সংকটে মঙ্গোলিয়ার যাযাবর অর্থনীতি

মঙ্গোলিয়ার যাযাবর পশুপালকদের জীবন কখনোই সহজ ছিল না। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি একেবারেই আশংকাজনক। নিয়মিতভাবেই নেমে আসছে তীব্র শীত। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মরুভূমির আয়তন বৃদ্ধি। প্রচণ্ড শীত সইতে না পেরে মরে যাচ্ছে পশু। চারণোপযোগী ভূমি কমছে লাফিয়ে লাফিয়ে। সবকিছু মিলিয়ে জীবন এতোটাই কঠিন হয়ে পড়েছে যে, বিকল্প বেছে নিচ্ছে অনেকেই। ২০০০ থেকে ২০১২ এই ১৩ বছরে রাজধানীতে থিতু হয়েছে লক্ষাধিক লোক। হাজার হাজার লোক আশ্রয় নিয়েছে দ্বিতীয় শ্রেণীর শহরগুলোতে। আরো বিশ হাজার তাদের দলে যোগ দেয়ার অপেক্ষায়। মঙ্গোলিয়ায় অবশিষ্ট যাযাবর পশুপালক পরিবারের সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজার। শুধু কি শীত, গরমও কম যায় না। ২০০৯-১০ সালে তাপমাত্রা উঠেছিল ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। তারপরই আবার প্রচণ্ড শীত। এরকম অসহনীয় তাপমাত্রায় মানুষ খাপ খাওয়াতে পারলেও পশুরা তা পারে না। যে কারণে ওরা মারা পড়ে দলে দলে। গত দুই শীতে মঙ্গোলিয়ায় প্রাণ হারিয়েছে ৮০ লাখেরও বেশি পশু। সংখ্যাটা মোট গৃহপালিত প্রাণীর ১৭ শতাংশ। আগে পশু নিয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুরে বেড়ানোর কোন সমস্যা ছিল না। কিন্তু বর্তমানের চিত্রটা ভিন্ন। চারণভূমি কমে যাওয়াতে সবাইকে সব জায়গায় আগের মতো স্বাগত জানানো হয় না। এমনকি স্থানীয় সরকারের কর্মকর্তারাও নবাগতদের তাড়িয়ে দিতে উঠে পড়ে লাগেন। দেশের পশ্চিমাঞ্চলে মরুভূমির আয়তন দ্রুত বেড়ে যাওয়ার কারণেই এই বর্ধিত সংরক্ষণ নীতি। পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশের যাযাবররা দলে দলে অভিবাসিত হচ্ছে পূর্বদিকের আঞ্চলগুলোতে। অথচ এখানেও সম্পদ সীমিত। পানির কূপ ও তৃণভূমিগুলো ভাগাভাগি করতে এখন খুব কষ্ট হয়। কারণ লোকসংখ্যা আগেরচে’ বেড়ে গেছে। দেশের অনেক অঞ্চল খালি হয়ে গেলেও চারণোপযোগী তৃণভূমিগুলোতে লোক আসা বন্ধ হচ্ছে না। বহির্বিশ্বের লোকজন মঙ্গোলিয়ার গোবি মরুভূমির কথাই শুধু জানে, কিন্তু এ কথা অনেকেই জানে না যে, দেশের মোট ভূমির ৯০ শতাংশই শুষ্ক। ইউএনডিপির রিশ্লেষণ অনুযায়ী , চাষ ও চারণোপযোগী ভূমি কমতে থাকাই মঙ্গোলিয়ার প্রবৃদ্ধির জন্য সবচে’ বড় হুমকি। মঙ্গোলিয়ার যাযাবর পশুপালকদের দুর্দশা দূর করার ব্যাপারে সরকারি তত্পরতা নেই বললেই চলে। তীব্র শীত পড়লে পরিবারপিছু দুই-এক বাক্স শস্যসাহায্য দিয়েই দায়িত্ব শেষ করে সরকার। খাবারের কষ্ট সইতে না পেরেই যাযাবররা শহরমুখি হতে বাধ্য হয়। কিন্তু শহরে গিয়েও তাদের সমস্যা দূর হয় না। কারণ তারা পশুপালন ছাড়া অন্য কিছুই তো শিখেনি। উলানবাটারের অনেক স্থানে বেকারত্বের হার ৫০ শতাংশের বেশি। ১৯৯৯’র দশকের শুরুতে মঙ্গোলিয়া পুঁজিবাদকে আলিঙ্গন করার পরই সমস্যার সূত্রপাত। তার আগে সকল প্রাণীই ছিল সরকারের। যাযাবররা তখন ছিল কেবল পালক। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুরে কেবল প্রাণিগুলোর চাহিদা মেটাতেন তারা। আবহাওয়া ভালো না খারাপ, প্রাণিগুলো বেঁচে থাকছে না মরে যাচ্ছে, এ বিষয়গুলো নিয়ে ভাবার দায়িত্ব যায়াবরদের ছিল না। কিন্তু সমাজতন্ত্রের পতনের পর হঠাত্ করেই সব প্রাণির মালিক বনে গেলেন পালকেরা। এতে ঝুঁকিও বেড়ে যায়। পশু বিক্রি করে লাভবান হলে তারা হয়তো গর্ব করতে পারেন কিন্তু পশু সব মরে গেলে সেই ব্যর্থতার দায়-দায়িত্ব নেয়ার এখন কেউ নেই। তাই বলে মঙ্গোলিয়ার পশুপালক পরিবারের সংখ্যা কিন্তু কমছে না, কমছে যায়াবর পশুপালক পরিবারের সংখ্যা। নতুন নতুন লোক এ পেশায় আসছে। লাভের সম্ভাবনা দেখে কিছু ছাগল ও ভেড়া কিনে বেরিয়ে পড়ছে চরাতে। হিসেব অনুযায়ী, ১৯৯০ সালে পশুপালক পরিবারের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৪৭ হাজার। এখন তা ২ লাখ ৮৪ হাজার। নতুন পশুপালকরা চারণভূমিগুলোর প্রতি নির্দয় আচরণ করছে বলেই সমস্যা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার দিকে তাদের কোন খেয়াল থাকে না। সুইজারল্যান্ডের একটি দাতা সংস্থার রিপোর্ট বলছে, ১৯৬১ সালের তুলনায় ২০০৬ সালে শুষ্ক অঞ্চলে উত্পাদনশীলতা কমেছে প্রায় অর্ধেক। মরু অঞ্চল কমে গেছে ৩০ শতাংশ। জীবনের মৌলিক বিষয়গুলোতে পরিবর্তন এসেছে সামান্যই। তবে অনেক যাযাবরের সন্তান এবং নাতি-নাতনিরা এখন স্কুলে যায়। স্কুল খেকে ফিরে তারাও লেগে পড়ে পশু চরাণোর কাজে। যাযাবর পরিবারর সন্তানেরা তিন বছর বয়সেই ঘোড়া দৌড়াতে শিখে ফেলে, সঙ্গে আয়ত্ত করে ফেলে দুর্যোগ খেকে পশুদের রক্ষা করার কৌশল। ভূমি নিষ্প্রাণ হয়ে যাওয়াটাই আসলে যাযাবরদের মূল সমস্যা। শীতের চেয়ে বেশি সমস্যা সৃষ্টি করছে গ্রীষ্ম। বৃষ্টিপাত হয় না বললেই চলে। গেল বছর বসন্ত বলতে কিছুই ছিল না। দীর্ঘায়িত হয়েছিল শীত। প্রকৃতির এই বৈরী আচরণে অস্তিত্ব সংকটে পড়ে গেছে মঙ্গোলিয়ার যায়াবররা। মঙ্গোলিয়া বিশ্বের সবচে’ কম জনবহুল দেশ। ভূমিবেষ্টিত এ দেশটির আয়তন ১৫ লক্ষ কিলোমিটার। লোকসংখ্যা মাত্র ১০ লাখ। দেশের অনেক অঞ্চল একবারেই জনশূন্য। কিন্তু উলানবাটরের বস্তিগুলোতে চোখ পড়ে উপচে পড়া ভিড়। দেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই সেখানে বসবাস করে। এদের অধিকাংশই ছেড়ে এসেছে যাযাবর জীবন। সেভ দ্য চিলড্রেন ইন মঙ্গোলিয়ার প্রোগ্রাম অফিসার বলোরমা গুলগন্ডু বলছিলেন, যাযাবররা কোন রকম কারিগরি শিক্ষা ছাড়াই ঢুকে পড়ে রাজধানীতে, পশুপালন ছাড়া এরা কিছুই জানে না। অথচ তাদের এখন চাকরির প্রয়োজন। বর্তমান মঙ্গোলিয়ার প্রধান সমস্যা এটিই। —আই এইচ টি অনুসরণে