ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের উপর ছাত্রলীগের হামলা
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:১৯
গতকাল ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের উপর সশস্ত্র হামলা করেছে ছাত্রলীগ। এতে কমপক্ষে ৩০ জন শিক্ষক আহত হয়েছে। গুরুতর আহত শিক্ষকদেরকে কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদিকে ছাত্রলীগ কর্তৃক গতকাল ৬ ঘন্টা কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করলে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয় এবং ভোগান্তিতে পড়ে হাজার হাজার যাত্রী। ১৯ নভেম্বর শিক্ষকদের উপর ছাত্রলীগের হামলার ঘটনার বিচারের দাবিতে শিক্ষকরা যখন আন্দোলন করছে ঠিক সে সময় আবারো শিক্ষকদের উপর হামলার ঘটনা ঘটলো। শিক্ষকদেরকে এভাবে পেটানোর ঘটনায় চারদিকে নিন্দার ঝড় উঠেছে। জানা গেছে, গতকাল শনিবার সকাল ১০ টার দিকে ছাত্রলীগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে ক্লাস পরীক্ষা চালুর দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনের সামনে গণ অনশন কর্মসূচি পালন করে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় মেইন গেইটের সামনে কুষ্টিয়া-খুলনা মহসড়ক অবরোধ করে। দুপুর ১২টার দিকে ভিসি প্রফেসর ড. আবদুল হাকিম সরকার আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে ক্লাস-পরীক্ষা চালুর আশ্বাস দিলে গণঅনশন প্রত্যাহার করে ছাত্রলীগ। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও ছাত্র উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষকদেরকে জোরপূর্বক ক্লাস পরীক্ষায় অংশগ্রহণে বাধ্য করতে শিক্ষক সমিতির অফিসে তালা দিয়ে মহাসড়ক অবরোধ অব্যাহত রাখে ছাত্রলীগ। বিশ্ববিদ্যালয় মেইন গেইট ও মহাসড়কে অবরোধ কর্মসূচি পালন করায় সকল শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে ক্যাম্পাসে। এমতাবস্থায় আন্দোলনরত শিক্ষকরা ক্যাম্পাস থেকে বের হতে না পেরে এবং শিক্ষক সমিতির অফিসও তালা থাকায় তারা ভিসির সাথে সাক্ষাত্ করে অনুষদ ভবনের দ্বিতীয় তলায় শিক্ষক লাউঞ্জে অবস্থান করতে থাকে। বিকাল সাড়ে ৩ টার দিকে ছাত্রলীগ সভাপতি জাহাঙ্গীর হুসাইন ও সাধারণ সম্পাদক শামছুজ্জামান তুহিনের নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা শিক্ষক লাউঞ্জে অবস্থানরত শিক্ষকদের উপর সশস্ত্র হামলা করে। প্রক্টর প্রফেসর ড. এ এইচ এম আক্তারুল ইসলাম জিল্লুকে এসময় নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। অপরদিকে হামলা শুরু হওয়ার পূর্বে ভিসি অফিসে শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি প্রফেসর ড. এম এয়াকুব আলীর সাথে কুষ্টিয়া জেলার এসপি মফিজ উদ্দিনের কথা কাটাকাটি হয়। এরপর এসপি চলে যান এবং ক্যাম্পাস থেকে সকল পুলিশ প্রত্যাহার করে নেন। ছাত্রলীগের এ হামলায় শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রফেসর ড. নজিবুল হক, প্রফেসর ড. রেজওনুল ইসলাম, প্রফেসর ড. এয়াকুব আলী, প্রফেসর ড. আতিকুর রহমান, প্রফেসর ড. আব্দুল লতিফ, প্রফেসর ড. মাহবুবুর রহমান, শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক প্রফেরস ড. ইকবাল হুসাইন, প্রফেসর ড. রুহুল আমিন ভুইয়া, ড. মাহবুবুর রহমানসহ কমপক্ষে ৩০ জন শিক্ষক আহত হয়েছেন। হামলার এক পর্যায়ে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সামছুজ্জামান তুহিন জোর করে শিক্ষক সমিতির সভাপতিকে ক্লাস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার ঘোষণা দিতে বলেন।
