রাজনীতিতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা থাকা জরুরি
প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:২৫
জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছেন, জনগণ যদি উন্নয়নের স্বাদ না পায় তাহলে দেশ যে স্বাধীন হয়েছে তা তারা অনুভব করতে পারে না। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত দেশে যতটুকু অগ্রগতি হয়েছে তাকে আমরা পরিপূর্ণ উন্নয়ন বলতে পারি না। মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন কতটা হয়েছে সেটাই বিবেচ্য বিষয়। সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, মনে রাখতে হবে রাজনৈতিক বিভেদ দিয়ে মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটানো যায় না। উন্নয়নের জন্য সকলের ঐকমত্য দরকার। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতা থাকা বাঞ্ছনীয়। পাশাপাশি পরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মানুষের আয় বাড়াতে হবে। তাহলেই প্রকৃতপক্ষে জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
গতকাল শনিবার দুপুরে পিরোজপুর জেলার কাউখালী ও শুক্রবার রাতে ভাণ্ডারিয়া উপজেলায় দু’টি পৃথক অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন। এছাড়া তিনি স্বরূপকাঠি উপজেলা জেপি কার্যালয়ে সংগঠনের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত্কারে মিলিত হন।
কাউখালীতে মতবিনিময় :কাউখালীর শিয়ালকাঠি ইউনিয়নের নতুন বাজারে উপজেলা জাতীয় পার্টি (জেপি) আয়োজিত মতবিনিময় সভায় আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, আমাদের অনুধাবন করতে হবে মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে বেকারত্ব দূর করা না গেলে যাবতীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন তাদের কাছে নিরর্থক-অসার হয়ে যাবে। রাস্তা-ঘাট, বিদ্যুত্, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দির যাই আমরা গড়ে তুলি না কেন, মানুষ যদি এসবের সুফল ব্যবহার করে ভাগ্যের পরিবর্তন করতে সক্ষম না হয় তবে তাকে উন্নয়ন বলা অনুচিত। তিনি বলেন, অবকাঠামো নির্মাণের সফলতা লাভের জন্য পরিকল্পিত উন্নয়ন দরকার। তিনি বলেন, একসময় দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে সড়ক ও সেতু ছিল কল্পনার ঊর্ধ্বে। এ এলাকার বাসিন্দাদের যাতায়াত ব্যবস্থা ছিল নৌ-পথ নির্ভর। দীর্ঘ দুই যুগে ঝালকাঠির কালিজিরা, গাবখান, বরিশালের শিকারপুর-দোয়ারিকা-দপদপিয়া, পটুয়াখালীর লাউকাঠি, পিরোজপুরের বলেশ্বর, বাগেরহাটের দড়াটানা, খুলনার রূপসা সেতুসহ সারাদেশে আট শতাধিক সেতু নির্মাণের সাথে আমরা সম্পৃক্ত ছিলাম। আল্লাহর রহমতে আমরা বঙ্গবন্ধু, পাকশি, মেঘনা ও বুড়িগঙ্গা সেতুর মত জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছি। জাতীয় সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বন্ধুদের সহায়তায় এসব নির্মাণের জন্য অর্থ সংগ্রহের মতো কঠিন কাজও মানুষের দোয়ায় আমাদের পক্ষে সম্পাদন করা সম্ভব হয়েছে। অথচ আজ বিশ্বব্যাংকের টাকা না পাওয়ায় পদ্মা সেতু করা যাচ্ছে না। এই ঘটনায় বহির্বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তি প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জেপি নেতা বলেন, আমরা কখনই কাজের প্রতিশ্রুতি দেই না। সম্পদ সংগ্রহ করার পর কাজ করে মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করি। তিনি বলেন, আল্লাহর উপর আস্থা রাখলে এবং শোকর করলে তার রহমত পাওয়া যায়। আর ওই রহমতের কারণেই আমাদের স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়নি, আমাদের অর্জন থেমে থাকেনি।
