বেমানান
প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:২৫
সম্প্রতি আমাদের গুণীজনেরা দেশের অর্জন নিয়ে বহু আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। আমরা সীমিত সম্পদ ও সুযোগ যা পেয়েছি তা নিয়ে আত্মতুষ্টি ও ক্ষেত্রবিশেষে বড়াই করার প্রবণতা লক্ষণীয়। এ এক জ্বালা! মানুষের বৈশিষ্ট্যই এরূপ— ভালো বললে অব্যাহত বলতে থাকা। খারাপ বললেও তাই। লাগাম টানতে ভুলে যায় সবাই। স্বাধীনতার পর আমাদের কী ছিল, ৪১ বছর অতিক্রম করে বর্তমানে আমরা কোথায় উঠেছি। গোলপোস্টে যেতে আমাদের কত পথ এগিয়ে যেতে হবে ইত্যাদি বিষয়েই চলছে তৃপ্তির ঢেঁকুর। আশাবাদ খারাপ কিছু না, আশা না থাকলে পথেই হতাশার বাসা বাঁধতে হয়, কাম্য লক্ষ্যে পৌঁছা যায় না। এও সত্য, মাত্রাতিরিক্ত আশাবাদ চলতি পথকে কর্দমাক্ত, পিচ্ছিল করে ফেলতে পারে। সে কথাটিও মনে রাখা উচিত। কথা, লেখার পরিমাণ থাকবে সীমিত, বাস্তব কাজ থাকবে যথাযথ, প্রয়োজনানুরূপ, ঢের বেশি। তবেই আমরা সত্যিকার অর্থে উন্নত হবো, কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক মাত্রা অর্জন করতে পারবো। দেশের বাইরেও আমাদের নিয়ে চিন্তা-ভাবনা হচ্ছে, আশাবাদ ব্যক্ত হচ্ছে যে, আমরা একটি বিশেষ উন্নতির স্তরে পৌঁছানোর পথে আছি। আমরা নিজেরা আমাদের সম্পর্কে জানি। অন্যের মন্তব্য যত সঠিকই হোক না কেন, উচ্ছ্বাসের কিছু নেই। আমাদের দরকার কাজ আর কাজ। এর বাইরে সবকিছু এক কান দিয়ে শুনে অন্য কান দিয়ে বের করে দিতে হবে। কথা কম, কাজ বেশি।
সত্যিই কি আমরা উন্নতির মহাসড়কে পা দিয়েছি? বিষয়টি গভীরভাবে ভাবতে হবে। এর মধ্যে প্রকাশিত ছবির ভাষা কিন্তু তেমনটি বলে না। গত ২৭ ডিসেম্বর জেএসসি, জেডিসি, প্রাথমিক ও ইবতেদায়ী পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। পরদিন দেশের সবকটি পত্র-পত্রিকায় সফল-হাস্যোজ্জ্বল বালক-বালিকাদের ছবি দেখতে পেয়েছি। ঐদিন (২৮ ডিসেম্বর) ইত্তেফাকের তৃতীয় পৃষ্ঠায় একটি ভিন্নমাত্রার ছবি ছিল। ক্যাপশান ছিল— “নতুন বছরে সারাদেশে বিদ্যালয়গুলোতে নতুন পাঠ্যপুস্তক তুলে দিবে সরকার। রাজধানীর বাংলাবাজারে বই বাঁধাইয়ের দোকানগুলোতে ব্যস্ততার শেষ নেই।” ছবির অগ্রভাগে এক শিশুকে (হাতাকাটা রঙিন গেঞ্জি) বই প্যাক করতে দেখা যাচ্ছে। ছবিতে আরো শিশু রয়েছে, যারা একই কাজে ব্যস্ত। শেষ ডিসেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শিশুদের হাতে বই তুলে দিয়ে গণভবনে বই বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। সেখানেও হাসিখুশি, সুন্দর পোশাক পরা শিশুদের ছবি। ১ জানুয়ারি ছিল সারাদেশে পাঠ্যপুস্তক উত্সব দিবস। তার পরদিন বই নিয়ে আনন্দে বাড়ি ফেরার অনেক ছবি পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে।
এখানে স্পষ্ট যে, ঐ হাতাকাটা গেঞ্জি পরা ছেলেটি হাজার হাজার বই প্যাকেট করলেও কিন্তু বই পড়ার স্বাভাবিক সুযোগ সে পাচ্ছে না। তার মতো যারা তাদের উত্সব নেই, তারা বই নিয়ে বাড়ি ফিরবে না। বিষয়টি বড় করুণ। যে বয়সে থাকার কথা মায়ের আঁচলে, স্কুলে বন্ধুদের সঙ্গে উদ্দাম খেলাধুলায় মগ্ন থাকার কথা, সে বয়সে গতর খাটাতে হয় নিরেট-নিরস কাজে, অন্যের ঘরে/প্রতিষ্ঠানে। নিশ্চয়ই দু’মুঠো ভাতের জন্য সে প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা।
দেশে আন্তর্জাতিক, জাতীয় সংস্থাসমূহ নানা প্রকল্পে দেদারসে ব্যয় করছে। সরকারি টাকার নিকুচি হচ্ছে ঢের। দরিদ্র শিশুদের জন্য টেকসই প্রকল্প অপ্রতুল। ঐ শিশুশ্রমিকদের নিয়ে কার্যকরী কোনো চিন্তা-ভাবনা নেই। প্রধানমন্ত্রী বা উচ্চপর্যায়ের কেউ তাদের হাতে বই তুলে দেবেন না—এটাই বাস্তবতা। পড়ার বই হাতে নিয়ে ওদের হাস্যোজ্জ্বল বাড়ি ফেরার ছবি পত্রিকায় ছাপা হবে না। এই যে দু’ধরনের ছবির চরম অসামঞ্জস্য অবস্থাটি আমরা কাটিয়ে উঠতে পারছি না, উন্নতির সোপানে দ্রুত পৌঁছাবো কেমন করে? ছবির এ ধরনের বেমানান ভাষা মুছতে না পারলে কল্পনার ঘোলাজলে আমরা হাবুডুবু খাবো, সত্যিকার উন্নতির শিখরে পৌঁছা ‘দূর অস্ত’। বিষয়টি নিয়ে ভাবার জন্য সবার প্রতি অনুরোধ রইলো।
নেত্রকোনা