জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী

মাইনাস টু ফর্মুলার লোকরা মাথাচাড়া দিতে চাচ্ছে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কথিত ওয়ান ইলেভেনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেছেন, তখন যারা মাইনাস টু ফর্মুলা প্রবর্তন করতে চেয়েছিলেন তারা এখনো সক্রিয়। মাঝে মাঝেই তারা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাচ্ছে। তিনি গত চার বছরের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বর্ণনা দিয়ে এসব কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তার সরকারকে আবারো দেশ পরিচালনার সুযোগ দিতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। এছাড়া জনগণের সাংবিধানিক অধিকার যাতে কোন মহল কেড়ে নিতে না পারে, সে বিষয়ে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বানও জানান তিনি। গতকাল শুক্রবার জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের ব্যাপক কর্মকাণ্ড বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিচ্ছে। এসব কাজের মধ্য দিয়ে আমরা ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত, সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলবো। এসব লক্ষ্য অর্জনে সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, জনগণই পারে আমাদেরকে সেই সুযোগ দিতে; বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তির যে উজ্জ্বল সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে তা অব্যাহত রাখতে। প্রায় আধা ঘণ্টার এই ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের উদ্দেশে বলেন, সংঘাতের পথ পরিহার করুন। যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর চেষ্টা করবেন না। এটি করলে জাতি আপনাদের কখনোই ক্ষমা করবে না। সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার যে অপার সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে সকলে মিলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তাকে বাস্তব রূপ দিতে হবে। সকলে মিলে ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। মহাজোট সরকারের ৪ বছর পূর্তি উপলক্ষে গতকাল সন্ধ্যা ৭টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে এ ভাষণ দেন। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ বাংলাদেশ টেলিভিশন, বিটিভি ওয়ার্ল্ড, বেসরকারি টিভি চ্যানেল এবং সরকারি ও বেসরকারি সকল বেতার, কমিউনিটি রেডিওতে একযোগে সম্প্রচার করা হয়। ওয়ান ইলেভেনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সে সময় তিন মাসের তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রায় দুই বছর ক্ষমতা আঁকড়ে রাখে। এক পর্যায়ে তারা চিরস্থায়ীভাবে ক্ষমতায় থাকার প্রয়াস চালায়। মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়ন করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি শুরু হয়। গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে নির্যাতন চলতে থাকে। তবে এক পর্যায়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চাপে তত্কালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচন দিতে বাধ্য হয় এবং সে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। জাতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, আওয়ামী লীগ জনগণের ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করে। এজন্যই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর একমাত্র ২০০১ সালের ১৫ জুলাই আওয়ামী লীগ সরকার পাঁচ বছর পূর্ণ করে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। তিনি বলেন, গত চার বছরে নির্বাচন কমিশনের অধীনে জাতীয় সংসদের ১৪টি উপ-নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকারের মোট ৫ হাজার ৫০৯টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর প্রতিটি নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে। কোথাও কোন অভিযোগ ওঠেনি। বিভিন্ন নির্বাচনে আমাদের প্রার্থী পরাজিত হলেও জনগণের রায় মাথা পেতে নিয়েছি। অতীতে কোন সরকারের আমলেই এমন শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হয়নি। জনগণের সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষার জন্য তাদের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করাই বর্তমান সরকারের লক্ষ্য। বর্তমান নির্বাচন কমিশন যথেষ্ট শক্তিশালী উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোন বাধ্যবাধকতা না থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতি সকল দলের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের মতামত নিয়ে একটি সার্চ কমিটি গঠন করেন। সেই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গঠন করেন। আর্থিক খাতসহ নির্বাচন কমিশনকে সব বিষয়ে স্বায়ত্তশাসন দেয়া হয়েছে। অথচ বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে কোন নির্বাচনই সুষ্ঠুভাবে করতে পারেনি। বিভিন্ন উপ-নির্বাচন ও জাতীয় নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির ফলে জনগণ তাদের অধীনে নির্বাচন কোন সময় মেনে নেয়নি। বরং গণআন্দোলনের মুখে বিএনপি সরকারের পতন ঘটেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি-জামায়াত যত ষড়যন্ত্র করুক, যত অপচেষ্টা করুক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাংলার মাটিতে হবে। তাদের বিচার আজ গণদাবিতে পরিণত হয়েছে। এ দাবিকে অগ্রাহ্য করে বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর জন্য মাঠে নেমে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। জামায়াত ধ্বংসাত্মক পথ বেছে নিয়েছে। তাদের এই ঐক্য নতুন কিছু নয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে দেশবাসীকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে বলেন, নির্বাচনের আগে আমরা যেসব অঙ্গীকার করেছিলাম নানামুখী প্রতিবন্ধকতা ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা আমরা পূরণ করতে পেরেছি। কোন কোন ক্ষেত্রে লক্ষ্যের চেয়ে বেশি অর্জন করেছি। সামনের দিনগুলোতে জাতিকে সামনে নিয়ে আমাদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে। বিশ্বে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। দেশের এ অর্জনে সরকারের পাশাপাশি জনগণেরও অবদান রয়েছে। তিনি বলেন, সরকার গঠনের পর আমরা এক অগ্নিপরীক্ষার মধ্যে পড়েছিলাম। তাই সরকারের প্রথম দিনেই মন্ত্রিসভার বৈঠক করে তাত্ক্ষণিক, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদী করণীয় নির্ধারণ করি। এই চার বছর সরকার অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে। দেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি পরিবারে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে গত চার বছরে সরকারের আর্থিক খাতের উন্নয়ন, দুর্নীতি বিরোধী কার্যক্রম, বিডিআর বিদ্রোহীর বিচার, বিচার বিভাগের উন্নয়ন, নারী অধিকার, শ্রমিক অধিকার, সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়ন, দেশের প্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন, সমুদ্র জয়, শিক্ষা, ক্রীড়া, শিল্প, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, কৃষি, বন্দর অবকাঠামো, বিদ্যুত্, যোগাযোগ, চিকিত্সাসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উন্নয়নের কথা উল্লেখ করেন। বক্তব্যের শুরুতে তিনি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকের বুলেটে নিহত বঙ্গবন্ধুসহ অন্যান্য শহীদ, জাতীয় চার নেতা, মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লাখ শহীদ এবং সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদদের স্মরণ করেন। বক্তব্যে তিনি দেশবাসীর মঙ্গল কামনার পাশাপাশি নিজের জন্য দোয়া কামনা করেন।