে যুক্তরাষ্ট্র যদি কর্মপরিবেশ ভালো করার শর্ত দিয়ে জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহার করে নেয় তাহলে বিশ্বে আমাদের নেতিবাচক ইমেজ সৃষ্টি হবে। তবে এতে পোশাক রপ্তানিতে কোনো প্রভাব পড়বে না বলে তিনি জানান। তিনি অবশ্য জানিয়েছেন, বিজিএমইএ আইএলও কর্তৃক বেটার ওয়ার্ক প্রোগ্রাম অনুসরণ করছে। ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াও একই ম্যানুয়াল মেনে চলছে।
শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ, নিরাপত্তাহীনতা, কম মজুরি, সংগঠনের অধিকার না থাকা এবং কয়েকটি বড় দুর্ঘটনায় নানামুখী চাপের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত। ডেমোক্র্যাট সমর্থিত যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক সংগঠনের ফেডারেশন-এএফএল সিআইওসহ বিভিন্ন সংগঠন সেদেশের সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। কয়েকজন সিনেটর, কংগ্রেসম্যান, আইনজীবী এমনকি সংবাদ মাধ্যমও সরব হয়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকখাতে কাজের ঝুঁকি ও কম মজুরির সমালোচনায়।
জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহারে মতামত নেবে যুক্তরাষ্ট্র
এদিকে, বাংলাদেশি পণ্যের জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহারের জন্য আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত সংশ্লিষ্টদের মতামত নেবে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য দপ্তর—ইউএসটিআর। এ মতামতের ওপর নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য দেয়া জিএসপি সুবিধা পুরোপুরি না, আংশিক প্রত্যাহার করবে।