৩০০ ফুটের কথা বলে জমি নিয়ে ৬৪ ফুট চওড়া রাস্তা!

পূর্বাচল নতুন শহর আবাসন প্রকল্পে ‘৩০০ ফুট রাস্তা’ নির্মাণে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। জানা গেছে, ৩০০ ফুট প্রশস্ত রাস্তা করা হবে বলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ন্যূনতম দামে জমি অধিগ্রহণ করে মাত্র ৬৪ ফুট চওড়া রাস্তা নির্মাণ করছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। শুধু তা-ই নয়, রাজউকের ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) অনুযায়ী পানি নিষ্কাশন কাজে ওই রাস্তার জন্য দুইপাশে ১০০ ফুট করে আরো ২০০ ফুট জায়গা নতুন করে অধিগ্রহণ করার কথা রয়েছে। একদিকে বর্তমানে মাত্র ৬৪ ফুট চওড়া মূল রাস্তা, অন্যদিকে নতুন করে জমি অধিগ্রহণের আশঙ্কায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে রাজধানীর খিলক্ষেত, ডুমনি, রূপগঞ্জের হাজার হাজার মানুষ। এ নিয়ে এলাকায় দফায় দফায় বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। তবে রাজউক চেয়ারম্যান নূরুল হুদা ইত্তেফাকের কাছে দাবি করেন, কুড়িল থেকে কাঞ্চন ব্রিজ পর্যন্ত ৩০০ ফুট চওড়া রাস্তা হচ্ছে। তবে কুড়িল থেকে বালু নদী পর্যন্ত রাস্তা হচ্ছে ২৫০ ফুট চওড়া। রাস্তার দৈর্ঘ্য প্রায় ১৪ কিলোমিটার। তিনি বলেন, পুরোদমে নির্মাণ কাজ চলছে। ইতিমধ্যে ৫০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আগামী মার্চ মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সড়কটি উদ্বোধন করবেন। নতুন জমি অধিগ্রহণ সম্পর্কে তিনি বলেন, পপূর্বাচলে রাজউকের নতুন করে জমি অধিগ্রহণের কোন পরিকল্পনা নেই। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কুড়িল প্রগতি সরণি থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রাস্তার জন্য ২০ বছর আগে জমি অধিগ্রহণ করে রাজউক। তখন বলা হয়েছিল মূল রাস্তা ১০০ ফুট চওড়া হবে। এর দুই পাশে ৫০ ফুট করে অযান্ত্রিক যানবাহন চলার জন্য রাস্তা থাকবে। তার পাশে আরো ৫০ ফুট করে জায়গা রাখা হবে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার জন্য। কিন্তু রাজউকের ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) দুই পাশে আরো ২০০ ফুট জায়গা ওয়াটার বডি হিসেবে রাখা হয়। বলা হয়, নতুন করে ২০০ ফুট জায়গা অধিগ্রহণ করতে হবে। এরপরই এলাকার জনগণ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তাদের অভিযোগ, অতীতে ৩০০ ফুট জমি অধিগ্রহণের সময় একবার তারা ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছে। আবারও জমি অধিগ্রহণ করলে নতুন করে তারাই ক্ষতির সম্মুখীন হবে। তারা জানায়, সরকার নির্ধারিত একটি মূল্য রয়েছে। সেই মূল্য কাঠাপ্রতি এক থেকে দুই লাখ টাকার বেশি নয়। সরকার অধিগ্রহণ করলে এর দেড় গুণ দাম দেয়। প্রথম দফায় অধিগ্রহণের সময় ওইসব জমির প্রতিকাঠার মূল্য ছিল আট-দশ লাখ টাকা। অথচ জমির মালিকদের দেয়া হয়েছিল এক থেকে দেড় লাখ টাকা। বর্তমানে এসব জায়গায় প্রতিকাঠার মূল্য স্থানভেদে ২০ থেকে ৫০ লাখ টাকা। অথচ সরকারি দর সর্বোচ্চ চার লাখ টাকা। কাজেই নতুন করে অধিগ্রহণ করলে তারাই আবার ব্যাপকভাবে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে। রাজউকের নকশা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ৬৪ ফুট রাস্তার মধ্যে ১০ ফুট প্রশস্ত বিভাজক রাখা হয়েছে। সেখানে গাছপালা লাগানো হবে। এছাড়া উভয়পাশে ৩৩ ফুট করে মোট ৬৬ ফুট জায়গা রাখা হয়েছে বনায়নের জন্য। ৩৮ ফুট