উপজেলা জেপি’র সভাপতি মাহবুবুর রহমান খানের সভাপতিত্বে এই মতবিনিময় সভায় আরও বক্তব্য রাখেন ভাণ্ডারিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান মাহিবুল হোসেন মাহিম, জেপি’র কেন্দ্রীয় নেতা এডভোকেট হুমায়ুন কবির তালুকদার রাজু, যুব সংহতির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় শ্রম ও শিল্প বিষয়ক সম্পাদক মতিউর রহমান তালুকদার, কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক আসাদুজ্জামান মিল্টন, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন সিকদার, ইউনিয়ন জেপি’র সম্পাদক শাহজাহান মোল্লা, চিড়াপাড়া ইউনিয়নের জেপি সম্পাদক খান মো. বাচ্চু, কৃষক পার্টির উপজেলা সম্পাদক আবুল বাশার প্রমুখ।
উপস্থিত ছিলেন ভাণ্ডারিয়া ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম সরোয়ার জোমাদ্দার, ধাওয়া ইউপি চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান টুলু, ভিটাবাড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান মশিউর রহমান মৃধা, জেপি নেতা এনামুল ইসলাম রুবেল, নেপাল চন্দ্র দে, যুব সংহতির নেতা হুমায়ুন কবির বাদল সিকদার, পিরোজপুর পল্লী বিদ্যুত্ সমিতির পরিচালক শাহ আলম নসু, উপজেলা ছাত্র সমাজের সভাপতি মনজুরুল মাহফুজ পায়েল, ‘মঞ্জুসেনা’র উপজেলা সভাপতি রাজু আহমেদ নাহিদ বাচ্চু প্রমুখ।
ভাণ্ডারিয়ায় দলীয় কার্যালয় উদ্বোধন :এর আগে শুক্রবার রাতে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ভাণ্ডারিয়ার ভিটাবাড়িয়া ইউনিয়নের সেনেরহাটে জেপি, যুব সংহতি ও ছাত্রসমাজের সমন্বিত কার্যালয় উদ্বোধন করেন। এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আমাদের দেশের মানুষ যদি সঠিকভাবে একটি গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা পেত তাহলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন সহজ হতো। তিনি বলেন, উন্নয়নের জন্য সকলের ঐকমত্য দরকার। কিন্তু আমাদের দেশে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বিএনপি’র এলাকায়, আর বিএনপি ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগের এলাকায় উন্নয়ন বাতিল হয়ে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। স্বাধীন দেশের রাজনীতিতে এলাকার উন্নয়নে সবার একমত হওয়া জরুরি। সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য রাজনৈতিক বিভাজন কোনমতেই কাম্য নয়।
জেপি চেয়ারম্যান বলেন, আমি সংঘাতের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। দীর্ঘদিন ধরে আমি যে রাজনীতি করে আসছি সেখানে সহিংসতাকে প্রশ্রয় দেইনি। সহিংসতার রাজনীতি দেশের কাঙ্ক্ষিত সুফলকে বাধাগ্রস্ত করে। তিনি বলেন, উন্নয়নের জন্য স্থানীয়ভাবে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকলে আমাদের ন্যায্য হিস্যা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। শুধু চেয়ারম্যান-মেম্বাররাই নন, সচেতন হলে জনগণ নিজেও উন্নয়ন সাধনে সক্ষম হবে।
যুব সংহতির কেন্দ্রীয় সদস্য মিরাজ হোসেনের সভাপতিত্বে এই অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন ভিটাবাড়িয়ার ইউপি চেয়ারম্যান মশিউর রহমান মৃধা। এ সময় ভাণ্ডারিয়ার উপজেলা চেয়ারম্যান ছাড়াও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রয়াত নেতৃবৃন্দের কবর জিয়ারত :এরপর আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ভিটাবাড়িয়ায় আওয়ামী লীগের ইউনিয়ন সভাপতি প্রয়াত মতিউর রহমান মৃধা ও বিশিষ্ট সমাজসেবক প্রয়াত আব্দুল হামিদ সিকদারের বাড়িতে যান এবং তাদের কবর জিয়ারত করেন। তিনি মরহুমদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলেন ও তাদের সমবেদনা জানান।
এর আগে শনিবার সকালে তিনি সমপ্রতি আততায়ীর হাতে নিহত ভাণ্ডারিয়ার গৌরীপুর ইউপি চেয়ারম্যান আক্তারুজ্জামান দুলাল ও প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা বজলুর রশীদ মসরুর জমাদ্দারের বাড়িতে যান, তাদের কবর জিয়ারত করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান।