তত্ত্বাবধায়ক সরকার এলে কি খালেদা জিয়া পার পাবেন?
প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:২৬
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া এখন তত্ত্বাবধায়কের জন্য পাগল হয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসলে তিনি কি পার পেয়ে যাবেন? বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমাকে ও খালেদা জিয়াকে জেলে পুরেছিল। তার দুই পুত্রকে দেশ ছাড়া করেছিল। এসব কি তিনি ভুলে গেছেন? গতকাল শনিবার গণভবনে আইনজীবীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, সম্প্রতি খালেদা জিয়া নিজেই হরতাল দিয়ে আবার নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগে আদালতে যাননি। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসলে তিনি কি এই সুযোগ পেতেন? হলমার্ক ও ডেসটিনি কেলেঙ্কারি প্রসঙ্গ প্রধানমন্ত্রী বলেন, সূত্র ধরলে দেখা যায় এসব ঘটনা অনেক আগে থেকে ঘটছে। আমরা আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার স্বার্থে ব্যবস্থা নিচ্ছি। অথচ আমাদের ওপর দোষ চাপানো হচ্ছে। যেন চোর ধরতে যাওয়াটা অন্যায়। তিনি বলেন, দেশবাসীকে একটা কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, পঁচাত্তরের পর মার্শাল ল’ জারি করে ক্ষমতায় আসা জিয়াউর রহমানের সময়ই ঋণ খেলাপির সংস্কৃতি দেশে প্রথম শুরু হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের অধীনে উপ-নির্বাচনসহ বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার নির্বাচন হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় ৬৩ হাজার জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন। একটি নির্বাচন নিয়েও কোনো অভিযোগ উঠেনি। জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছি। নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী হয়েছে। তিনি বলেন, দেশের উন্নয়নের স্বার্থে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে হবে। তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করতে নানা অপচেষ্টা চলছে। এ ব্যাপারে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। কারণ ঐক্য ছাড়া কোনো কিছু অর্জন করা সম্ভব নয়।
আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র সব সময় লেগেই থাকে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা অর্জনের পর বঙ্গবন্ধু যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তোলেন, ঠিক তখনই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে তাকে হত্যা করা হয়। গণতন্ত্র যাতে আর ফিরে না আসে সে চেষ্টা চলে। মার্শাল ল’ জারি করে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস করেন। ইতিহাস বিকৃত করেন। ক্ষমতা দখলকারী ওই সরকারের একটাই কাজ ছিল আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া। পরাজিত পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার এজেন্ডা বাস্তবায়নই যেন ছিল তার প্রধান কাজ। কিন্তু আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করা অত সহজ নয়, কারণ আওয়ামী লীগ এদেশের মাটি ও মানুষের দল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে অর্ডিন্যান্স জারি করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছিলেন। সে সময়ে ২২ হাজার যুদ্ধাপরাধী আটক ছিল। এর মধ্যে সাজাপ্রাপ্ত ছিল ১০ হাজার। কিন্তু তাঁকে হত্যার পর অবৈধভাবে ক্ষমতাদখলকারী জিয়াউর রহমান মার্শাল ল’ অর্ডিন্যান্স জারি করে সংবিধানকে ক্ষতবিক্ষত করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করে দেয়, কারাগার থেকে সকল যুদ্ধাপরাধীকে মুক্তি দিয়ে রাজনীতিতে পুনর্বাসন করেন। পাকিস্তানি পাসপোর্টে দেশে আসা গোলাম আযমকে নাগরিকত্ব দেয়া হয়। যুদ্ধাপরাধী, স্বাধীনতাবিরোধী ও পরাজিত শক্তি পঁচাত্তরের পর দীর্ঘ ২১ বছর ধরে অবৈধভাবে ক্ষমতায় থেকে জনগণের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে। ক্ষমতায় থেকে তারা অনেক টাকা মজুত করেছে। এখন যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর জন্য লবিস্ট নিয়োগ করে সেই টাকা ব্যয় করছে। তিনি বলেন, একমাত্র ১৯৯৬ সালেই দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানার সুযোগ পায়। তিনি বলেন, এবার আমরা ক্ষমতায় এসে জনগণের মাঝে শান্তি, আস্থা ও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পেরেছি। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। বিশ্বে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ।
‘প্রিন্ট মিডিয়া আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে লিখছে’ মর্মে আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের তৃণমূল নেতৃবৃন্দের অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অধিকাংশ পত্রিকার স্বত্বাধিকারী অনেক ধন সম্পদের মালিক। তাদের অর্থ-সম্পদ কীভাবে হয়েছে তা দেখলে বুঝতে পারবেন। তিনি বলেন, বেসরকারি টিভি চ্যালেন, পত্রিকাসহ গণমাধ্যমের সম্প্রসারণ আওয়ামী লীগই করেছে। এতে কর্মসংস্থান বেড়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা বিচার বিভাগকে স্বাধীন করেছি। বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও জাতীয় সংসদ রাষ্ট্রের এই তিনটি প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। আইনজীবীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কেউ যাতে অকারণে হাজতবাস না করে, হয়রানি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখবেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদ পঁচাত্তরের পর বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নে সোচ্চার ছিল। পরে আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ গঠিত হয়। এই দুই সংগঠনের মধ্যে সমন্বয় থাকা দরকার।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট মমতাজউদ্দিন মেহেদী বলেন, সারাদেশে প্রায় ৫০ হাজার আইনজীবী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ।
বিভিন্ন জেলার আইনজীবী নেতৃবৃন্দ বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচালের জন্য জামায়াত-শিবির অর্থের বিনিময়ে আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করছে, ঐক্যের ফাটল ধরাচ্ছে। রংপুর, রাজশাহী, মৌলভীবাজার, বগুড়া, বরিশাল, ঢাকা, জামালপুর, খুলনা, চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী নেতারা বলেন, গুটিকয়েক আইনজীবী বিভাজন সৃষ্টি করে আওয়ামী লীগ সমর্থন আইনজীবীদের মধ্যে ঐক্যের ফাটল ধরাচ্ছেন। এদের চিহ্নিত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ বিরোধ হলে পরাজয় হবে। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপে বিভাজনের সমাধান এখনই হওয়া প্রয়োজন।
আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল মতিন খসরু এমপির পরিচালনায় সভায় উপস্থিত ছিলেন ব্যারিস্টার এম আমির-উল-ইসলাম, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এডভোকেট সাহারা খাতুন, আইন প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলাম, এডভোকেট সৈয়দ রেজাউল রহমান, শিরিন শারমিন চৌধুরী প্রমুখ।