বিশ্ব ইজতেমা ও দাওয়াতে দ্বীনের পর্যালোচনা
প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০১৩, ১৮:৪৫
প্রত্যেক বছর বিশ্ব ইজতেমা তাবলীগ জামায়াতের মুসল্লিদের অনুপ্রাণীত করে দ্বীনের দাওয়াতে বিরামহীনভাবে মেহনত করার। ইজতেমা থেকে ফিরে গিয়ে নব উদ্যামে তাবলীগের কাজে বেশি বেশি সময় দান করার লোকের সংখ্যা অগণিত। লাখ লাখ মানুষের এই ইজতেমা যেমনভাবে তাবলীগ সদস্যদের উজ্জীবিত করে তেমনি সারাদেশের ঈমানদার মুসলমানদের মাঝে একটা প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে। আখেরী মুনাজাতে তাই দেশের প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রীসহ কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত হন। যারা ময়দানে না যেতে পারেন তারা সরাসরি টেলিভিশনের মুনাজাতে শরীক হন। আখেরী মুনাজাতের দিন সরকারি ছুটিও ঘোষণা করা হয়। বিশ্বের একশ’র বেশি দেশের ও বাংলাদেশের মিলে প্রায় ৩০/৩৫ লক্ষ মানুষের এই সমাবেশ কোন ক্ষুদ্র ব্যাপার নয়। বাংলাদেশের তাবলীগের সর্বপ্রথম সম্মেলন বা ইজতেমা হয় ১৯৪৬ সালে ঢাকার রমনাপার্ক সংলগ্ন কাকরাইল মসজিদে। এর পর ১৯৪৮ সালে ইজতেমা হয় চট্টগ্রামের তত্কালীন হাজী ক্যাম্পে। ১৯৫৮ সালে অনুষ্ঠিত হয় বর্তমান নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে। তখন এটা কেবল ইজতেমা হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু প্রতিবছর ইজতেমায় অংশ গ্রহণকারীর সংখ্যা আশাতীতভাবে বাড়তে থাকায় ১৯৬৬ সালে ইজতেমা হয় টঙ্গীর পাগার গ্রামের খোলা মাঠে। ঐ বছর বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা অংশগ্রহণ করায় বিশ্ব ইজতেমা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। যার কারণে ১৯৬৭ সাল হতে আজ অবধি বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হচ্ছে টঙ্গীর তুরাগ নদীর উত্তর-পূর্ব তীর সংলগ্ন তত্কালীন ডিআই বর্তমানে রাজউকের হুকুম দখলকৃত ১৬০ একর জায়গার বিশাল খোলা মাঠে। তাবলীগ জামায়াতের কর্মকাণ্ড ইসলামের পূর্ণাঙ্গরূপ না হলেও একটি পার্ট তো তারা পালন করছেন। ইসলামের আংশিক দাওয়াতী কাজ তো তাদের মাধ্যমে সংঘটিত হচ্ছে। অন্যদিকে যারা দাওয়াত না দিয়ে কেবল নিজকে গুটিয়ে নিয়েছেন। এটা ইসলামের কোন নির্দেশিত পন্থা নয়। কেননা যুগে যুগে মানুষ যখন আল্লাহ তা’য়ালা এবং তাঁর বিধানকে ভুলে গিয়েছিলেন। তখনই আল্লাহ মেহেরবাণী করে মানব জাতির মধ্য থেকেই সঠিক পথ দেখানোর জন্য নবী বা রাসুল পাঠিয়েছেন। আর সকল নবী-রসূলই সর্বপ্রথম তার কওমের বা সম্প্রদায়ের কাছে দাওয়াত দিয়েছেন। শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) -এর ওফাতের পর কেয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত আর কোনো নবী-রসূল আসবেন না। কিন্তু যারা তাঁর প্রকৃত অনুসারী তারাই কুরআন ও সুন্নাহের ভিত্তিতে মানুষকে আল্লাহর প্রকৃত বান্দাহ হওয়ার জন্য দাওয়াতের কাজটি চালিয়ে যাবেন। সুতরাং দাওয়াতের এই মেহনত কেয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত চলতে থাকবে। নিম্নে আল কুরআন ও হাদীসে দাওয়াতের গুরুত্ব ও পদ্ধতির ওপর আলোকপাত করা হলোঃ ‘তোমাদের মাঝে এমন একটি দল অবশ্যই থাকা উচিত যারা সত্ কাজের প্রতি আহ্বান জানাবে, নির্দেশ দেবে ভালো কাজের এবং নিষেধ করবে অন্যায় কাজ থেকে, আর তাঁরাই হলো সফলকাম (সূরা ইমরান-১০৪-১০৫) সকল মানুষকে দাওয়াতী কাজের নির্দেশ আল্লাহ তা’য়ালা দেননি। তবে মানুষের মধ্য হতে অবশ্যই একটি দল বের হবে দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে। যেমন রসূল (স.) তার সাহাবীদের ইয়েমেন, আবিসিনিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাঠাতেন। দাওয়াতী কাজে বাধা আসলেও এ কাজে বিরত থাকা যাবে না। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘হে মুহাম্মদ (স.)! যদি তাদের বিমুখতা আপনার কাছে সহ্য করা কঠিন হয়, তাহলে আপনি জমিনে কোনো সুড়ঙ্গ তালাশ করুন অথবা আকাশে সিঁড়ি লাগিয়ে নিন এবং তাদের সামনে কোনো মোজেজা আনতে পারেন, তবে তা আনুন। আল্লাহ যদি চাইতেন তাহলে সবাইকে একত্রিত করে হেদায়েত করতে পারতেন। অতএব, আপনি নির্বোধের অন্তর্ভুক্ত হবেন না। আসলে সত্যের দাওয়াতে তারাই সাড়া দেয়, যারা শ্রবণ করে (সূরা আনয়াম-৩৫-৩৬)। এখানে রসূলকে (স.) আল্লাহ তা’য়ালা দাওয়াতী কাজে স্তব্ধ থাকার কোনো অনুমতি দেননি। অন্য আয়াতে আরো কঠিন কথা আল্লাহ তা’য়ালা বলেছেন, ‘হে রসূল (স.)! পৌঁছে দিন আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা নাজিল হয়েছে। আর যদি আপনি এরূপ না করেন, তবে তো আপনি তার পয়গাম কিছুই পৌঁছালেন না। আল্লাহ আপনাকে মানুষের কাছ থেকে রক্ষা করবেন (সূরা মায়িদা ৬৭ আয়াত)। আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর প্রিয় হাবিব মুহাম্মদুর রসূলকে (স.) কোনো ছাড় দিয়ে কথা বলেননি। বরং তাঁর দায়িত্ব সম্পর্কে সজাগ করার জন্য এই কঠিন সাবধানবাণী শুনিয়েছেন। মহানবীর পরে তাঁরই দাওয়াতী মিশন পরিচালনার দায়িত্ব একমাত্র তাঁর খাঁটি উম্মতের ওপর বর্তায়। আমরা যখন দাওয়াত দেব তখন আমাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে কিছু নির্দেশনা রয়েছে- ‘আপনি মানুষকে আপনার পালনকর্তার পথে ডাকুন হেকমাত বা প্রজ্ঞার সাথে ও সত্ উপদেশের সাথে আর বিরোধীদের সাথে তর্ক করুন যুক্তির সাথে (সূরা নাহল-১২৫ আয়াত)। আল্লাহর বাণীর দাওয়াতী কাজ যুক্তিক ভাবে উপস্থাপন করতে হবে। আল্লাহ তা’য়ালা সূরা গাশিয়ার মধ্যে বলেছেন, হে নবী (স.)! আপনি মানুষদেরকে উপদেশ দিতে থাকুন, আপনি তো একজন উপদেশদাতা। এ কাজে কোনরূপ কঠোরতা অবলম্বন করা আপনার কাজ নয়। কারণ অনেক সময় দেখা যায়, বার বার দাওয়াত দেয়ার পরও যখন কোনো লোক না ফিরে আসে তখন কিছুটা নিজের কাছে অসহায় লাগে যে, লোকটাকে এত বুঝানোর পরও লোকটা সত্ পথে এলো না। এ বিষয়ে একজন দ্বীনের দায়ীর মনে যাতে কোন ক্ষোভ জমতে না পারে সে কারণে তাঁর নবীর মাধ্যমেই এর মীমাংসা করে দিয়ে আল্লাহ বলেছেন, ‘হে নবী আপনি যাকে ভালোবাসেন তাকে আপনি হেদায়েত দিতে পারেন না বরং আল্লাহ তা’য়ালা যাকে ইচ্ছা হেদায়েত দেবেন। সুতরাং প্রতীয়মান হচ্ছে যে, হেদায়েতের মালিক কেবলমাত্র আল্লাহ তা’য়ালা। নবী রসূল ও ঈমানদারদের কাজ হলো দাওয়াত দিয়ে যাওয়া। হতাশ না হওয়া। রসূল (স.) গোপনে গোপনে তিন বছর দাওয়াত দিয়েছিলেন। বেশিরভাগ মানুষ ঈমান না আনায় তিনি তখন কিছুটা স্থবির হয়ে পড়েছিলেন, আল্লাহ তখন বলেন, ‘হে চাদরাবৃত! উঠুন! সতর্ক করুন এবং আপনার পালনকর্তার শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করুন। আপন পোশাক পবিত্র করুন এবং অপবিত্র থেকে দূরে থাকুন (সূরা মুদ্দাসসির ১-৫) তাই, যারা আল্লাহর পথে নিজেকে সোপর্দ করবেন তারা যত বাধা আসুক না কেন কখনোই এই সহজ-সরল সিরাতুল মুস্তাকিমের পথ হতে বিচ্যুত হবেন না। দ্বীনের দাওয়াতে যারা প্রজ্ঞাবান তাদের কেউ কেউ মাঝে মাঝে ঘর ছেড়ে বাইরেও যাবেন। যেমন রসূল (স.)