শ্রমিক ধর্মঘটে অচল নৌপথ হাজারো মানুষের দুর্ভোগ

সারাদেশে নৌ-যান শ্রমিক ধর্মঘট শুরু হয়েছে গতকাল বুধবার ভোর রাত থেকে। ১৬ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে এ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে নৌ-যান শ্রমিক ফেডারেশন। ধর্মঘটের কারণে দেশের সব নৌ-পথে নৌ-যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নৌ-টার্মিনালগুলোতে আটকা পড়েছেন যাত্রীরা। চরম দুর্ভোগের শিকার এসব যাত্রীর সময় কাটছে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠায়। দ্রুত এই সমস্যার সমাধান ও ধর্মঘটের অবসান চান যাত্রীরা। রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালেও বুধবার সকাল থেকে লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। নৌ-যান শ্রমিকদের ধর্মঘটের কারণে সদরঘাটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। অনেকে নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছতে না পেরে ধর্মঘটকারীদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ভুক্তভোগী যাত্রীরা বলেন, আমরা ধর্মঘট আর দেখতে চাই না। সমাধান চাই। একই সঙ্গে তারা এ ব্যাপারে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। সকাল থেকে নির্দিষ্ট গন্তব্যে যেতে বিপুল সংখ্যক মানুষ লঞ্চ টার্মিনালে এসে জড়ো হন। গোমতী ব্রিজে সংস্কার কাজ চলায় টার্মিনালে মানুষের চাপ ছিল তুলনামূলক বেশি। কিন্তু ধর্মঘটে লঞ্চ চলাচল না করায় চরম দুর্ভোগে পড়েন হাজার হাজার মানুষ। স্বরূপকাঠির আবদুল মান্নান ইত্তেফাককে বলেন, এটা চরম দুর্ভোগ। অনেকে চিকিত্সার জন্য ঢাকায় আসেন। আবার বাড়িতে অনেকের জরুরি কাজ থাকতে পারে। এসব করে দুর্ভোগ সৃষ্টি করা অপ্রত্যাশিত। আমাদের হরতাল, অবরোধসহ নৈরাজ্যকর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। মানুষ আর অশান্তি চায় না। চাঁদপুরের জাহান বেগম তার ছোট ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বাড়ি যাওয়ার জন্য সন্তানদের নিয়ে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘সড়ক পথে গোমতী ব্রিজের কাজ চলছে। সে জন্যই লঞ্চে বাড়ি যাওয়ার জন্য এসেছি। শুক্রবার ছোট ভাইয়ের বিয়ে, বুধবার গায়ে হলুদ। যে করেই হোক বাড়ি যেতে হবে। কিন্তু লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় সমস্যায় পড়ে আছি। উল্লেখ্য, ১৬ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে এ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে নৌ-যান শ্রমিক ফেডারেশন। এসব দাবির মধ্যে রয়েছে লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়ন শ্রমিকদের নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র প্রদান, মাস্টার-ড্রাইভারদের সার্টিফিকেট মেয়াদিকরণ বাতিল, বাজারদরের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বেতন স্কেল পুনর্নির্ধারণ এবং নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি। এছাড়া সামুদ্রিক মাছ শিকারি জাহাজ শ্রমিক ইউনিয়নের শ্রমিকদের নিয়োগপত্র প্রদান, ১৯৮৭ সালের চুক্তি অনুযায়ী শ্রমিকদের প্রভিডেন্ড ফান্ড চালু, ২০০৭ সালে সরকার ঘোষিত নিম্নতম মজুরি বকেয়াসহ প্রদান, ফিশিং ট্রলার শ্রমিকদের জন্য নতুন বেতন স্কেল ঘোষণাসহ ১৬ দফা দাবি করেছে নৌ-যান শ্রমিক ফেডারেশন। এদিকে নৌ-যান শ্রমিক ফেডারেশনের ধর্মঘট বেআইনি ও ট্রেড ইউনিয়নের নামে সন্ত্রাসের বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ নৌ-যান মালিক সমিতি। অবৈধ ধর্মঘটকে কঠোর হস্তে দমনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সমিতির নেতারা। মালিক সমিতি এক বিবৃতিতে বলেছে, সরকার ২০১০ সালে নৌ-যান শ্রমিকদের নির্ধারিত মজুরি স্কেল ঘোষণা করে। এতে ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ বেতন ভাতা বাড়ানো হয়, যা ৫ বছর মেয়াদের জন্য করা হয়। এই মজুরি ২০১৪ সাল পর্যন্ত বলবত্ থাকবে। মেয়াদ শেষের আগে বেতন বৃদ্ধির জন্য আন্দোলন সম্পূর্ণ বেআইনি। মালিক সমিতি দাবি করেছে, ২০১০ সালের মজুরি কাঠামোর বাইরে শ্রমিকরা অনেক অলিখিত সুবিধা ভোগ করে আসছেন। এতে রয়েছে দুই ঈদে বোনাস, গ্রাচুইটি, ট্রিপ বোনাস, ছুটির বেতন, ইনক্রিমেন্ট, রান্নার জন্য কুক, জ্বালানি তেল, সাবান ও খোরাকি বাবদ অগ্রিম ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। এসব সুবিধা পেয়ে শ্রমিকরা সন্তুষ্ট। কিন্তু কতিপয় নেতা ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহার করছেন নৌ-যান শ্রমিক ফেডারেশনকে। তারা ধর্মঘটে ইন্ধন দিচ্ছেন। মালিক সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়, চট্টগ্রাম ও মংলা নদীবন্দরে আগত জাহাজ জিম্মি করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ নৌ-যান শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী আশিকুল আলম ইত্তেফাককে বলেন, নৌযান শ্রমিকরা ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে স্বতঃফূর্তভাবে তাদের আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। জোর করে কোন লঞ্চ বা জাহাজ আটকিয়ে রাখার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তিনি বলেন, বরং নৌ-যান মালিক সমিতি নেপথ্যে আন্দোলন বানচাল করার নানা ষড়যন্ত্র করছে। মালিক পক্ষের উষ্কানিতে গত মঙ্গলবার রাতে পুলিশ কামাল ও মোহাম্মদ আলী নামে দু’জন চালককে গ্রেফতার করেছে। তিনি অবিলম্বে গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি এবং ১৬ দফা দাবি মেনে নেয়ার আহবান জানান। অন্যথায় লাগাতার ধর্মঘট চলবে। নৌ-যান ধর্মঘট সম্পর্কে বিআইডব্লিউটিএর ঊর্ধ্বতন উপ-পরিচালক সাইফুল হক খান ইত্তেফাককে বলেন, একদিকে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, অপরদিকে নৌ-ধর্মঘটে কারণে যাত্রী দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। তিনি বলেন, মালিক ও শ্রমিকদের বিষয় নিয়ে এই ধর্মঘট। আইন-শৃংখলা ঠিক রাখা ছাড়া আমাদের তেমন কিছু করার নেই। এদিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী নৌযান শ্রমিক কর্মচারী দলের উদ্যোগে সদরঘাটস্থ কার্যালয়ে সংগঠনের সভাপতি মতিয়ার রহমানের সভাপতিত্বে এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তারা বাংলাদেশ লঞ্চ লেবার এসোসিয়েশনের আহ্বানে নৌ-শ্রমিকদের ১৬ দফা দাবি আদায়ের ভিত্তিতে ডাকা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির প্রতি সমর্থন জানান। এতে বক্তব্য রাখেন সাধারণ সম্পাদক সুমন ভুঁইয়া সহ-সভাপতি, বাবুল আহমেদ, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. জাকির হোসেন মিলন প্রমুখ। চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য ওঠানামা হয়নি চট্টগ্রাম অফিস জানায়, ১৬ দফা দাবিতে দেশব্যাপী লাগাতার ধর্মঘটের আওতায় গতকাল বুধবার চট্টগ্রামেও নৌযান শ্রমিকরা জাহাজে পণ্য ওঠানামার কাজ থেকে বিরত থাকেন। এ কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থানকারী কোনো মাদার ভেসেল হতে পণ্য খালাস হয়নি। কর্ণফুলি নদীর ১৬টি ঘাটে অবস্থানরত নৌযানগুলোতেও কোনো ধরনের পণ্য ওঠানামা হয়নি। মঙ্গলবার মাঝ রাত থেকে শুরু হওয়া এ ধর্মঘটের জেরে কর্ণফুলি নদীতে খাদ্যশস্য, সিমেন্ট ক্লিংকারসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে অসংখ্য পণ্যবাহী জাহাজকে অলস বসে থাকতে হয়েছে। বিক্ষুব্ধ নৌযান শ্রমিকরা সারাদিনই তাদের দাবি-দাওয়া আদায়ের জন্য মিছিল, সমাবেশ করেছে। বিকালে সদরঘাট মোড়ে আবু তাহেরের সভাপতিত্বে বাংলাদেশ লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়ন