পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগ সংক্রান্ত মূল নথির হদিস নেই

সেতু বিভাগ থেকে পদ্মা সেতু প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগ সংক্রান্ত মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশের মূল নথি খুঁজে পায়নি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। নথির খোঁজে দুদকের তদন্ত দল গতকাল বৃহস্পতিবারও সেতু বিভাগে আরেক দফা নিষ্ফল অভিযান চালায়। দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মামলা দায়ের হওয়ার ২২ দিন পর সেতু বিভাগ থেকে নথি উদ্ধারের অভিযান এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি না পাওয়ায় সংস্থাটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলছে বলে মনে করেন অপরাধ আইন বিশেষজ্ঞরা। এদিকে কারাবন্দী সাবেক সেতু সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া ও সেতু বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাজী মো. ফেরদৌসের কাছ থেকে জব্দ নষ্ট করা কম্পিউটার ও ল্যাপটপ থেকে পদ্মা সেতু সংক্রান্ত তথ্য এবং তাদের ই-মেইল একাউন্টের ডিলিট হওয়া ষড়যন্ত্রমূলক ই-মেইল উদ্ধারে বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা নিচ্ছে দুদক। আজ অথবা আগামীকাল তথ্য উদ্ধারের জন্য বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের কাছে জব্দ করা দুটি নষ্ট কম্পিউটার এবং মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়ার ল্যাপটপ পাঠানো হবে। ইতিমধ্যে তাদের দুজনের ই-মেইল একাউন্ট থেকে লাভালিনের কাছ থেকে আসা ও পাঠানো মেইলগুলো উদ্ধারে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে চেষ্টা চালানো হচ্ছে। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের দিয়ে দুজনের ব্যবহূত কম্পিউটার ও ল্যাপটপ থেকে ডিলিট করা ডাটা উদ্ধারের পর ওই বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের পুনরায় রিমান্ডে আনা হবে। অপরদিকে পদ্মা সেতুর জন্য পরামর্শক সংস্থা নিয়োগে দুর্নীতির পুরো চিত্র বের করতে দুদক নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের দিয়ে টেন্ডার পুন:মূল্যায়ন এবং ১৩টি কোম্পানির আর্থিক ও কারিগরি প্রস্তাবের মূল্যায়নপত্র নিরীক্ষা করার উদ্যোগ নিয়েছে। এজন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সংশ্লিষ্ট বিভাগের অভিজ্ঞদের মাধ্যমে ৫ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হবে বলে দুদকসূত্রে জানা গেছে। দুদকের তদন্ত টিম জানায়, ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর পদ্মা সেতুর জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়। এতে ১৩টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাছাই করে এসএনসি লাভালিন, এইকম, এইচপিআর, ওরিয়েন্টাল ও হলক্রো নামে ৫টি প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে যোগ্য হিসাবে বাছাই করা হয়। এই ৫ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এসএনসি লাভালিনকে কার্যাদেশ দিতে ২০১০ সালের ১৮ জানুয়ারি থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত ৬ মাসে চারবার ভাঙ্গা হয় টেন্ডার কমিটি। এসব কমিটির দরপত্র ও আর্থিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি হয়েছে বলে মনে করছে দুদক। গতকাল বৃহস্পতিবার নথি জব্দ অভিযানের ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, গত তিনদিনের অভিযানে ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর দরপত্রে অংশগ্রহণকারী ১৩টি প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র, প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট, পদ্মা সেতুর ড্রইং অ্যান্ড ডিজাইন, মূল্যায়ন কমিটি চারবার গঠন ও বাতিল সংক্রান্ত মোশাররফ হোসেনের স্বাক্ষরিত কাগজপত্র জব্দ করা হয়েছে। তবে এসএনসি লাভালিনসহ পাঁচটি কোম্পানিকে যোগ্য বিবেচনা করে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির দেয়া সুপারিশের মূল নথিটি গতকাল পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এ নথিটির খোঁজে আবারো অভিযান চালানো হবে। দুদকের তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া ও কাজী মো. ফেরদৌসের কাছ থেকে সেতুর পরামর্শক সংস্থা নিয়োগে দুর্নীতির বিষয়ে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে দুদক। রিমান্ড চলাকালীন দুজনের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত টিম তাদের কম্পিউটার জব্দ করে তাদের পাঠানো ই-মেইল পরীক্ষা করে। কিছু সাধারণ তথ্য পাওয়া গেলেও লাভালিনের সঙ্গে আদান-প্রদানকৃত অনেক গুরুত্বপূর্ণ মেইল মুছে ফেলা হয়েছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, আসামিরা এসএনসি লাভালিনের কাছে মেইলের মাধ্যমে এমন কিছু তথ্য আদান-প্রদান করেছে যাতে দুর্নীতির বিষয়টি প্রমাণ হতে পারে। তাই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপপরিচালক মির্জা জাহিদুল আলম দুই আসামির রিমান্ড শেষে আদালতে পাঠানোর সময় দাখিলকৃত প্রতিবেদনে তাদের পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই আসামির কম্পিউটার ও ল্যাপটপ জব্দ করে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। সেগুলো যাচাই- বাছাইয়ের জন্য দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ করা হবে।