অন্দালনরত শিক্ষকদের ব্যাপক মারধর ও প্রাণনাশের ভয়ে শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রফেসর ড. নজিবুল হক গতকাল শনিবার থেকেই ক্লাস পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ঘোষণ দিতে বাধ্য হন। এদিকে লাউঞ্জে বসে থাকা শতাধিক শিক্ষকদের উপর ছাত্রলীগের এলোপাতাড়ি হামলার সময় শিক্ষকদের মোবাইল-ঘড়িসহ যাবতীয় জিনিস হামলাকারিরা নিয়ে গেছে বলে শিক্ষকরা জানিয়েছেন। আন্দোলনরত একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করে বলেন, “প্রক্টর ড. আক্তারুল ইসলাম জিল্লু ও ছাত্র উপদেষ্টা ড. টিএম লোকমান হাকিমের নির্দেশে এবং তার নেতৃত্বেই ছাত্রলীগ আমাদের উপর হামলা করেছে। তাছাড়া তার নির্দেশেই কুষ্টিয়ার এসপি ক্যাম্পাস থেকে পুলিশ প্রত্যাহার করে নিয়েছে।”
বঙ্গবন্ধু পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর ড. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘ছাত্রলীগ বহিরাগত সন্ত্রাসী ও কিছু সাধারণ ছাত্রের আবেগকে ব্যবহার করে শিক্ষকদের উপর হামলা চালিয়েছে। তিনি ঘটনার ধিক্কার জানিয়ে বলেন, প্রক্টর এবং ছাত্র উপদেষ্টার উপস্থিতিতে শিক্ষকদের উপর হামলা হলেও তারা নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিলো। শিক্ষকদের উপর হামলার পূর্ব মুহূর্তে পুলিশ প্রত্যাহার করে ভিসি প্রমাণ করেছেন হামলা তার নির্দেশেই হয়েছে।
জিয়া পরিষদের সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর ড. রুহুল আমিন ভূইয়া বলেন, যেভাবে শিক্ষকদের উপর হামলা চালানো হয়েছে তা কল্পনা করতেই গা শিউরে উঠছে। তিনি হামালার ঘটনায় প্রশাসনের সম্পৃক্তার অভিযোগ করে হামলাকারী সন্ত্রাসীদের বিচার দাবি করেন। শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রফেসর ড. নজিবুল হক বলেন, “শিক্ষকদের উপর যে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে তার নিন্দা ও ধিক্কার জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। প্রক্টর, ছাত্র উপদেষ্টা ও ভিসির প্রত্যক্ষ নির্দেশেই সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়েছে। প্রক্টরের নির্দেশেই কুষ্টিয়ার এসপি ও পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। আমরা সম্পূর্ণ ঘটনার তদন্তে বিচার বিভাগীয় কমিটি চাই। পরবর্তী কর্মসূচীর ব্যাপারে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। প্রক্টর আক্তারুল ইসলাম জিল্লু বলেন, হামলার ঘটনার সঙ্গে তার কোন ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। হামলাকারীদের ঠেকাতে গিয়ে আমি নিজেও লাঞ্ছিত হয়েছি। পুলিশ কেন দায়িত্ব পালন করেনি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন কুষ্টিয়ার এসপি এবং ইবি থানার ওসিকে বার বার ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বললেও তারা অন্যদিকে ব্যস্ত থাকার কারণে ঘটনাস্থলে যেতে পারেননি।
ভিসি প্রফেসর ড. আব্দুল হাকিম সরকার বলেন, শিক্ষকদের উপর হামলার ঘটনায় আমি লজ্জিত। কতজন শিক্ষক আহত হয়েছেন তা আমি জানতে পারিনি। তবে আহতদেরকে আমি দেখতে যাবো।