-এর চাচা রইসুল মুফাসসেরিন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রসূল (স.) হযরত মুয়ায ইবনে জাবাল (রা.)কে ইয়েমেনে পাঠিয়েছিলেন। পাঠাবার সময় তাকে বলেছিলেন, ‘তুমি আহলে কেতাবদের নিকট যাচ্ছো। তাদেরকে সর্বপ্রথম আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (স.) আল্লাহর রসূল একথার সাক্ষ্য দানের প্রতি আহ্বান করবে। যদি তারা এসব মেনে নেয় তাহলে তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই (বুখারী ও মুসলিম)। রসূল (স.) আরো বলেন, আল্লাহ তা’য়ালা সেই ব্যক্তিকে চির সবুজ রাখবেন- যে আমার নিকট থেকে যা কিছু শুনতে পেলো এবং অন্যের কাছে যথাযথভাবে তা পৌঁছে দিলো কেননা প্রায়শই মুবাল্লিগ বা প্রচারকগণ স্রোতার তুলনায় অধিক সংরক্ষণকারী হয়ে থাকে (তিরমিজি)। সুতরাং দাওয়াতের ব্যাপারে রসূল (স.) এখানে কিছু নির্দেশনা প্রদান করেছেন। যারা তাবলিগ করবেন তাদের অবশ্যই এ সমস্ত বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। তাবলীগের নামে কোনো অসত্য কথা প্রচার করা যাবে না। কোনো জাল যঈফ হাদীসের প্রচার করা হতে বিরত থাকতে হবে। আরো পরিষ্কার করে রসূল (স.) তাবলিগের পন্থা বলে দিয়েছেন-হযরত ইকরামা (রা.) হতে বর্ণিত্ল আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, প্রত্যেক সপ্তাহে জুমআর দিন নসিহত করো। এর অধিক দু’বার অথবা এর অধিক তিনবার করতে পারো। তবে এর অধিক নছিহত করো না এবং মানুষকে এই কুরআন সম্পর্কে বিতৃষ্ণ করে তুলনা। আর কখনো এমনটি যেন না হয়, তুমি একদল লোকের নিকট যাবে এই অবস্থায় যে, তারা নিজেদের কথাবার্তায় লিপ্ত আছে। ইতিমধ্যে তুমি তাদের কথার মাঝে বক্তৃতা শুরু করে দেবে আর তাদের আলোচনায় বিঘ্ন ঘটাবে। যদি তোমরা এরূপ করো তাহলে তোমরা তাদেরকে নিজেদের নসিহতের প্রতি বিতশ্রদ্ধ করে তুলবে। বরং এমতাবস্থায় নিরব থাকাই উত্তম। অতঃপর যখন তাদের মধ্যে আগ্রহ লক্ষ্য করবে এবং তোমাকে নছিহত করার জন্য অনুরোধ জানাবে কেবল তখনই তাদের নিকট নসিহতপূর্ণ বক্তৃতা পেশ করবে। লক্ষ্য রাখবে যেন বক্তৃতায় তোমাদের ভাষা ছন্দযুক্ত ও দুর্বোধ্য না হয়। কেননা আমি রসূল (স.) ও তাঁর সাহাবীদেরকে এরূপ ভাষা প্রয়োগ করতে দেখিনি (বুখারী)। উক্ত হাদীস থেকে তাবলিগের কাজে যারা নিজেদেরকে আত্মনিয়োগ করতে চান তাদের জন্য অতুলনীয় শিক্ষা নিহীত রয়েছে। শুধু তাই নয় হযরত আনাস বর্ণিত হাদীসে রসূল (স.) বলেছেন, দাওয়াতী কথা সহজ করো, কঠিন করো না। সুসংবাদ দাও, বীতশ্রদ্ধ করো না (বুখারী, মুসলিম)।
রসূল (স.) বলেন, মেরাজের রাতে আমি দেখতে পেলাম, কতগুলো লোকের ঠোঁট আগুনের কাঁচি দিয়ে কাটা হচ্ছে। আমি জিব্রাইল (আ.)কে জিজ্ঞাসা করলাম এরা কারা? তিনি বললেন, এরা হচ্ছে আপনার উম্মতের মোবাল্লিগ বা প্রচারকগণ। যারা অপরকে নেক কাজের নসিহত করতো কিন্তু নিজেরা তা আমল করতো না (মেশকাত)।
সুতরাং আমাদের মধ্য হতে যারা তাবলিগের কাজে নিজেদেরকে নিয়োজিত করবেন তারা অবশ্যই নবী রসূলগণ যেভাবে দাওয়াত দিয়েছেন সেভাবে দাওয়াত দেবেন ও সর্বশেষ নবী মুহাম্মদুর রসূল (স.) এর শেখানো পদ্ধতি ও সাহাবীদের বাস্তব জীবনের আমলী জিন্দেগীর প্রতি লক্ষ্য রেখে তাবলীগের কাজ সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে সচেষ্ট হবেন আল্লাহ আমাদের সকলকে সেই তাওফিক দান করুন, আমীন।