সম্পত্তিতে ছেলে-মেয়ের সমান অংশের দাবিতে মানববন্ধন

বিশ্বজুড়েই নারীসমাজ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার, যার ব্যতিক্রম নয় বাংলাদেশও। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইতিহাসে নারীর ভূমিকাকে অস্বীকার করে আসা হচ্ছে ক্রমাগত। অথচ বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ ব্যবহার, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হ্রাস, শিক্ষার হার বৃদ্ধি এবং পোশাক শিল্পে রপ্তানি আয়ের সাফল্য মূলত নারীরই। সমাজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নারী মুখ্য ভূমিকা পালন করলেও তার যাবতীয় কাজকে বলা হয় অ-গুরুত্বপূর্ণ। পিতৃতান্ত্রিকতার কবলে নারীরা পৃথিবীর মোট কাজের দুই তৃতীয়াংশ সম্পাদন করলেও সম্পদের একশ’ ভাগের মাত্র এক ভাগের মালিক হয় নারীরা। মোট জাতীয় আয়ের দশ ভাগের মাত্র এক ভাগ ভোগ করে নারীরা। নারীর এই সম্পদহীনতা, ক্ষমতাহীনতা নারীকে সর্বক্ষেত্রে প্রান্তিক অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে। নারী প্রতিনিয়ত বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন নারী। আর এলক্ষ্যেই পিতা-মাতার সম্পত্তিতে ছেলে-মেয়ে উভয়ের সমঅংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সার্বজনীন উত্তরাধিকার আইন প্রণয়ন ও ৫ দফা দাবিতে নেত্রকোনা নারী প্রগতি সংঘ নেত্রকোনা জেলা প্রশাসকের অফিস প্রাঙ্গণে বিশাল মানববন্ধন করেছে। তারা জেলা প্রশাসক বরাবরে এ সংক্রান্ত স্মারকলিপিও প্রদান করেছে। সেখানে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক মতীন্দ্র সরকার, সিপিবির সম্পাদক খন্দকার আনিসুর রহমান, নারী নেত্রী তাহেজা বেগম, রাইসা আমজাদ লিলি, জেলা ব্র্যাক প্রতিনিধি মিজানুর রহমান, নারী প্রগতি সংঘের ব্যবস্থাপক আলী আমজাদ খান আন্টু প্রমুখ। জেলা প্রশাসক আনিস মাহমুদ স্মারকলিপি গ্রহণ করেন। স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, নারীর এই সম্পদহীনতার মূল সূত্রপাতটি হয় পারিবারিক পর্যায় থেকে। শুধুমাত্র নারী হয়ে জন্ম নেয়ার কারণে উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয় সে। মুসলিম নারী পুরুষের তুলনায় অর্ধেক, হিন্দু ও বৌদ্ধ নারী সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত হয় সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে। আর এই বঞ্চিত অবস্থাই প্রভাবিত করে নারীর স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান, কর্মসংস্থান, মৌলিক মানবাধিকারসহ সমগ্র জীবনকে। নারী পরিণত হয় পরনির্ভরশীল দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে। মানুষ হিসেবে নারীর নিজস্বতা বলতে কিছুই থাকে না। তাকে কখনো বাবার নামে, কখনো স্বামীর নামে পরিচিত হতে হয়। নারীর নিজের কোনো বাড়ি নেই। কখনো বাপের বাড়ি, কখনো শ্বশুরবাড়ি, কখনো বা ছেলের বাড়িই হয় তার ঠিকানা। আমরা বিশ্বাস করি মানুষের অধিকারে, বিশ্বাস করি মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায়। সেজন্যই নারীর সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। আজ একথা বিশ্বস্বীকৃত যে, সম্পত্তিতে সমঅংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা ছাড়া নারীর মানবাধিকার অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাই উত্তরাধিকার আইন সংস্কার করে নারী-পুরুষের সমঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করা একান্তই প্রয়োজন। একজন নারী পরিবার থেকেই যখন সমঅধিকার পাবে, সমাজেও সে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবে এবং রাষ্ট্রও তাকে সমমর্যাদা দেবে। তাই সবার আগে প্রয়োজন উত্তরাধিকার আইনের সংস্কার। যত দ্রুত সম্ভব এই আইন সংস্কার করে সম্পত্তিতে পুত্র, কন্যা উভয়েরই সমঅংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। সম্পত্তিতে সমঅংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হলেই প্রতিষ্ঠা পাবে নারীর সমানাধিকার, মানবাধিকার। স্মারকলিপিতে যে দাবিগুলো উত্থাপন করা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে, (১) পিতা-মাতার সম্পত্তিতে ছেলে-মেয়ে উভয়ের সমঅংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে উত্তরাধিকার আইনের পরিবর্তন করে সার্বজনীন উত্তরাধিকার আইন প্রণয়ন করতে হবে। (২) নারী মানবাধিকার সংরক্ষণে সংবিধানের আলোকে প্রচলিত আইনের সংস্কার করতে হবে। (৩) নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও)-এর পূর্ণ সমর্থন ও বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। (৪) জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। (৫) নারীর প্রতি বৈষম্য নিরসনে সার্বজনীন পারিবারিক আইন চালু করতে হবে।