ও সামুদ্রিক মত্স্য শিকারী জাহাজ শ্রমিক ইউনিয়নের যৌথ সমাবেশে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কাজে যোগদান থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়। এদিকে বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ এ ধর্মঘটকে অবৈধ দাবি করে এ কারণে জাহাজ মালিকদের প্রচুর আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে বলে জানান। সংগঠনের সিনিয়র সহ-সভাপতি কামাল হায়াত্ খান বলেন, বহির্নোঙরে কমপক্ষে ১৫টি বিদেশি মাদার ভেসেল পণ্য খালাসের অপেক্ষায় বসে আছে। চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ ফরহাদউদ্দিন অবশ্য চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিগুলোতে ধর্মঘটের কোনো প্রভাব পড়েনি এবং সেখানে শ্রমিকরা স্বাভাবিকভাবেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান। মংলা বন্দর অচল খুলনা অফিস ও মংলা সংবাদদাতা জানান, ধর্মঘটের কারণে গতকাল মংলা বন্দরসহ দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থানরত সকল বাণিজ্যিক জাহাজের পণ্য বোঝাই ও খালাস কাজ বন্ধ থাকে। এতে করে মংলা বন্দর অচল হয়ে পড়ে। বুধবার সকাল থেকে বন্দরে অবস্থানরত সব জাহাজ ও শিল্প এলাকার সকল সিমেন্ট কারখানা থেকে নৌযানে সিমেন্ট ডেলিভারী এবং সিমেন্টের কাঁচামাল উঠানামা বন্ধ রয়েছে। এর পাশাপাশি বন্ধ রয়েছে সকল প্রকার লঞ্চ চলাচল। মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের ট্রাফিক পরিচালক মাহাবুল্লাহ জানান, নৌযান শ্রমিকদের ধর্মঘটের ফলে বন্দরে অবস্থানরত ৩টি ক্লিংকার, ২টি সার ও ১টি লবণবাহীসহ মোট ৬টি জাহাজের পণ্য খালাস ও বোঝাই কাজ বন্ধ রয়েছে। এতে করে বন্দরে টাইম চার্টারের মাধ্যমে পণ্য নিয়ে আসা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে অনেক বেশি ডেমারেজ দিয়ে আর্থিক লোকসানে পড়তে হচ্ছে। মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার কমান্ডার এনামুল হক জানান, ধর্মঘটের ফলে বন্দরের সকল বাণিজ্যিক জাহাজ ছাড়াও খুলনা এবং নোয়াপাড়াসহ দক্ষিণাঞ্চলের নৌ-রুটের সকল ঘাটে নৌযান থেকে পণ্য খালাস ও বোঝাই বন্ধ রয়েছে। আশুগঞ্জে ২ শতাধিক কার্গো আটকা ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি ও আশুগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, ধর্মঘটের কারণে বিভিন্ন পণ্য নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ আন্তর্জাতিক নৌ-বন্দরে আটকা পড়েছে ২ শতাধিক মালবাহী কার্গো জাহাজ। নৌপথে পণ্য পরিবহনে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ৬টি নৌ-রুটে বন্ধ রয়েছে যাত্রীবাহী লঞ্চসহ সকল প্রকার নৌযান চলাচল । চরম দুর্ভোগে পড়েছে হাওরাঞ্চলের নৌ-পথের যাত্রীরা। আটকা পড়া কার্গো জাহাজে রয়েছে সার, কয়লা, রড-সীমেন্ট, বালি-পাথর ও জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন মালামাল। অপরদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-নবীনগর-বাঞ্ছারামপুর, আশুগঞ্জ-নবীনগর-অষ্ট্রগ্রাম-লাখাই ও আজমীরিগঞ্জ নৌ-রুটে যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে বিভিন্ন লঞ্চঘাটে আটকে পড়া যাত্রীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছোট ছোট ট্রলার দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছার চেষ্টা করছে। পিরোজপুরে নৌ ধর্মঘট পিরোজপুর অফিস জানায়, গতকাল বুধবার হুলারহাট, কাউখালি ও ভাণ্ডারিয়া লঞ্চ ঘাট থেকে কোনো লঞ্চ ছেড়ে যায়নি। যাত্রীরা জানান, অনেকে দূর থেকে এসে দেখেন যে, লঞ্চ চলাচল বন্ধ। ফলে তারা চরম বিপাকে পড়েছেন। এদের কেউ ফিরে গেছেন আবার কেউ সড়কপথে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে বাড়তি অর্থ খরচ হচ্ছে।