পদ্মা সেতুর গুরুত্বপূর্ণ নথি গায়েব!

পদ্মা সেতুর দরপত্র, মূল্যায়ন ও পরামর্শক নিয়োগ সংক্রান্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথি গায়েব হয়ে গেছে বলে সন্দেহ করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সেতু বিভাগ থেকে পদ্মা সেতুর দরপত্র, মূল্যায়ন ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের মধ্যে অন্তত শতাধিক নথি জব্দ করার পর এমন সন্দেহ করছে তদন্ত কর্মকর্তারা। তাদের ধারণা, মামলা দায়েরের আগেই সেতু ভবন থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নথি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। সেতু দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের মামলা তদন্তের জন্য গতকাল ও গত মঙ্গলবার পদ্মা সেতু ভবন থেকে পদ্মা সেতুর দরপত্র, মূল্যায়ন ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের মধ্যে অন্তত শতাধিক নথিপত্র জব্দ করেছে দুদক। কর্মকর্তারা মনে করছেন, সরিয়ে ফেলা গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের কোনো কোনো তথ্য পদ্মা সেতু দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের মামলার কারাবন্দী মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া ও কাজী মো. ফেরদৌসের জব্দ করা নষ্ট কম্পিউটার রয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, পরামর্শক কাজের দরপত্র আহ্বানের সময় থেকে প্রাক যাচাই পর্যন্ত তাদের ই-মেইল ঠিকানা থেকে আদান-প্রদান করা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ই-মেইল এবং লাভালিনের সঙ্গে ই-মেইলে যোগাযোগের তথ্যের কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। প্রসঙ্গত দুদকের তদন্ত দল তদন্তের স্বার্থে নথিপত্র দেখতে চেয়ে গত ২০ ডিসেম্বর সেতু কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়। ওই চিঠিতে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে নথিপত্র দিতে বলা হলে নির্ধারিত সময়ে সেতু কর্তৃপক্ষ তা সরবরাহ করেনি। এ কারণে তদন্ত দল আদালতে আবেদন করে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তদন্ত টিম সেতু ভবনে নথিপত্র জব্দ অভিযান চালায়। দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান ইত্তেফাককে বলেন, মামলার অভিযোগ প্রমাণ করতে হলে দালিলিক প্রমাণ এবং সাক্ষীর প্রয়োজন। দালিলিক প্রমাণের জন্য নথিপত্র জব্দ করা এবং সেগুলো পরীক্ষা করা ছাড়া কোনো পথ নেই। দালিলিক প্রমাণ পাওয়ার জন্য নথিপত্র জব্দ করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তদন্ত কর্মকর্তা জানান, এসএনসি লাভালিনের সাবেক কর্মকর্তা রমেশ ও ইসমাইলের বিরুদ্ধে ওই দেশে বিচার কাজ চলার কারণে সে দেশের আদালত রমেশের জব্দকৃত ডায়রি দেবে কি না, তা নিয়েও সংশয় আছে। তাছাড়া ই-মেইল যোগাযোগের তথ্য উদ্ধার করাও দুরূহ হয়ে পড়ায় তদন্ত কর্মকর্তারা বিপাকে পড়েছেন। এ কারণে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহে হিমশিম খেতে হচ্ছে তদন্ত কর্মকর্তাদের। অপর দিকে রমেশ এবং ইসমাইলের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও এখন পর্যন্ত কানাডা সরকারের অনুমতি না পাওয়ায় ওই দেশে যেতে পারছে না তদন্ত কর্মকর্তারা। তিনি আরো বলেন, বিশ্ব ব্যাংক দ্বিতীয়বারের সফরের সময় বলেছিল, মামলা-পরবর্তী সময়ে তদন্ত কাজে পর্যাপ্ত সহায়তা করবে; কিন্তু কার্যত তা দেখছে না দুদক। এসব পরিস্থিতিতে পদ্মা সেতুর দরপত্র, মূল্যায়ন ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ভালো করে খতিয়ে দেখতে হবে। তিনি আরো জানান, মামলা প্রমাণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দালিলিক প্রমাণের আশায় পদ্মা সেতু দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের মামলার কারাবন্দী মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া ও কাজী মো. ফেরদৌসের জব্দ করা নষ্ট কম্পিউটার থেকে তথ্য উদ্ধার করার চেষ্টা করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। নষ্ট কম্পিউটার থেকে তথ্য উদ্ধারের জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দ্বারস্থ হয়েছে দুদক। সেতু বিভাগ থেকে জব্দকৃত নথিপত্রের ব্যাপারে দুদক সূত্র জানায়, ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত পদ্মা সেতু প্রকল্পের দরপত্রের মূল নথি, ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর দরপত্রে অংশগ্রহণকারী ১৩টি প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র, প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট, পদ্মা সেতুর ড্রইং অ্যান্ড ডিজাইন, মূল্যায়ন কমিটি চার বার গঠন ও বাতিল সংক্রান্ত মোশাররফ হোসেনের স্বাক্ষরিত কাগজপত্র জব্দ করা হয়েছে। দুদকের একজন তদন্ত কর্মকর্তা জানান, পদ্মা সেতু দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের মামলার কারাবন্দী দুই আসামি সাবেক সেতু সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া ও সেতু বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাজী মো. ফেরদৌস তাদের ডেস্কটপ ও ল্যাপটপের হার্ডডিস্ক নষ্ট করে ফেলেছেন। এমনকি কানাডিয়ান পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএনসি লাভালিনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আদান-প্রদান করা ই-মেইলগুলোও মুছে ফেলেছেন তারা। এসব তথ্য পুনরুদ্ধারে দুদক এখন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের সাহায্য নেবে। এ বিষয়ে গত সোমবার বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দলের সঙ্গে আলোচনাও করেছে দুদক। দ্রুত কম্পিউটার ও ই-মেইলের তথ্য উদ্ধার করতে দুই-একদিনের মধ্যেই বুয়েটের এক্সপার্ট প্যানেল কাজ শুরু করবে।