করে ৭৬ ফুট রাখা হয়েছে স্টর্ম স্যুয়ারেজের জন্য। এছাড়া একপাশে ৩৬ ফুট ও অপর পাশে ৪৮ ফুট করে মোট ৮৪ ফুট জায়গা রাখা হয়েছে সিসি ব্লক স্থাপনের জন্য। এতে দেখা যাচ্ছে, ৩০০ ফুট জায়গার মধ্যে কেবল রাস্তার জন্য আছে ৬৪ ফুট। আরো যে ২০০ ফুট জায়গা অধিগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে সেখানেও রাস্তা হবে না। এ রকম নকশার কথা শুনে স্থানীয় জনগণ তীব্র আপত্তি জানায়। জমি অধিগ্রহণ প্রতিরোধ কমিটির প্রতিনিধিরা ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী, পরিকল্পনামন্ত্রী, বন ও পরিবেশ মন্ত্রী, গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সচিবদের কাছে লিখিত আবেদন জানান। এর প্রেক্ষিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে রাজউক চেয়ারম্যানকে চিঠি দেয়া হয়। গত বছরের ২৭ জুন স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব সরোজ কুমার নাথ চিঠি দিয়ে রাজউককে ওই সিদ্ধান্ত স্থগিত করতে বলেন। এরপর অধিগ্রহণের কার্যক্রম স্থগিত থাকলেও ড্যাপ এখনো সংশোধন করা হয়নি। সম্প্রতি স্থানীয় সংসদ সদস্য ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন এক চিঠিতে গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান খানকে জানিয়ে দেন, ঢাকার খিলক্ষেত ও বাড্ডা থানার বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দারা বিভিন্ন সময় জমি অধিগ্রহণজনিত ক্ষতির শিকার হয়েছে। তারা অনেকেই তাদের আগের বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ হয়ে বর্তমানে কুড়িল, কুড়াতলী, খিলক্ষেত, বরুয়া, ডুমনি, তলনা, ঢেলনাসহ বহু গ্রামে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাস করছে। খিলক্ষেত থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি কেরামত আলী দেওয়ান ইত্তেফাককে বলেন, ‘এর আগে পুলিশের একটি প্রকল্পে আমার এক একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। সেখানে প্রতি একরের দাম পেয়েছি ৫৭ লাখ টাকা। অথচ ওখানে এক কাঠারই দাম আছে ৫০ লাখ টাকা। আবার যদি ২০০ ফুট করে অধিগ্রহণ করে তাহলে আমার আর কোনো জমি থাকবে না।’ স্থানীয় বাসিন্দা ওমর আলী বলেন, ‘দফায় দফায় অধিগ্রহণের ফলে জনগণের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে।’ ভূমি অধিগ্রহণ প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিষয়টি জানিয়েছি। তাঁরা একমত হয়েছেন। কিন্তু অধিগ্রহণ না করার বিষয়টি নিশ্চিত করছে না। ফলে ওই জমিতে কেউ কোনো অবকাঠামোও করতে পারছে না। আশা করব সরকার দ্রুতই এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবে।’ তিনি পূর্বাচলে ৩০০ ফুট পূর্ণাঙ্গ সড়ক তৈরিরও দাবি জানান। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মূল রাস্তাটি ৬৪ ফুট চওড়া হচ্ছে। বালু ফেলে রাস্তার অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। রাজউকের একজন মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা ইত্তেফাককে জানান, আপাতত এ রকম রাস্তাই হবে। পরবর্তী সময় রাস্তা আরো প্রশস্ত করা হবে। তবে রাজউক বোর্ড সভার সদস্য (পরিকল্পনা) শেখ আবদুল মান্নান বলেন, আপাতত নতুন করে অধিগ্রহণের সিদ্ধান্তটি স্থগিত আছে। যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে অধিগ্রহণের প্রয়োজন আছে কি না। বিদ্যমান জায়গাতেই সবকিছু করা সম্ভব কি না। যদি হয় তাহলে আর অধিগ্রহণ করা হবে না। রিভিউ করার সময় ড্যাপেও সেটা সংশোধন করে দেয়া হবে।