ডাক্তার হওয়ার বড় স্বপ্ন ছিল মেয়েটার

তিরিশ বছর আগে বদ্রিনাথ সিং তার মনদ্বোয়ারা কালান গ্রাম ছেড়ে ছয়শ মাইল দূরে দিল্লী শহরে চলে গিয়েছিলেন কাজের সন্ধানে। গ্রামে সংসারটা চলছিল না কিছুতে। তাই অনেকের দেখাদেখি তিনিও চলে গিয়েছিলেন রাজধানীতে। দিল্লীতে গিয়ে যে কাজ জুটেছিল তাতে টেনেটুনে হলেও সংসারটা চলত। এরই মধ্যে ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা। নিতান্তই কষ্টের সংসার, তবে সব মিলিয়ে মোটামুটি সুখের। কিন্তু গতমাসে আচমকা চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল বদ্রিনাথের জীবনে। গত ১৬ই ডিসেম্বর নয়াদিল্লীর যাত্রীবাহী বাসে এক গণধর্ষণের ঘটনায় মেডিক্যালের যে ছাত্রী প্রাণ হারান, তিনি বদ্রিনাথেরই একমাত্র কন্যা। গ্রামের জমিজমা বিক্রি করে, ধারদেনা করেও মেয়ের পড়ার খরচ জোগাতে পারছিলেন না। শেষে দুই শিফটে দৈনিক ১৬ ঘন্টা করে কাজ করতে হচ্ছিল তাকে। কিন্তু যার জন্য এত কিছু, তাকেই তো কেড়ে নিল নগরী দিল্লী! পৈতৃক ভিটেমাটি, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন সব ছেড়ে এজন্যই কি তিনি দিল্লী এসেছিলেন? জীবনের শেষ বেলায় এসে সেই প্রশ্নেরই উত্তর হাতড়ে চলেছেন বদ্রিনাথ। খবর ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউনের। সেদিন বাসের ভেতর মেয়েটিকে শুধু গণধর্ষণই করেনি লোকগুলো। একটা লোহার রডও ঢুকিয়ে দিয়েছিল তার পেটে। সরকার মেয়েটিকে চিকিত্সার জন্য সিঙ্গাপুর পাঠালেও বাঁচানো যায়নি তাকে। কফিনবন্দী হয়ে ফিরে এসেছে বদ্রিনাথের আদরের ধন, তার স্বপ্ন। সন্তানের লাশ নাকি দুনিয়ায় সবচেয়ে ভারি। কিন্তু সেই সন্তানের মৃত্যু যদি এমনভাবে হয়, তখন তাকে কি বলা যাবে? জানেন না বদ্রিনাথ। তবে হিন্দু রীতি মেনে কন্যার শেষকৃত্যের জন্য ফিরে এসেছিলেন তার মনদ্বোয়ারা কালান গ্রামে। আজ থেকে তিরিশ বছর আগে যেমনটি দেখে গিয়েছিলেন, তা থেকে কিছুই বদলায়নি। সেই ভাঙ্গাচোরা রাস্তা, রাস্তার ধারে সেই ঘুঁটের স্তূপ, সেই আবর্জনা। ঘরগুলোও তেমনি রয়ে গেছে, খড় বা বিচালি দিয়ে ছাওয়া। বিদ্যুত্ পৌঁছায়নি আজও। একটা মাত্র স্কুল। তাতে ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করা চলে। যে রাজধানী শহরে বদ্রিনাথ এখন বাস করেন, তার সঙ্গে বড়ই বেমানান তার গ্রাম। অথচ ভারত স্বাধীন হওয়ার পর দেশটির জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, গ্রামই হবে ভারতের প্রাণ। মহাত্মা গান্ধীর মৃত্যু হয়েছে আজ থেকে ৬৫ বছর আগে। গ্রামের চেহারা বদলায়নি। তবে বেড়েছে নগরী। দশ লাখের বেশি লোক বাস করে এমন মেগাসিটির সংখ্যা ভারতে এখন অর্ধশতাধিক। মাত্র ১২ বছর আগেও এমন মেগাসিটির সংখ্যা সারা দেশে ২৩টির বেশি ছিল না। বুকভাঙ্গা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বদ্রিনাথ বলেন, মেয়েটিই আমার আর আমার স্ত্রী আশার প্রথম সন্তান। দিল্লীতেই জন্ম। সেখানেই বেড়ে উঠেছে। মাঝে মাঝে আমাদের সঙ্গে গ্রামে এসেছে বটে তবে সে ছিল পুরোপুরিই শহরের মেয়ে। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার দিকে প্রচণ্ড ঝোঁক ছিল তার। অন্য বাচ্চারা যেখানে স্কুলে গিয়ে কাঁদত, আমার মেয়েটা সেখানে স্কুলে না যেতে পারলে কাঁদত। আমরা স্বামী-স্ত্রী মিলে সাধ্যমত চেষ্টা করেছি ওকে মানুষ করতে। বদ্রিনাথ বলেন, আমাদের সমাজে মেয়ে সন্তানকে খুব একটা ভালো চোখে দেখা হয় না। কিন্তু আমরা তা করিনি। ঈশ্বর আমাদের যা দিয়েছেন, তাকেই আমরা আশীর্বাদ বলে মাথায় নিয়েছি। মেয়ে বলে ওকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখিনি কখনো। তিনি বলেন, মেয়েটির বড় সাধ ছিল ডাক্তারি পড়ার। কিন্তু অত টাকা কই আমাদের! গ্রামের জমি বিক্রি করে পেয়েছি দেড় লাখ রুপি। কিছু ধার দেনাও করেছি। কিন্তু তা দিয়েও খরচ চালানো সম্ভব হত না বলে বাধ্য হয়েই সে দেরাদুনে ফিজিও থেরাপি কলেজে ভর্তি হয়েছিল। পাস করে ইন্টার্নি ডাক্তার হিসাবে কাজে যোগ দিয়েছিল সবে। তখনই তার এক ছেলে বন্ধুর সঙ্গে বাসে করে যাওয়ার সময় ঘটল সেই ভয়ানক ঘটনা। পুলিশ বলেছে, একদল উচ্ছৃঙ্খল লোক মদ খেয়ে ফুর্তি করতে করতে মেয়েদের উত্তক্ত করতে বেরিয়েছিল রাস্তায়। তারাই সেদিন ঘটিয়েছিল এ ঘটনা। মেয়েটি তাদের একজনের হাত কামড়ে দেয়ায় তারা লোহার রড ঢুকিয়ে দিয়েছিল তার পেটে। বদ্রিনাথ বলেন, প্রথমদিনই ডাক্তার আমাকে জানিয়েছিলেন, ওর বাঁচার আশা নেই। কেবল ইচ্ছা শক্তির জোরে কয়েকটা দিন বেঁচেছিল মাত্র। আমাদের আরো দুটি সন্তান আছে। দুটিই ছেলে। বড়টির নাম গৌরব। বয়স ১৭। সে ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়। সামনের বসন্তে তার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি পরীক্ষা। ওদের কথা ভেবেই সব কষ্ট বুকে চেপে আরো কিছুদিন বেঁচে থাকতে হবে আমাদের। মেয়েটি মারা যাওয়ার পর থেকে ওর মা প্রায় নির্বাক। শুধুই কাঁদছে। হিন্দু রীতি মেনে ১৩দিনের শেষকৃত্য শেষ হলে আবার ফিরব দিল্লী। বিমানবন্দরে যাত্রীদের মালপত্র টানার কাজ করি। ১৬ ঘন্টা কাজ করে পাই ১১ হাজার রুপি। গ্রামে কোনভাবেই এর অর্ধেক টাকাও আয় করা যায় না। তাই যে দিল্লী আমার সব কেড়ে নিয়েছে, সেই দিল্লীতেই আমাদের ফিরতে হবে বাঁচার জন্য।