বাহরাইনে শ্রমিক ক্যাম্পে আগুন ১০ বাংলাদেশিসহ নিহত ১৩

মাত্র সাত মাসের ব্যবধানে বাহরাইনের রাজধানী মানামায় অগ্নিকাণ্ডে ১০ বাংলাদেশি শ্রমিকসহ মোট ১৩ জন নিহত হয়েছে। গত শুক্রবার শ্রমিকদের একটি ক্যাম্পে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এসব শ্রমিক নিহত হয়। নিহত ১০ বাংলাদেশি হলেন, চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার চরখিজিরপুর গ্রামের সগীর আহমেদের ছেলে নজির আহমেদ, পটিয়ার বাটুয়া গ্রামের হাজী রশিদ আহমেদের ছেলে মাহবুব আলম, একই থানার মারিপাড়া গ্রামের আব্দুল আজিজের ছেলে জামাল, নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি থানার কাশিপুর গ্রামের আব্দুর রহিমের পুত্র ওসমান গনি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের গুড়ি গ্রামের আবুল বাসারের ছেলে মো. আনোয়ার, কাঠালিয়া গ্রামের মৃত শহীদ মিয়ার ছেলে স্বপন এবং সবুজ, গোয়ালি গ্রামের নাসির মিয়ার ছেলে জসিম, চাঁদপুরের কচুয়ার নোয়াপাড়া গ্রামের আলমের ছেলে টিটু মিয়া এবং শাহাদাত। বাহরাইনে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, নিহত শ্রমিকদের মরদেহগুলো সেখানকার বাদশা হামাদ হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। ১০ জন বাংলাদেশি বলে পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেলেও বাকিদের পরিচয় জানার চেষ্টা চলছে। এর আগে গত মে মাসে দেশটির একটি ভবনে আগুন লাগলে ১০ বাংলাদেশি দমবন্ধ হয়ে মারা যায়। বাহরাইনে ঘন ঘন অগ্নিকাণ্ডে শ্রমিকদের নিহত হওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারকে ভাবিয়ে তুলছে। বিশেষ করে ওখানকার চাকরি দাতারা শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে উদাসীনতার পরিচয় দিচ্ছে বলে সরকার মনে করছে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সচিব জাফর আহমেদ খান বলেন, শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। এ বিষয়ে বাহরাইন সরকারের সাথে কথা বলার জন্য রাষ্ট্রদূতকে বলা হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে বাহরাইনে অপর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১৬ জন শ্রমিক নিহত হয়। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব জাফর আহমেদ খান জানান, তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। সেখানকার রাষ্ট্রদূত তাকে ১০ জন বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। মরদেহগুলো যাতে দ্রুত বাংলাদেশে পাঠানো যায় সেজন্য রাষ্ট্রদূতকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। সচিব আরো জানান, ওই ভবনে ৮০-৯০ জন বাংলাদেশি শ্রমিক থাকতেন। তাদের যাতে কোন অসুবিধা না হয় সেজন্য সেখানে আশ্রয় কেন্দ খোলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের উত্স সম্পর্কে এখনো বাহরাইন সরকার নিশ্চিত হতে পারেনি বলে জানিয়েছেন জাফর আহমেদ খান। ওই ভবনে থাকতেন এমন একজন বাসিন্দা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, ভবনটিতে মোট ২৮টি কক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি কক্ষে পাকিস্তানি শ্রমিকরা থাকতো, বাকি কক্ষগুলোতে বাংলাদেশি শ্রমিকরা থাকতেন। নির্মাণ শ্রমিকদের তাদের কর্মস্থলের পাশাপাশি রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানি ওই ভবন ভাড়া নিয়েছিলেন। বাহরাইনের প্রভাবশালী দৈনিক ‘গালফ ডেইলি নিউজ’ বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ভবনটির ২৬টি কক্ষে বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তানের শ্রমিকরা থাকতেন। তবে সবচেয়ে বেশি ছিলেন বাংলাদেশি শ্রমিকরা। প্রতি কক্ষে সাত থেকে ১০ জন শ্রমিক থাকতেন। দিনের বেলায় আগুন লাগাতে হতাহতের সংখ্যা কম হয়েছে বলে জানা গেছে। কারণ ওই সময়ে অধিকাংশ শ্রমিক বাইরে কাজে ছিলেন। বাহরাইনের সিভিল ডিফেন্সের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক জানিয়েছেন, শুক্রবার স্থানীয় সময় বিকাল পৌনে চারটার দিকে রাজধানী মানামার মুখারকা এলাকার তিনতলার ভবনটিতে আগুন লাগে। ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পার্শ্ববর্তী ভবনে আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগে তা নিভিয়ে ফেলা হয়। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি এক পর্যায়ে ধ্বসে পড়ে। সেখান থেকে ১৩ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। বাহরাইনে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব জানান, ঘটনা শোনার পর আমরা ঘটনাস্থলে যাই। অনেক রাত পর্যন্ত আমরা উদ্ধার কাজ তদারকি ও প্রত্যক্ষ করেছি। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে বেসামরিক লোকদের সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পর ভবনটি ধ্বসে পড়ে। এদিকে, বাহরাইন প্রবাসী একজন বাংলাদেশি ইত্তেফাককে টেলিফোনে জানিয়েছেন, যে এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে তা পুরোটাই শ্রমিক অধ্যুষিত। শ্রমিকদের কম খরছে বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে মালিকরা এ এলাকাকেই বেছে নেয়। উল্লেখ্য, বাহরাইনের অর্থনীতির একটি বড় অংশ বিদেশি শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল। দেশটিতে মোট ৬ লাখ ৬০ হাজার বিদেশি শ্রমিক কাজ করে। দেশটির মোট লোকসংখ্যা ১২ লাখ ২৩ হাজার। সাধারণত: কম অভিবাসন ব্যয়ের জন্য বাংলাদেশি শ্রমিকরা বাহরাইনের দিকে ঝুঁকছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে অভিবাসন বন্ধ থাকায় বাহরাইনে বাংলাদেশি শ্রমিকদের সংখ্যা বাড়ছে। প্রায় এক লাখের কাছাকাছি বাংলাদেশি শ্রমিক বাহরাইনে কাজ করে থাকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে শোকের মাতম এদিকে, বাহরাইনে অগ্নিকাণ্ডে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ৫ জনের মৃত্যুর খবরে সেখানে শোকের মাতম নেমে এসেছে। যে কয়টি পরিবারের সদস্যরা নিহত হয়েছেন তাদের আত্মীয়-স্বজনের আহাজারিতে পরিবেশ ভারি হয়ে উঠে। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা নিহতের পরিবারকে সান্ত্বনা জানাচ্ছেন। নিহতদের লাশ দ্রুত দেশে নিয়ে আসার জন্য তারা প্রশাসনের সহায়তা চেয়েছেন। তিন ছেলে ও চার মেয়ের মধ্যে দুই ছেলে সুজন মিয়া সবুজ মিয়াকে হারিয়ে পাগল প্রায় সাজেদা বেগম বলেন, অনেক কষ্ট করে জমি বিক্রি ও দেনা করে দুই ছেলেকে বিদেশে পাঠাইলাম। আল্লাহ আমার সব কাইড়া নিল। আমার ছেলের লাশ কি আমি দেখতে পারতাম না বলে বার বার বিলাপ করছিলেন। নিহত দুই সহদরের বড় ভাই সুমন মিয়া জানান, তিন বছর পূর্বে স্বপনকে আমি বিদেশ নিয়ে দেশে ফিরে আসি আর গত নভেম্বরে সবুজকে বাহরাইনে পাঠাই। ওরা এক রুমে নবীনগরের পাঁচজন ছিল। এর মধ্যে একজন বাথরুমে থাকায় আগুন লাগার সাথে সাথে সে বের হলেও বাকিরা ঘুমিয়ে থাকায় বের হতে পারেনি। নবীনগরের কাইতলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান জানান, বাহরাইন থেকে টেলিফোনে তিনি ৬-৭ জনের মৃত্যুর খবর পেয়েছেন। এর মধ্যে তার ইউনিয়নের তিনজনের মৃত্যুর খবর তিনি নিশ্চিত করেছেন।